একুশ অন্য অনেক শপথের দিন

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২১, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

সুকুমার সরকার :


বাঙালির ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা হওয়াটা কি শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল? না কি কেবলমাত্র বাংলাদেশের তৎপরতা? না কি কাকতালীয়? না কি অন্যকিছু ? অন্যকিছু মানে, বাংলাভাষার কী এমন কোনো বিশেষ বিশেষত্ব আছে, যার কারণে ইউনোস্কোর কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্থির করতে গিয়ে বাংলা ভাষাকেই বেছে নিয়েছেন?
বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের সাতাত্তর বছর পর একদিকে বর্তমানের ভারত-বাংলাদেশের বাঙালি অধ্যুষিত সমগ্র এলাকার বাঙালিদের মধ্যে বাংলাভাষার প্রতি অনীহা, শিক্ষা এবং সরকারি কাজে দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থানে নেমে আসা; অন্যদিকে সিয়েরা লিয়ন, আমেরিকা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডসহ বহু দেশে বাংলাভাষাকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানে তুলে এনে মর্যাদা দেওয়ায় প্রশ্নটি মনের মধ্যে ভীষণভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে ।
ইউনোস্ক বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ঘোষণা করেছে ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ই নভেম্বর । অবশ্যই তার পিছনে বাংলাদেশের জনৈক রফিকুল ইসলাম, আব্দুস সালাম এবং অতি অবশ্যই বাংলাদেশ সরকারের তৎপরতা ছিল অগ্রগণ্য। তবে, একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণার প্রথম দাবী কিন্তু উঠেছিল ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভাষা শহিদ আব্দুল জব্বারের জন্মস্থান বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থেকে। সেই দাবী ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে হতে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে পৌঁছে যায় জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের দপ্তরে। আর এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন, কানাডার বহুভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষা-প্রেমিক গোষ্ঠীর সদস্যরা। যাঁদের প্রধান উদ্যোক্তা ছিনেল কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙালি যুবক রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম।
সেদিন বাংলাভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস দাবির পক্ষে অন্য ভাষা-ভাষীরা যাঁরা স্বাক্ষর করেছিলেন তাঁরা হলেন, আলবার্ট ভিনজন ও কারমেন ক্রিস্টোবাল ( ফিলিপিনো), জ্যাসন মোরিন ও সুসান হজিন্স ( ইংরেজি), ড. কেলভিন চাও ( ক্যান্টনিজ ), নাজনিজ ইসলাম ( কা – চি), রেনাটে মার্টিনস ( জার্মান), করুণা যোশী ( হিন্দি )। তাঁদের সকলের স্বাক্ষরকৃত দাবিপত্রসহ আবেদন পৌঁছে যায় প্যারিসের ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে। কিন্তু বিষয়টি শুধুমাত্র ব্যষ্টিগত উদ্যোগের বা কোনো সংস্থার তৎপরতার বিষয় ছিল না। এর পিছনে দরকার ছিল সদস্য দেশগুলির মধ্যে থেকে যে কোনো দেশের রাষ্ট্রশক্তির পক্ষ থেকে আবেদনের। দ্রুত পদক্ষেপ করে বাংলাদেশ সরকারই। সেই আবেদনের যৌক্তিকতা এবং প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে একুশে ফেব্রুয়ারিরকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণার সেদিনের সেই দাবির পক্ষে সহমত জানিয়ে এগিয়ে আসে সৌদি আরব, ভারত, ইরান, ওমান, ইতালি, আইভরিকোস্ট, ইন্দোনেশিয়া, কমোরোসে, গাম্বিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, পাপুয়া নিউগিনি, ফিলিপিন, বাহামাস, বেনিন, বেলারুস, ভানুয়াতু, মাইক্রোনেসিয়া, মিশর, রুশ ফেডারেসান, লিথুয়ানিয়া, শ্রীলঙ্কা, সিরিয়া, পাকিস্তান, হন্ডুরাসের মতো দেশগুলি। এই সকল দেশগুলির সম্মিলিত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় । ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশ সমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালন করা শুরু হয় । ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ২১ শে অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫ তম অধিবেশনে ১৮৮ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘের তথ্যবিষয়ক কমিটিতে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয় এবং ঘোষিত হয় এখন থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালন করবে জাতিসংঘ। এই ঘোষণার মধ্যে দিয়ে মর্যাদা এবং মান্যতা পেল বাঙালির রক্তে ভেজা একুশে ফেব্রুয়ারি।
(চলবে)