এক পায়ে ক্রিকেট খেলে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন নাটোরের সাদ্দাম

আপডেট: মার্চ ২৫, ২০১৭, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

সুফি সান্টু, নাটোর



মুশফিক-সাকিবদের মতো দুই পায়ে নয়, এক পা দিয়েই ক্রিকেট খেলে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে নাটোরের সারোয়ার হোসেন সাদ্দাম। শারীরিক অক্ষমতা সাদ্দামকে দমাতে না পারলেও ক্রিকেট খেলা দিয়েই অনেক দূরে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন সাদ্দামের। সম্প্রতি ঢাকার জহুরুল হক মাঠে প্রতিবন্ধী একটি টিমের জন্য ফিটনেস পরীক্ষা দিয়েছে সে। সমাজের অন্য শারীরিক প্রতিবন্ধীরা যখন হতাশাগ্রস্ত হয়, তখন সারোয়ার হোসেন সাদ্দাম এক পায়ে ক্রিকেট খেলে অন্য প্রতিবন্ধীদের নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা যোগায়। মনোবল এবং মানষিক শক্তি দৃঢ় থাকলে সকল প্রতিবন্ধকতা জয় করা যায়, সাদ্দাম তার উজ্জল দৃষ্টান্ত।
নাটোর সদর উপজেলার জংলী গ্রামের মৃত আবদুর রউফ পাঠানের ছেলে সারোয়ার হোসেন সাদ্দাম পাঁচ ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে চতুর্থ সন্তান। এছাড়া আট বছরের এক কন্যা সন্তানের জনক সে। জংলী মোড়ে ছোট্ট একটি দোকানে মোবাইল সামগ্রী বিক্রি করে সংসার চলে তার। সারাদিন যা উপার্জন তাই দিয়েই সংসারের খরচ বহন করেন সাদ্দাম। অবসর সময়ে ক্রিকেট খেলে সময় কাটে তার। এদিকে সাদ্দামের সঙ্গে তার ছোট ভাই ভাই মাসুমও ক্রিকেট খেলেন। দুই ভাই এক সঙ্গে জংলী ইসলামীয়া দলের হয়ে এবার জেলা ক্রীড়া সংস্থা আয়োজিত তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগে অংশগ্রহণ করেন। এই পর্যন্ত সাদ্দাম বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ম্যান অফ দা ম্যাচ হয়েছে চারবার। এছাড়া ম্যান অফ দা টুর্নামন্টে নির্বাচিত হয়েছে দুই বার।
সাদ্দামের সহধর্মীনি নাজমা বেগম বলেন, অন্য আটদশ জনের মতো তার দুই পা ছিল। বিয়ে হওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় পাওয়ার টিলার উল্টে এক দুর্ঘটনায় একটি পা হারায় সে। সাদ্দামের ক্রিকেট খেলা ছোটবেলা থেকেই পছন্দ। বিয়ের পরও সে এক পা দিয়ে একাধিক টুর্নামেন্ট খেলেছে। তবে তার প্রিয় খেলা সে ধরে রেখেছে। তার মানষিক শক্তি এবং দৃড় মনোবলের কারণে সে এখনও এক পায়ে ক্রিকেট খেলে যাচ্ছে। তার জীবনে স্বপ্ন ছিলো একদিন জাতীয় দলে চান্স পেয়ে বড় ক্রিকেটার হবে। কিন্তু একটি মাত্র দুর্ঘটনা সব শেষ করে দিয়েছে। তবে এখনও এক পায়ের উপর ভর করে যেভাবে ক্রিকেট খেলে সবার মন কাড়ে একদিন তার চাওয়া পাওয়া পূরণ হবেই।
নাটোর শংকর গোবিন্দ চৌধুরী মাঠে গিয়ে দেখা যায়, সবাই যখন দুই পায়ে ক্রিকেট খেলছেন, তখন সাদ্দাম হোসেন এক পায়ে ভর করেই মোকাবেলা করছে প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড়দের। জেলা ক্রীড়া সংস্থা আয়োজিত শংকর গোবিন্দ চৌধুরী স্টেডিয়ামে এবার তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগ খেলেন তিনি। এবারের টুর্নামেন্টে জংলী ইসলামীয়া দলের হয়ে খেলেন সাদ্দাম হোসেন। দলের ওপেনিং ব্যাটস ম্যান এবং কিপিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে সারোয়ার হোসেন সাদ্দাম।
সাদ্দাম জানান, ২০০৫ সালে তার এই স্বপ্নের বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় সড়ক দুর্ঘটনা। হারান একটি পা। কিন্তু তাতেও দমে যান নি তিনি। একটি মাত্র পা দিয়েই অবিরাম খেলে যান ক্রিকেট। অন্য আর দশটা খেলোয়াড়ের মতোই লড়াই করেন তিনি। ক্রিকটে খেলা নিয়েই বেঁচে থাকার ইচ্ছা তার। তবে সে দেশের প্রতিবন্ধী দলের হয়ে খেলার স্বপ্ন তার। সেই সঙ্গে দেশ এবং জেলার সুনাম বয়ে আনার স্বপ্ন দেখে। সাদ্দাম হোসেন শুধু বাম পা দিয়ে ক্রিকেট খেলে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সর্তীর্থ খেলোয়ার, আম্পায়ারসহ দর্শকদের। সাদ্দামের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে এসেছেন তার সহযোগী খেলোয়াড়রা। তবে এক পায়ে ক্রিকেট খেলাকে অনেকে দুঃস্বাধ্য মনে করলেও সাদ্দামের প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর মনোবল তাকে দমাতে পারে নি বলেন সহযোগী খেলোয়াড়রা।
জংলী ইসলামীয়া দলের অধিনায়ক বলেন, সাদ্দাম প্রতিটি বলে রান নেয়ার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগে রানার দেয়ার নিয়ম না থাকায় সে রান নিতে পারছেনা। তাছাড়া একজন স্বাভাবিক খেলোয়াড়ের সঙ্গে সে সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার ফুটবল কোচ বাবুল আখতার বলেন, এক পায়ে ক্রিকেট খেলা, কোন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সেই অস্বাভাবিককে স্বাভাবিক করেছে সাদ্দাম। অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সে ক্রিকেট খেলে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোস্তাক আলী মুকুল বলেন, সাদ্দামকে সঠিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে একদিন বয়ে আনতে পারে দেশের জন্য সুনাম। সেই সঙ্গে দেশের প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের হয়ে খেলানো গেলে দেশ এবং জেলার জন্য সুনাম বয়ে আনবেন তিনি। তবে সাদ্দাম হোসেনের প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর মানসিকতা কাজ লাগানো গেলে একদিন এই দেশের ক্রিকেট অঙ্গণে পরিচিত মুখ হয়ে উঠবেন তিনি এমনটাই প্রত্যাশা সবার।