এক সংগ্রামী যোদ্ধার কথা

আপডেট: ডিসেম্বর ১, ২০২২, ১:২০ পূর্বাহ্ণ

মো. রকিবুল হক তুহিন:


অনেক ক্ষণজন্মা মানুষ পৃথিবীতে আসেন আর নীরবে চলে যান। রেখে যান অজ¯্র স্মৃতি। এমনই একজন ক্ষণজন্মা মানুষের বিষয়ে জানবো। নাম তার আতাউল হক। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এঁর আহবানে মুক্তিসংগ্রামের অগ্রণী সৈনিক ছিলেন মরহুম আতাউল হক। জীবনযুদ্ধে যিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় সৈনিক। জীবনব্রতে ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর।
রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে গোদাগাড়ী উপজেলার নবগ্রামে পৈত্রিক ভিটায়। ১৯৫২ সালের ২ডিসেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সেখানে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাল কেটেছে। বাবা সামির উদ্দিন শেখ, মা রাইসান বিবি। পরিবারে সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন ২য় পুত্র। তার বড় ভাই এমদাদুল হক। ৫ বোনের মধ্যে মালেকা বেগম ছিলেন বড়। আর সবার আদরের সর্বকনিষ্ঠ বোন হচ্ছে লাল বুড়ি। আর আতাউলের ডাকনাম ছিল যুবরাজ।
আতাউল হক আমার বাবা। তিনি আমাদের সঙ্গে অনেক সময় তার জীবনযুদ্ধের গল্প করতেন। এ থেকে তার জীবনের অনেক কিছু জানা যায়। এক সময় তিনি বড় ছেলেকে বলেন, জন্মের পর বাবাকে যে জমিতে গরু দিয়ে হালচাষ করতে দেখেছি, যে পুকুরের মাছ খেয়ে বড় হয়েছি সে পুকুরগুলোর মাছ ও জমি কোনটিই আমাদের নিজেদের ছিল না। এমন কথা শুনে অবাক হই। তিনি ছিলেন তীব্র প্রতিবাদী যুবরাজের মত একজন মানুষ। যার চলাফেরা ছিল সর্বত্র।
প্রথমে নিজ এলাকায় নবগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করেন। পরে মাটিকাটা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সমাপ্ত করেন তিনি। মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিয়েও পারিবারিক অসচ্ছলতার মধ্যেও তাঁর জীবন কেটেছে ব্যস্ততার মধ্যে। শৈশবের একটা ঘটনা উল্লেখ করতে হয়, একদিন প্রাইমারি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলে পিতা তাকে আদেশ করলেন, তোমাকেও অন্য ভাইদের মতো জমির কাজে সহযোগিতা করতে হবে। আর স্কুলে গিয়ে শুধু পড়াশোনা করলেই চলবে না। পিতার এ আদেশ তাকে শিক্ষার প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলে। একদিন যুবরাজ জমিতে খাবার দিতে গিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। সেখান থেকে গিয়ে উঠেন গোদাগাড়ীর পিরোজপুরের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। বাবার ভয়ে সেখানে লজিং থেকে পড়াশুনা শুরু করেন তিনি।
মাটিকাটা হাই স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে গ্রামের প্রতিকূল পরিবেশে বড় হওয়া আতাউল হক হাই স্কুলের গ-ি পেরিয়ে ১৯৬৭ সালে রাজশাহী শহরে পড়াশোনার জন্য আসেন। সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণির বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন তিনি।
জীবন যৌবনের মধুর সময়ে বঙ্গবন্ধুর আহবানে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি দেশের ক্রান্তিকালে রাজনৈতিক অঙ্গণে ছিলেন সরব। ১৯৬৯ সালে সিটি কলেজে রাত্রিকালীন সেশনে বিকমে ভর্তি হন। বিকমে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি সপুরা অন্নদা সুন্দরী প্রাথমিক বিদ্যালয় ম্যাচ ফ্যাক্টরী স্কুলে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। প্রতিকূলতার সকল বাধা পিছনে ফেলে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে তাঁর পাশে দাঁড়ালেন রাজশাহী শহরের দূর সম্পর্কের চাচাতো বোন বছিরন বিবি। মেধাবী এ তরুণের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলেন তিনি। সুযোগটা ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে ছিলেন তিনি।
এখানেও লজিং থেকে তিনি পড়াশুনা চালিয়ে যান। এর মাঝেও তাকে ছেলে-মেয়ের শিক্ষার দায়িত্ব নিতে হয়েছে। লজিং থেকে নিজের পড়াশুনার পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের পড়ানোর দায়িত্ব সত্যিই কঠিন ব্যাপার। তা ভালভাবেই পালন করছিলেন তিনি। পরবর্তীতে নগরীর সপুরায় তার খালা গুলশান বিবি আতাউলকে ডেকে বললেন তুমি চাচাতো বোন বছিরন বিবির বাসায় না থেকে আমাদের এখানে এসে পড়াশুনা করো। একই সাথে খালু মৌলভী ময়েজ উদ্দিনও একই কথা বলেন। এক পর্যায়ে সপুরায় খালুর বাুড়র মেসে উঠতে হয় তাঁকে। সেখানে থেকে লেখাপড়া করেন তিনি।
ছাত্র জীবনেই শিক্ষার পাশাপাশি রাজশাহী মহানগরীর সপুরা ম্যাচফ্যাক্টরি এলাকায় কয়েকজনের সহযোগিতায় গড়ে তোলা হয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমান যেটি সপুরা অন্নদা সুন্দরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। যাদের সহযোগিতা আর উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে তাঁদের মধ্যে ছিলেন মরহুম নুরু মিঞা, সুলতান, বাদশা, কান্টু স্যার, কাদের স্যার, খলিল স্যার। তাদের সাথে নিয়ে তিনি চালিয়ে যান মানুষ গড়ার কার্যক্রম।
পেশাগত জীবন বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতা। তিনি সারাজীবন মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। এলাকার অনেকেই বলেছেন স্যারের হাত ধরেই আমার শিক্ষাজীবন শুরু। স্যার এমন একজন মানুষ যার চমৎকার ব্যবহার আমাদের মুগ্ধ করে। এলাকার তোতা, মুক্তার, সেলিম. মানিক, ফয়সাল আলম, হাসু, ফেরদৌস, কামরুল, ঝরনা, বুলু, মুঞ্জুয়ারা, কবীর, ইসমাইল জেবা, রেবা, আনসারী, আনসারুল, মকছেদ, মোস্তফা, জাহাঙ্গীরসহ সপুরা, জিন্নাহনগর, মালদাকলোনী এলাকার অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে যাদের মুখে শোনা যায় স্যার আমাদের জীবনে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন। তার মতো এত ভালো মনের মানুষ পাওয়া যায়না। জীবনের শেষ দিনের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন শিক্ষানুরাগী রূপে। নিজের কর্মস্থল উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে তিনি ছিলেন সম্পৃক্ত। শৈশবকাল থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিক্ষণেই রয়েছে নতুন কিছু আবিস্কারের প্রচেষ্টা। এখানে উল্লেখ্য যে, একমাত্র মেয়ে মৌসুমী বাবার পথ অনুসারি হয়ে নিজেকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রেখেছেন। শিক্ষকতা জীবনে ছিল অসংখ্য বন্ধু কিবরিয়া, মান্নান, তালেবুর, ফরমান, খলিল, আজিজ নওদাপাড়া, সোবহান প্রমূখ।
ছাত্র জীবনের শুরু থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। সিটি কলেজে পড়ার সময় শুরু থেকেই ১৯৬৯ সালের ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গণআন্দোলনের মিছিলে নেতৃত্বদানকারী সিটি কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের নেতা নুরুল ইসলামের সাথে উপস্থিত ছিলেন আতাউল হক। এক সময় তার বড় ছেলে তুহিনকে জীবনের এ গল্পটা শুনাতে বললে তিনি বলেন: সোনাদিঘি মোড়ে যে স্থানটিতে পাকিস্তানি পুলিশ বাহিনীর গুলিতে নিহত হন নুরুল ইসলাম। সেই স্থানটিতে মিছিলের সম্মুখসারিতে আমিও ছিলাম। সেখানে দেখলাম চোখের সামনে এক তাজা প্রাণ ঝরে গেল। ছত্রভঙ্গ হয়ে আমরাও এদিক সেদিক ছুটে চললাম। আমি নিজে ব্রিটিশ কাউন্সিলের এ গলিপথ দিয়ে বের হয়ে গেলাম। আর তখন থেকেই রাজনীতির অঙ্গনে পদচারণা।
বঙ্গবন্ধুর আহবানে পাকিস্তানি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙ্গতে সারাদেশে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন স্বাধীনতাকামী সকল মানুষ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক আতাউল হক নীতি-নৈতিকতার কাছে আপোসহীন ছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন আপোসহীন ছিলেন তেমনি আতাউল হকও ছিলেন ঠিক তার সত্যিকারের আদর্শিক একজন অনুসারী। রাজশাহী মহানগর আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুদুল হক ডুলুর সঙ্গে ছিল আতাউল হকের পারিবারিক সম্পর্ক। গ্রামের সহজ সরল এ ছেলেটি রাজশাহীর সকল আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন অগ্রসৈনিক।
স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরুতে সারাদেশ যখন উত্তাল ঠিক তখন রাজশাহী পলিটেকনিক কলেজের সামনের মাঠ যেটি বর্তমানে সমাজসেবা কার্যালয় সেখানে মুক্তিযুদ্ধের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। মুক্তি সংগ্রামের এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি আরও বলেন, মুক্তিসংগ্রামের শুরুতে সারাদেশ যখন আন্দোলনে উত্তাল পাকবাহিনীর সদস্যরা রাজশাহী শহরেও বিভিন্নভাবে দমনে ব্যস্ত ছিল। রাজশাহীতে পাকবাহিনীর করাচির একজন সেনাকর্মকর্তার নেতৃত্বে রাজশাহী স্টেডিয়ামে সেনাক্যাম্প স্থাপন করে। আতাউল হক এ বিষয়ে বলেছিলেন, এ দেশ আলাদা হোক পাকবাহিনীর মধ্যেও এমনটি মনে করেছিল। করাচির সেই সেনা কর্মকর্তা লোক মারফত স্বেচ্ছাসেবকদের আমন্ত্রণ জানান সেনা ক্যাম্পে প্রতিদিন ট্রেনিং শেষে এখানে এসে চা টোস্ট দিয়ে নাস্তা করতেন। এভাবে স্বেচ্ছাসেবকরা ট্রেনিং কাজ অব্যাহত রাখত। জীবনের নানা বিষয় তিনি এভাবে ব্যক্ত করেন ছেলেকে। এখানে উল্লেখ করার মতো একটি ঘটনা হচ্ছে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য নিজেকে সম্পৃক্ত করে তিনি নিজেকে গর্বিত বোধ করতেন। মুক্তি সংগ্রামের স্বেচ্ছাসেবকদের ট্রেনিং কার্যক্রম যেন দানা বাধতে না পারে সেজন্য তাঁকে ধরার আদেশ জারি করা হয়। এমনি পরিস্থিতিতে তাঁকে খবর দেয়া হয় তিনি যেন এখনই রাতের অন্ধকারে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এ খবর পেয়ে তিনি রাজশাহী শহর থেকে তানোর এলাকায় পাড়ি জমান। ক্ষুব্ধ পাক বাহিনীর সদস্যরা সপুরায় তার সেই ঘরে থাকা পড়াশোনার বই খাতা, কাপড়সহ সব কিছু আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
বাস্তব জীবনে তিনি এতটাই অন্তর্মূখী যে নিজের সম্পর্কে খুব বেশি আলাপ করতেন না। কিংবা নিজেকে জাহির করার বিষয়টি এড়িয়ে চলতেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে মানুষটি সফল তার আবার কি চাই? দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে তিনবার জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হয়েছেন। শিক্ষক সমিতির নির্বাচনেও অংশ নিয়ে শিক্ষক নেতা হয়েছিলেন। স্কাউটিং বিষয়েও তাঁর ছিল ব্যাপক পরিচিতি। তিনি নিজে স্কাউটিং-এ প্রশিক্ষকের উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। স্কাউটিং-এর মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশে ভূমিকা ছিল তার। তিনি নিজেও নেতৃত্বের গুণাবলিতে ভরা ছিলেন। শিক্ষানুরাগীর পাশাপাশি তিনি ছিলেন ক্রীড়ানুরাগীও। লেখাপড়া আর খেলাধুলাই তার অনেক আগ্রহ ছিল। ফুটবলের প্রতি তার এতো আগ্রহ ছিল যে, রাজশাহী জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সকল খেলা দেখা তার চাই। ফুটবল খেলা দেখার প্রোগ্রাম ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর একটি অভ্যাস। জীবনে কখনও ওয়াপদার মোড়, উপশহর মোড়, অলকার মোড়, ম্যাচফ্যাক্টরি মোড়ে আড্ডা দিতেন। সেকারণে তার বন্ধুর সংখ্যাও ছিল অনেক।
প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকার শিক্ষক সহকর্মীরা বিভিন্ন বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে বাড়িতে আসতেন। শিক্ষকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে শুনতাম। তিনি এমনই একজন মানুষ যিনি প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফল হয়েছেন।
উদার মানসিকতার লোক ছিলেন তিনি। তার গ্রামের সম্পত্তির অংশ আপন ভাইদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন। সেগুলো কখনও নিজের বলে দাবিও করেননি। ভাই-বোন ও আত্মীয়ের কাছে তিনি ছিলেন ছাতার মত। প্রত্যেকের বিপদে-আপদে তিনি ছিলেন আশা-ভরসার ঠিকানা। সকলের সমস্যাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখতেন। জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকলেও কখনো বিচলিত কাউকে বুঝতে দিতেন না। নিজের বিষয়ে তিনি যেমন ছিলেন চাপা, তেমনি অন্যের বিপদাপদে ছিলেন উদার। তিনি মুক্তিযোদ্ধা হয়েও কোনো সার্টিফিকেট নেননি। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের যখন সঠিক মূল্যায়ন করছেন তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আজকে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও সার্টিফিকেট না থাকায় আপনাকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এটা আমাদের সবার জন্য দুঃখজনক। আপনি কেন সে সময় মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নেননি, এতে আপনি ও আপনার সন্তানরা বঞ্চিত হচ্ছে। এসব প্রশ্নের উত্তরে তিনি প্রতিবাদের সুরে বলে উঠেন, আমি তো কোনো কিছু পাবার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। আমি দেশ-মাতৃকার মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তিনি সন্তানের সঙ্গে আলাপকালে সব কথা বলেন। তাকে দেখলে এবং তার কথা শুনলে আশ্চর্য হতে হয়।
তিনি অসাধারণ মানসিকতার একজন মানুষ। নিজ আত্মীয় স্বজনের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ ভালবাসা। গ্রামের আত্মীয়-স্বজন মেহমান আসলে তিনি খুবই খুশি হতেন। তাঁদের কি খাওয়াতে হবে এ নিয়ে তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। কিছু আত্মীয়ের মেডিক্যাল বা কোর্টে কোন কাজের জন্য শহরে আসলে একমাত্র ঠিকানা হিসেবে তাঁর বাড়িকে সঠিক ঠিকানা বলে মনে করতেন। সেখানে এসে দিনের পর দিন থাকতেন আপন মনে করে।
জীবনতো একটাই। তিনি বিয়ে করেছিলেন আপন খালাতো বোনকে। নাম রোকেয়া বেগম রেখা। জীবন সংগ্রামের প্রকৃত একমাত্র বন্ধু হিসেবে তাকে মনে করতেন। যাকে কখনও দূরে রাখতেন না। যেকোন স্থান থেকে বাড়ি ফিরে আসলে প্রথমেই রেখা রেখা বলে ডাকতে থাকেন। একটু দেরি হলেই কেন হলো, কোথায় থাক এ সব প্রশ্নের জবাব দিতে হতো রেখাকে। দাম্পত্য জীবন ছিল অতি আনন্দের ও মধুর। সকল সুখ যেন পরিপূর্ণভাবে বিধাতা তাঁদের দিয়েছিলেন। সুখের সংসারে তাদের এক এক করে তিনটি সন্তান দিয়েছেন আল্লাহতায়ালা। ছেলে দুটি ছোট আর মেয়েটি বড়। তাঁদের শিক্ষা-দীক্ষায় মানুষের মত করে গড়ে তুলতে কোনো কার্পণ্য করেননি তিনি। বড় ছেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আর মেয়েটি বাবাকে অনুসরণ করে হয়েছেন শিক্ষক। ছোট ছেলে ব্যবসাকে বেছে নিয়েছেন। জীবনে চলার পথে অনেক সময় তিনি কঠিন আবার কখনও কখনও সরল হয়ে সবাইকে কাছে টেনে নিতেন। কোনো সময় বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতেন না তিনি। কিভাবে সবকিছুকে স্বাভাবিক করা যায় সেটা নিয়েই তিনি ব্যস্ত থাকতেন। শিশুদের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ ভালোবাসা। যা সকলকে আকৃষ্ট করতো। প্রতিটি শিশুকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করাকে তিনি ভীষণ পছন্দ করতেন। আনন্দঘন মুহূর্তের প্রতিটি দিবস তিনি উদযাপন করতে যতœ করে। কেউ ভুলে গেলে তিনি সবাইকে মনে করিয়ে দিতেন। একইসাথে উইস করতেন। ছেলে মেয়ে নাতি-নাতনির জন্ম দিন কিংবা বিবাহ বার্ষিকী যেন কোনটিও বাদ যেত না। তিনি এমনই একজন মানুষ ছিলেন যিনি সব কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিতে ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন আখি অনি স্মৃতি সৌরভ সোহেল জীবুসহ ছোট বেলার নাতি-নাতনির অতি প্রিয় নানা। এক দিনের একটি ঘটনার কথা না বললেই নয়, ৩ বছর বয়সী নাতনি সন্ধি উকুননাশক ওষুধ মুখে দিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হলে ভীষণভাবে আবেগে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। ছেলেকে ফোন করে বলেন, তুমি এক্ষুণই আসো ওকে হাসপাতালে নিতে হবে। পরে একটি ক্লিনিকে নিয়ে ওয়াশ করে সন্ধিকে সুস্থ করা হয়। এরপর তিনি যেন প্রাণ ফিরে পান। এমনি ছোট ছোট নানান ঘটনা হর্ষে-বিষাদে দিনগুলো অতিবাহিত হয় তাঁর। খেলাধুলার প্রতি ছিল তার প্রগাঢ় ভালোবাসা। গ্রামের পরিবেশে বড় হওয়া সেই ছেলেটি এমন কোন খেলা ছিলনা যে খেলা দেখতে তিনি জেলা স্টেডিয়ামে যেতেন না। সব খেলাতেই তাঁর আগ্রহ থাকতো। তবে ফুটবল খেলায় বেশ পটু ছিলেন তিনি। আর এ আগ্রহ থেকে বড় ছেলে বক্সিং খেলার প্রতি আগ্রহী হলে তিনি প্রথমে একটু নিম রাজি থাকলেও পরবর্তীতে এ বিষয়ে তিনি বন্ধুমহলে গর্ব করে বলতেন, আমার ছেলে জাতীয় পর্যায়ে খেলাধুলার সাথে জড়িত। সে এখন জাতীয় রেফারির দায়িত্ব পালন করে।
২০১৭ সালের ১লা ডিসেম্বর ভোরে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন তিনি। জন্ম যখন হয়েছে মৃত্যু তখন হবেই। মানুষ মাত্রই মরণশীল। এ সত্যকে মেনে নিয়েই আমরা বেঁচে আছি। তবে যারা ক্ষণজন্মা তারা মৃত্যুর পরও অসংখ্য কীর্তিময় স্মৃতি রেখে যান। যা মানুষকে নাড়া দেয়। মানুষকে ভাল কাজ করতে উজ্জীবিত করে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ৬৭ বছর বয়সে মহান এ মানুষটি পৃথিবী থেকে চলে যান।
তবে সেটিও ঘটেছিল এমন একটি দিনে, যেদিন অসুস্থ বড় ছেলে তুহিন উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে যাবার উদ্দেশে রওয়ানা হচ্ছেন। সেদিন ভোরের ট্রেনে রওয়ানা হবার প্রাক্কালে বাবার কাছে বিদায় নিতে গিয়ে দেখে বাবা সকলের কাছ থেকে নীরবে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন।