এমপিও শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতি-একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ

আপডেট: আগস্ট ২৫, ২০১৭, ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ

আব্দুর রাজ্জাক রিপন


ভূমিকা
চিন দেশে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, ‘তুমি যদি স্বল্পতম সময়ে ফল লাভ করতে চাও, তাহলে মওসুমি ফসলের চাষ কর; তবে তুমি ফসল পাবে একবার মাত্র, আর যদি তুমি দশ বছর ধরে ফল পেতে চাও, তাহলে চাষ কর ফলদার বৃক্ষের। আর তুমি যদি শতাব্দীকাল ধরে ফল পেতে চাও তাহলে মানুষের চাষ কর।’ বলাবাহুল্য মানুষের চাষ মানে হলো একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন। এই শিক্ষাব্যবস্থার ওপরই কোন জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রাসাদ বিনির্মিত হয় এবং এই ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতাই বিশ্বের দরবারে কোন জাতির মর্যাদা নির্ণয়ের প্রধান সূচক। কোনো জাতি তখনই সভ্যতার সোপান বেয়ে সুউচ্চ আসনে সমাসীন হয় যখন তার শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত ও সুস্থ এবং মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যদি সে জাতির শিক্ষাব্যবস্থা হয় ক্রটিযুক্ত তাহলে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে বাধ্য গোটা জাতির মন-মানসিকতায়, আচার-আচরণে এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে। একটা জাতির উন্নতির চাবিকাঠি হল শিক্ষা। দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্য পূরণে শিক্ষাই হচ্ছে প্রধান অবলম্বন। মেধা ও মননে আধুনিক এবং চিন্তা-চেতনায় অগ্রসর একটি সুশিক্ষিত জাতিই একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। তাই শিক্ষাই জাতির মেরুদ-।
শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর আলোকে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে- সকল শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা। মানবতার বিকাশ এবং জনমুখি উন্নয়ন ও প্রগতিতে নেতৃত্বদানের উপযোগী মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, নিজের এবং অন্যান্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত, পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক এবং কর্মকুশল নাগরিক গড়ে তোলা। পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমেই জাতিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার বৈশিষ্ট্য ও দক্ষতা অর্জন করতে পারা। এই শিক্ষানীতি দেশে গণমুখি, সুলভ, সুষম, সর্বজনিন, সুপরিকল্পিত, বিজ্ঞানমনস্ক এবং মানসম্পন্ন শিক্ষাদানে সক্ষম শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি ও রণকৌশল হিসেবে কাজ করবে।
বে-সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাপনা
বে-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এ পর্যন্ত একক কোনো নীতিমালা/নিয়মাবলি তথ্য নির্দেশনা নেই। সরকার সময়ে সময়ে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নীতিমালা জারি করেছেন যার আলোকে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারটি যুক্তরাজ্যের শাসনতন্ত্রের সাথে তুলনীয়। অতবড় একটি দেশ অথচ তার শাসনতন্ত্র নেই শুনেই চমকে উঠতে হয়। আসলে কথাটা ঠিক নয়- যুক্তরাজ্যের শাসনতন্ত্র আছে কিন্তু সেটা ‘অলিখিত’ অর্থাৎ অন্যান্য দেশের শাসনতন্ত্রের মত এক সময়ে প্রণয়ন করা হয়নি। প্রয়োজনের তাগিদে এবং সময়ের আলোকে একটি একটি আইন জারি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে জারিকৃত আইনের প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল যুক্তরাজ্যের জনগণ সেসব আইন মিলিয়েই তৈরি করেছে তাদের শাসনতন্ত্র। তাই আমাদের দেশের বে-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের নীতিমালা যুক্তরাজ্যের শাসনতন্ত্রের সাথে তুলনীয়। এদেশে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে বে-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের অবদান সর্বাধিক। প্রতিনিয়িত প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে দুর্গম অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করছে শিক্ষার আলোকবর্তিকা দেশের আপামর জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে। উদ্দেশ্য, চিন্তা, ভাবনা একটাই আর তা হচ্ছে দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়া। আর সে লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য প্রয়োজন জাতিকে শিক্ষিত করে তোলা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার প্রায় ৯৭% শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত। এ পর্যায়ের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত। তাঁরা প্রজাতন্ত্রের শিক্ষা পরিবারে সর্বাধিক সংখ্যক জনবল। কিন্তু, প্রজাতন্ত্রের কাছে তাঁরা নানারূপ অবহেলার শিকার। তাঁরা তাঁদের বহু নায্য ও মৌলিক অধিকার থেকে আজো বঞ্চিত। আমরা আজ একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। কিন্তু, একটা স্বাধীন শিক্ষানীতি পেতে আমাদের প্রায় চল্লিশ বছর পথ চেয়ে বসে থাকতে হয়েছে। সে স্বাধীন শিক্ষানীতিটি বাস্তবায়নের গতি খুব মন্থর বলে মনে হয়। ২০১০ সালে প্রণীত বহুল কাক্সিক্ষত শিক্ষানীতির আজো সিঁকি ভাগ বাস্তাবায়িত হয়নি। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আমাদের শিক্ষায় প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসবে, শিক্ষাক্ষেত্রে  নানা বৈষম্যের অবসান হবে এবং সর্বোপরি দেশের এমপিও শিক্ষকদের নানা দুর্গতির অবসান হবে।
বে-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমস্যা
দেশের প্রায় ৯০ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বে-সরকারি হলেও এবং দেশের শিক্ষা বিস্তারে অবদান সর্বাধিক হলেও এর বহুবিদ সমস্যা বিদ্যমান যেমন-
অদক্ষ, নিরক্ষর, অর্ধ-শিক্ষিত ও দলীয় ম্যানেজিং কমিটি/ গভর্নিং বডি।
শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে মেধার পরিবর্তে অর্থ, আত্মীয় ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি।
প্রতিষ্ঠান প্রধানের দুর্নীতি, আত্মীয়করণ, অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার।
বদলি ও পদোন্নতি না থাকা।
সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং এর অভাব ইত্যাদি।
বদলি ও পদোন্নতি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
বদলি ও পদোন্নতি যে কোনো চাকরিজীবীর মৌলিক অধিকার। মাইনে বা বেতনের মতো এ দুটো অধিকার সকলের নায্য পাওনা। প্রয়োজনের তাগিদে বদলি এবং মেধার স্বীকৃতি স্বরূপ পদোন্নতি যে কোনো মানুষের কর্মোদ্যম ও কর্মস্পৃহা বহুগুণ বৃদ্ধি করে। বদলি কেউ এমনিতে প্রত্যাশা করে না। একান্ত প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ বদলি চায়। কিন্তু সে দ্বারটি যদি রুদ্ধ থাকে, তবে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে স্বীয় কাজে আনন্দ ও আগ্রহে ভাটা পড়ে। অনুরূপ, সব মানুষের মেধা কিংবা প্রতিভা সমান নয়। প্রকৃতিগতভাবে মানুষে মানুষে মেধার পার্থক্য। কোনো মানুষের মেধা ও প্রতিভার স্বীকৃতি তার আত্মমর্যাদা যেমন বৃদ্ধি করে, তেমনি তার কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে লাভবান হয় দেশ ও জাতি। প্রজাতন্ত্রের অধীনে জাতি গঠনের মতো গুরু দায়িত্ব পালন করেও এ দুটি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এ দেশের এমপিও শিক্ষকরা। বদলি না থাকায় তাঁরা যেন খাঁচাবন্দি কর্মজীবন অতিক্রান্ত করেন। এক জায়গায় কাজ করতে করতে তাঁদের এমন একটা একঘেঁয়েমি পেয়ে বসে, যা তাঁদের কর্মস্পৃহা ও কর্মোদ্যম হ্রাস করে। আবার, অতি প্রয়োজনেও বদলি না থাকায় বেদনার যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয় তাঁদের। একইভাবে মানুষ তার মেধা ও প্রতিভার স্বীকৃতি না পেলে তার আগ্রহে ভাটা পড়া একান্ত স্বাভাবিক। একই অবস্থায় থেকে কাজ করতে করতে যে কারো মনোবল ও আকাক্সক্ষা বাধাগ্রস্ত হয়। পদোন্নতির সুযোগ মানুষের উচ্চাশা জাগ্রত করে এবং প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করে। তাই, সর্বত্র সব কাজে বদলি ও পদোন্নতি অপরিহার্য দুটি বিষয়। বদলি ছাড়া যে কোনো পেশার মানুষ খাঁচাবন্দি পাখির মতো, যার আকাশে উড়ার অনন্ত ইচ্ছা খাঁচার ভেতর কেবলি ছটফট করে মরে। পদোন্নতি ছাড়া যে কেউ মেঘ ঢাকা সূর্যের মতো, যে মেঘের আড়াল ছেদ করে পৃথিবীটাকে আলোকিত করার অদম্য আকাক্সক্ষা পোষণ করলেও শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে আলোর মুখ দেখাতে পারে না।
শিক্ষানীতি ২০১০ এ বদলি ও পদোন্নতি সংক্রান্ত নির্দেশনা
আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এ এমপিও শিক্ষকের পদোন্নতি ও বদলি বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। শিক্ষানীতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এমপিও শিক্ষকদের বহুদিনের লালিত এ দুটি স্বপ্ন পূরণ হবে। আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতিতে এমপিও শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতি বিষয়ে যে নির্দেশনা আছে, সে বিষয়ে এখানে একটু আলোকপাত করা খুবই প্রাসঙ্গিক হবে। শিক্ষানীতিতে ‘শিক্ষকের মর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্ব’ শীর্ষক অনুচ্ছেদের (৩) উপ-অনুচ্ছেদে পদোন্নতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘শিক্ষার সকল পর্যায়ে শিক্ষকের পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা এবং শিক্ষার সকল পর্যায়ে তাদের শিক্ষার মান বিবেচনায় আনা হবে। সে জন্য শিক্ষকের মান নির্ণয় করার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে। গৃহীত প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার সর্বস্তরে পদোন্নতি বিবেচনায় আনা হবে। অনুরূপ, শিক্ষানীতিতে ‘শিক্ষানীতির আওতাধীন এমপিওভুক্ত সকল ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলি ও পদোন্নতি’ শীর্ষক অনুচ্ছেদের ৫ নং উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল পর্যায়ের সকল ধারার সকল স্তরের এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণের চাকুরী সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় বদলিযোগ্য হবে। সরকারি প্রয়োজনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণকে সমধারার সমস্তরের প্রতিষ্ঠানে সমপর্যায়ের পদে বদলি করা হবে।’
এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ
শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বান্ধব বর্তমান সরকার শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে ঘোষণা করেছে ভিশন ২০২১। বঙ্গবন্ধুর কন্যার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, খাদ্য, বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি শক্ত অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।
উপসংহার
সরকার সম্প্রতি একটি শিক্ষা আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এর খসড়া ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে দিয়ে তাতে সকলের মতামত আহবান করা হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি, চূড়ান্ত শিক্ষা আইন শিক্ষানীতির অনুসরণেই রচিত হবে। শিক্ষা আইন শিক্ষানীতির সাথে সাংঘর্ষিক হবে না। শিক্ষানীতিতে কোনো ঘাটতি থাকলে তা যেন শিক্ষা আইনে পূরণ হয়। শিক্ষা আইন শিক্ষানীতির সম্পূরক কিংবা পরিপূরক হোক- সে আমরা সকলে চাই। যেহেতু শিক্ষানীতিতে এমপিও শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতির বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়ছে, সেহেতু শিক্ষা আইনে তা বাস্তবায়নের কর্মকৌশল নির্ধারিত হওয়া উচিত। তাঁদের জন্য বদলি ও পদোন্নতির সুযোগ থাকা প্রয়োজন। যত দ্রুত এমপিও শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতি চালু হবে, তত তাড়াতাড়ি জাতি এর সুফল ভোগ করতে শুরু করবে। শিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে ও সম্পূর্ণ মানবিক কারণে অবিলম্বে এ দুটি বিষয় চালু করা হোক। এ দুটি কাজে রাষ্ট্রের আর্থিক দায়-দায়িত্ব বর্তাবে সত্যি, তবে তা ক্ষতির কেনো কারণ হবে না। এমপিও শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ ত্বরান্বিত করার জন্য তাঁদের বদলি ও পদোন্নতি চালু করার বিষয়ে কালক্ষেপণ আর সঙ্গত হবে না। ভিশন-২০২১’র কর্মপরিকল্পনা সফল ও সার্থক করতে যা যা করা দরকার, সরকার তা-ই করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন-২০১৬ তে এমপিও শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতির সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকবে, এই সু-সংবাদ পাবার আশায় আমরা চেয়ে থাকলাম।
লেখক : সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার), মসজিদ-ই-নূর দাখিল মাদ্রাসা, রাজশাহী।