বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

এসটিসির ব্যাংক কার্যক্রম বন্ধ, লাখ লাখ টাকার লোকসানে কর্মীরা

আপডেট: January 19, 2020, 1:18 am

বুলবুল হাবিব


আব্দুল্লাহ আল মারুফ রাজশাহীর গোদাগাড়ী এসটিসি ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন। দুই মাস ধরে ব্যাংকটি বন্ধ। চাকরি শুরুর সময় আব্দুল্লাহ আল মারুফ ৬ লাখ টাকা এসটিসি ব্যাংকে ডিপোজিটের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তার মতো আরো ৬ জন এমপ্লয়ি আছেন গোদাগাড়ী শাখায়। তারাও বিভিন্ন অংকের টাকা ফিক্সড ডিপোজিটের মাধ্যমে গোদাগাড়ী শাখায় চাকরি নিয়েছিলেন। এর মধ্যে তিনজন সিনিয়র অফিসার ৫ লাখ টাকা, একজন অ্যাসিসট্যান্ট অফিসার ৩ লাখ টাকা ও একজন অফিস সহকারী ১ লাখ টাকা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিটের মাধ্যমে চাকরি নিয়েছেন। ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত এই ব্যাংক থেকে বিভিন্ন মেয়াদে গ্রাহকদের মাঝে ৭ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে।
৩ অক্টোবর গোদাগাড়ী শাখার কার্যক্রম উদ্বোধনের মাধ্যমে এসটিসি ৫০তম শাখা ব্যাংকের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।
গোদাগাড়ী শাখার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যাংকের রশিদ বাবদ এসটিসি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ১ লাখ টাকা প্রদান করতে হয়েছে গোদাগাড়ী শাখাকে। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে মুনাফার জন্য ২০ হাজার টাকা দাবি করেছিলো। সেই টাকাও মুনাফা হওয়ার সাপেক্ষে দেয়ার কথা ছিলো।
আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, আমরা এমপ্লয়িরা যে টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করেছি। সেই টাকায় গ্রাহকদের ১০ শতাংশ ইন্টারেস্টে লোন দেয়া হয়েছে। লোনের মুনাফা থেকেই আমাদের এমপ্লয়িদের বেতন দেয়া হতো। কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৭ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। এখন এই ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা যারা ওয়ার্কার আছি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। কারণ ব্যাংক না থাকায় ওই ৭ লাখ টাকা লোন তো তুলতে পারছি না। ব্যাংক না থাকায় অনেক গ্রাহক এখন আর লোন পরিশোধ করতে চাচ্ছেন না। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের যা লাভ করার তা তো করেই নিয়েছে। প্রতিটি ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা করে নিলেও তো ৫৯ লাখ টাকার ব্যবসা তাদের হয়ে গেছে। এছাড়া ব্যাংকের ডেকোরেশনের জন্য ৫ লাখ টাকা আমাদেরই দিতে হয়েছে।
নগরীর রেশমপট্টিতে এসটিসির বিভাগীয় কার্যালয় রয়েছে সেখানকার প্রিন্সিপাল অফিসার সুলতান কবীরও ৫ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিটের মাধ্যমে চাকরি নিয়েছেন। তার মতো এই শাখার ১০ কর্মী একইভাবে বিভিন্ন অংকের অর্থ ফিক্সড ডিপোজিটের মাধ্যমে নিয়োগ নিয়েছেন।
সুলতান কবীর বলেন, ব্যাংক বন্ধ হওয়ায় আমরা যারা কর্মী রয়েছি তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তার মতো শতশত কর্মী এখন ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
ব্যাংকিং কার্যক্রমের অনুমোদন না নিয়েই রাজশাহীতে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছিলো স্মল ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ ব্যাংক বা সংক্ষেপে এসটিসি ব্যাংক। ছয় মাস পর অনুমোদন না থাকায় ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন। তারপর ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সুপ্রিম কোর্টে অনুমোদনের আশায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। গত বছরের নভেম্বর মাসে ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন নিতে পারেননি কর্তৃপক্ষ। ফলে দুই মাস ধরে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যাংকের কর্মীরা। ইতোমধ্যে রাজশাহীর বিভাগীয় প্রধান রাজশাহীর সব শাখা বন্ধ করে দিয়েছেন। সাইনবোর্ড-ব্যানারও খুলে নিয়েছেন। রাজশাহীতে মোট ৮টি শাখা কার্যালয় রয়েছে ব্যাংকটির।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্মল ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেড বা সংক্ষেপে এসটিসি ব্যাংক লিমিটেড ১৯৭৬ সালে নারায়ণগঞ্জে ‘ব্যাংক’ নাম নিয়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। তখন সমবায় মন্ত্রণালয় তাদের অনুমতি দিয়েছিলো বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দাবি করেন। এরপর ২০১২ সালে ‘ব্যাংক’ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না বলে সমবায় অধিদপ্তর বিজ্ঞপ্তি জারি করলে তার বিরুদ্ধে এসটিসি কোর্টে রিট করে। কোর্ট তখন স্ট্যাটাস কো জারি করে। স্ট্যাটাস কো’র মাধ্যমে সময় বাড়িয়ে নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলো এসটিসি। এর মধ্যে এসটিসি রাজশাহীতে তাদের কার্যক্রম ২০১৮ এর এপ্রিল মাসে শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশে এসটিসির ৫৯ টি শাখা কার্যালয় রয়েছে। রাজশাহীতে রয়েছে ৮ টি শাখা কার্যালয়। সর্বশেষ গত ১৩ নভেম্বর তাদের এক বছরের স্ট্যাটাসকোর মেয়াদ শেষ হয়। ব্যাংক কথাটি লেখা থাকলেও ব্যাংক হিসাব খোলা, টাকা জমাদান গ্রহণ, আমানত সংগ্রহ কার্যক্রম ছিলো না। শুধুমাত্র এমপ্লয়িদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা হতো। এই ঋণ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা থেকেই এমপ্লয়িদের বেতন প্রদান করা হতো।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, কোর্ট তাদের আরো একবছর সময় দিয়েছে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। কিন্তু এরপর আর সময় বাড়ানো হবে না বলে নির্দেশনা দিয়েছে।
এসটিসি ব্যাংকের রাজশাহীর রেশমপট্টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক কামাল পারভেজ বলেন, এই এক বছরের মধ্যে ব্যাংক শব্দটি ব্যবহার আমাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু রাজশাহীর প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে স্ট্যাটাস কো ২০১২ সালে যেসব শাখার কার্যক্রম চালু ছিলো তাদের জন্য প্রযোজ্য। এটা রাজশাহীর জন্য প্রযোজ্য না। হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে আসা হলে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। অথচ তারা এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
কামাল পারভেজ বলেন, দুই মাস থেকে ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। রেশমপট্টির শাখা থেকে ৬০ লাখ টাকার মতো ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা হয়েছে। এসবই আমাদের নিয়োগপ্রাপ্ত টাকা থেকে প্রদান করা হয়েছে। এখন ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ঋণের টাকা শোধ করছেন না। বলছেন ব্যাংক চালু হলে তবেই টাকা দেয়া হবে। তবে দীর্ঘ দিন ব্যাংক বন্ধ হওয়ায় লোকসানে পড়ছি আমরা। ইতোমধ্যে আমরা বিভাগীয় কার্যালয় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছি।
তবে এসটিসি ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক শেখ ফরিদ আহাম্মেদ বলেন, আমি এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এসটিসি ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক ছিলাম। তারপর তাদের পদ থেকে অব্যাহতি নিই। তারা ১৯৭৬ সালে সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে শুধুমাত্র নারায়ণগঞ্জ জেলায় সমবায় ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমোদন নেয়। পরে হাইকোর্টে রিট করে সারা বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই ব্যাংকের চেয়ার মির্জা আতিকুর রহমান বিভিন্ন জায়গায় জালিয়াতি করে অর্থ সংগ্রহ করে। আমিও আড়াই কোটি টাকার মতো পাব। আমি নিজেই মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
তবে রাজশাহী বিভাগীয় সমবায় অধিদপ্তর থেকে তাদের ব্যাংক কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিভাগীয় সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম-নিবন্ধক মো. গোলাম সারওয়ার বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রট (এডিএম) আবু আসলাম বলেন, এসটিসি ব্যাংককে রাজশাহীতে তাদের সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তারা ২০১২ সালের হাইকোর্টের একটি নির্দেশনা স্ট্যাটাস কো দেখাচ্ছিলো। স্ট্যাটাসকো হচ্ছে প্রতিষ্ঠান যেভাবে আছে ঠিক সেইভাবেই চলবে। কেউ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না। কিন্তু ওই স্ট্যাটাস কো বলবত থাকবে ২০১২ সালে যেসব এলাকায় তাদের কার্যক্রম ছিলো সে এলাকার জন্য। এটা রাজশাহীর জন্য প্রযোজ্য না। কোনো অনুমতি নেই, লাইসেন্স নেই রাজশাহীতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের বলা হয়েছে, এরপর কার্যক্রম পরিচালনা করা না হলে দণ্ড প্রদান করা হবে।