এ দায় কার?

আপডেট: আগস্ট ৩১, ২০১৭, ১:১৯ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানি চন্দ


বিগত ২০ জুলাই বৃহস্পতিবার সাত দফা দাবিতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় অধিভুক্ত ৭টি কলেজের শিক্ষার্থীরা শাহবাগে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ করে। অন্যতম প্রধান দাবি ছিল রুটিনসহ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা। উল্লেখ্য, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৭টি কলেজকে ৬ মাস আগে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আওতায় দেওয়া হয় যার উদ্দেশ্য ছিল, সার্বিকভাবে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় অধিভুক্ত হওয়ার পর এর স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। উল্লেখ্য, এ ৭ কলেজের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ। এ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর নেই কোন সিলেবাস, নেই পরীক্ষা বা ফরম ফিলআপের কোনো তারিখ। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এমনকী জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু কোনো ফল হয়নি তাতে। বাধ্য হয়ে তারা রাস্তায় নামে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে। বড় ধরনের সেশন জট ও অনিশ্চয়তা থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্যই ছিল তাদের জমায়েত। কোন অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না তাদের। কিন্তু তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাদ সাধে এদেশের গণমানুষের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনি। রাস্তাঘাট বন্ধ করে বিক্ষোভ করায় যান চলাচল বন্ধ হওয়ায় পথচারীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। পুলিশ বাহিনি শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারত। পুলিশ বাহিনি তা না করে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি করলো যা অনেক নিরীহ শিক্ষার্থীকে বিরল অভিজ্ঞতার সম্মুখিন করলো। পুলিশের বেপরোয়া লাঠির আঘাত এবং টিয়ার গ্যাসে আহত হলো অনেক শিক্ষার্থী। সবকিছু ছাপিয়ে খুব নিকট থেকে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমানকে আঘাত করা টিয়ার গ্যাসের মারাত্মক ক্ষতিকর পরিণতি ডেকে আনে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর সুরক্ষায় পুলিশ বাহিনি সহযোগিতা করেনি। একজন পথচারী তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় চিকিৎসার জন্য।
বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে শুধুমাত্র তারিখ ঘোষণা করা নিয়ে এত বড় ঘটনা ঘটে গেলো সে তারিখ দু’দিন পূর্বেই নির্ধারিত হওয়া সত্ত্বেও তা শিক্ষার্থীদের গোচরিভুত করা হয়নি। কর্তৃপক্ষ যদি এ সৌজন্যটুকু প্রদর্শন করতো তাহলে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষার্থীরা যখন শাহবাগে সমবেত হয় তখনও যদি তাদের পরীক্ষার তারিখ জানানো হতো তাহলে আজ সিদ্দিকুরের মতো একজন সুস্থ স্বাভাবিক তরুণের এ করুণ পরিণতি হতো না।
অতি কষ্টে শুধুমাত্র শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরি করে পরিবারের সদস্যদের দুঃখ মোচনের লক্ষ্যে সিদ্দিকুর অমানবিক পরিশ্রম করে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিল। অন্য সহপাঠীদের সাথে তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সমবেত হওয়ায় আজ তাকে দৃষ্টিহীন হতে হলো। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। তার সুচিকিৎসার জন্য তাকে চেন্নাইয়ের শঙ্কর নেত্রালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ডাক্তার তার ভালো হবার ১% নিশ্চয়তা দিয়েছেন। কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর ন্যায্য দাবি আদায়ের অভিলাষ তার জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে অমূল্য সম্পদ চোখ দু’টো। যে চোখের আলোয় বই পড়ে জ্ঞান আহরণ করে তার জীবনের সোনালী স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাতে চেয়েছিল সে চোখের আলো তার নিভে গেলো চিরতরে।
স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন আসে শিক্ষা নিয়ে এ প্রহসন কেন? কলেজগুলোকে বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার জন্য যদি কোন প্রস্তুতি প্রয়োজন হয় তাহলে আলোচনা সাপেক্ষে সে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ ছিল।
জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের তালিকা থেকে ওই ৭ কলেজগুলোর নাম বাদ দিয়েছে। অন্যদিকে যাদের অধিভুক্ত পেলো তারা নির্বিকার এদের দায়িত্ব গ্রহণ করে নিয়মিত কার্যক্রম চলমান রাখায়। ঘটনাদৃষ্টে মনে হয় জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় দায়িত্ব দিয়ে অব্যাহতি পেয়েছে, পক্ষান্তরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় দায়িত্ব নিয়ে তাদের ধন্য করেছে। এ গড়িমসির প্রকৃত কারণ কী? কারণ যাই হোক এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার সময় উভয়পক্ষের আচরণ যথেষ্ট দায়িত্বশীল ও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন ছিল। তাহলে তাদের পরীক্ষাসহ সব কার্যক্রম নিয়মিত ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পরিচালিত হতো। প্রকৃত অর্থে তড়িঘড়ি না করে এ প্রক্রিয়াটি সময় নিয়ে যাচাই-বাছাই করে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েই সম্পন্ন করা উচিৎ ছিল। এতে করে সকলের পক্ষেই যথাযথ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হতো।
যে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিতে সিদ্দিকুরের চোখের আলো নিভে গেলো তার দায়ভার কে নেবে? যে ছেলেটি পরিবার, সমাজ তথা দেশের সম্পদে পরিণত হতে যাচ্ছিল চোখের আলো হারিয়ে একদিকে সকলের বিশেষ করে তার পরিবারের আসার আলো চিরতরে নিভে গেলো। অন্যদিকে উদীয়মান সম্ভাবনাময় এক তরুণ অন্যের বোঝায় পরিণত হলো।
আজ যত সহানুভূতিই দেখানো হোক, যতই সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হোক- যে মূল্যবান সম্পদ সিদ্দিকুর হারালো পৃথিবীর কোন কিছুর বিনিময়েই তা ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্বশীলতা খুব সঙ্গত কারণেই আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কারো অবহেলা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা যদি অন্যের কোনো ধরনের অসুবিধার কারণ হয় তাহলে তাদেরকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা খুব সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন এলাকার কলেজগুলোকে ওই এলাকায় অবস্থিত বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হবে।
সেক্ষেত্রে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও কলেজ কর্তৃপক্ষের ভেতরে যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েই এ অধিভুক্তির কাজটি করাই শ্রেয়। নতুবা অন্যত্রও আর কত সিদ্দিকুরকে এভাবে পুলিশের আগ্রাসনের শিকার হতে হবে সে আশংকা থেকেই যায়। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মতো একটি প্রথিতযশা বিশ^বিদ্যালয়ের দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের খেসারত দিতে হলে সিদ্দিকুরকে- এটি অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেতও বটে। দেশবাসীর প্রত্যাশা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে এ ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। এক্ষত্রে যেন ‘উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে’ না চাপানো হয়। হলে সেটা শিক্ষার পরিবেশকে বিঘ্নিত করবে।
প্রকৃত দোষী কে সে বিষয়টি যেন কোনভাবেই আড়াল করা না হয়। শাস্তি না হওয়ায় একটি অপরাধ আরো অসংখ্য অগুনতি অপরাধের জন্ম দেয়। সমাজ কিংবা রাষ্ট্র কোনভাবেই সেটা গ্রহণ করে না দেশের বৃহত্তর স্বার্থে। দেশের আপামর জনগণের প্রত্যাশা স্বাধীনতার স্বপক্ষের সরকার কখনো অন্যায়, দুর্নীতি কিংবা অনৈতিক কাজের প্রশ্রয় দেয় না। সুতরাং, এ ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অতি দ্রুত আইনের আওতায় আনা সরকারের মহতি কাজের স্বাক্ষর রাখতে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করবে। আর কোনো সিদ্দিকুরকে যেন এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির শিকার হতে না সে বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। সরকারের ওপরই ন্যস্ত হয়েছে-‘এ দায় কার’ সেটা অনুসন্ধান করবার।