ঐতিহ্যবাহি কালাই রুটি ফুটপাত থেকে রেস্তোরাঁয়

আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০২০, ১:৪৫ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


নগরীর উপশহরে কালাই হাউসের কারিগররা রুটি তৈরিতে ব্যস্ত সোনার দেশ

এক সময় ফুটপাতের খাবার হিসাবে প্রচলন ছিল রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহি খাবার কালাই রুটি। কিন্তু ভোজন রসিকদের স্বাদের কারণে কালাই রুটি এখন রাজশাহীর রেস্তোরাঁর খাবারে পরিণত হয়েছে। এতে করে কালাই রুটির কারিগরদের চাহিদা তৈরি হয়েছে। ক্রেতাদের রুচির পরিবর্তনে সুযোগ তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানেরও।
গত দশ বছর ধরে রাজশাহী নগরীতে কালাই রুটির জনপ্রিয়তার কারণে বেশ কিছু দোকান গড়ে উঠেছে। এরমধ্যে নগরীর উপশহর এলাকায় রয়েছে পাশাপাশি তিনটি দোকান। এই দোকানগুলোতে সন্ধ্যার পরপরই অসাধারণ স্বাদের কালাইয়ের রুটি খেতে ছুটে আসেন দূর-দুরান্ত থেকে লোকজন। সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ১৯ ব্যাচের ছাত্র শফিউল ইসলাম ওরফে মামুন তেমনই একজন। তিনি জানালেন, ‘২৭ ডিসেম্বর রাজশাহীতে এসেছেন। আসার পর থেকেই প্রায় গরম গরম কালাইয়ের রুটির স্বাদ নিতে উপশহরে আসেন। শুধু নিজেই নয়, সাথে স্থানীয় বন্ধুদের সাথে করে আসেন। ক্ষুধা মিটে গেলেই কালাই হাউস থেকে বের হন। তবে তার কাছে কালাই রুটির সাথে বেগুন ভর্তা ভালো লাগে না। তিনি সাধারণত হাঁসের মাংস ও ধনিয়া চাটনি দিয়ে রুটি খান।’ গত সোমবার (৬ জানুয়ারি) তার পাশের টেবিলে খাচ্ছেন রাজশাহী কোর্ট মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রী তোরসা, নগরীর বহরামপুর এলাকার গৃহণী নুসরাতরা। তারা জানালেন, চাইনিজ, ফাস্টফুড খেতে খেতে মুখে অরুচি চলে এসেছে। তাই মুখের স্বাদের ভিন্নতা আনতে বিকাল বেলায় তারা কালাই রুটি খেতে এসেছেন। তবে অন্যদিন সন্ধ্যার পরই আসি এখানে। খাবারটা অনেক মজা। আর আমরা কালাই রুটির সাথে বেগুন ভর্তা, চাটনি, বট দিয়ে খেয়ে থাকি।
শুধু উপশহর নয়, নগরীর ব্যস্ততম এলাকা সাহেববাজার বড়মসজিদের কাছে দামি রেস্তোরাঁ বিদ্যুৎ হোটেলের বাইরে টাঙানো হয়েছে ‘নতুন সংযোজন’-নামের একটি ব্যানার। যেখানে বড় হরফে লেখা আছে কালাই রুটি পাওয়া যায়। এই রেস্তোরাঁর সামনে গ্যাসের চুলায় কালাই রুটি তৈরি করছিলেন তারেক নামের এক কারিগর। তিনি জানালেন, এখানে এক মাস আগে অন্য খাবারের সাথে কালাই রুটি বিক্রি করা হচ্ছে। তবে তিনি বললেন, ‘গ্যাসের চুলার চেয়ে মাটির চুলায় তৈরি কালাই রুটির স্বাদের ভিন্নতা অন্যরকম লাগবে। কিন্তু জায়গা ও পরিবেশের কথা চিন্তা করে গ্যাসের চুলায় আমরা কালাই রুটি তৈরি করছি।’ তার পাশের একটি রেস্টেুরেন্টে বিকালের নাস্তা খাচ্ছেন নগরীর খুলিপাড়া এলাকার গোলাম মোস্তাফা মামুন। তিনি বলেন, তেলের ভাজা-পোড়া খাবারের চেয়ে কালাই রুটি খাওয়া অনেক ভালো মনে করি। তাই অল্প খরচে ভর্তা দিয়ে কালাই রুটি দিয়ে নাস্তাটা করছি।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে রাজশাহীতে ঘুরতে কিংবা কাজে আসেন অনেকে। তখন তাদের প্রত্যাশা থাকে রাজশাহীর মজাদার ও ঐতিহ্যবাহি খাবার ও দর্শনীয় স্থান কি রয়েছে। তখন আমরা বিখ্যাত কালাই রুটির কথা বললে আগ্রহ দেখান। খাওয়ার পর পারলে সাথে করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করে থাকেন।
নগরীর কালাই হাউসের মালিক ফুয়াদ হাসান রিপন বলেন, এক সময় বাপে ফুটপাতে কালাই রুটি তৈরি করে বিক্রি করতো। কিন্তু মানুষের রুজির পরিবর্তনের সাথে সাথে ফুটপাত থেকে কালাই রুটির ব্যবসার জন্য বড়সড় করে দোকান করা হয়েছে। আগে যেমন নিম্ন আয়ের মানুষরা কালাই রুটি ফুটপাতে বসে খেয়েছেন। এখন সব শ্রেণির মানুষ এসে আমাদের মতো কালাই রুটির দোকানে ঢুঁ মারছেন। স্বাদের কারণে তাদের আগ্রহ যেমন বাড়ছে। ঠিক একইভাবে কালাই রুটির সাথে কী কী দিয়ে খাওয়ানো যায়- সেটাও ভাবা হচ্ছে। আর এই চিন্তা থেকেই কালাই রুটির সাথে গরুর মাংস, টার্কি মাংস, হাঁসের মাংস, বেগুন ভর্তা, ধনিয়া চাটনি, ঝাল, মিনারেল ওয়াটার, টিস্যু পেপার দেয়া হয়। বসার জায়গাটা সাধ্য অনুযায়ী ভালো করার চেষ্টা করা হয়েছে। লাভজনক হওয়ায় ব্যবসায় প্রতিযোগিতাটাও বেড়েছে। তাই বাব-দাদার আমলে না থেকে কালাই রুটির ক্রেতাদের কিভাবে উন্নতমানের সেবা দিয়ে ব্যবসা ধরে রেখে করা যায় সেটাও আমরা পরিকল্পনায় রাখি। এজন্য নগরীতে ফুডপান্ডার মাধ্যমে হোম ডেলিভারি দিয়ে থাকি কালাই রুটি।
নগরীর রানীবাজারে ফুটপাতে কালাই রুটি তৈরি করছেন গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাট এলাকার আব্দুল মমিন। তিনি জানালেন, আগে গ্রামে কালাই রুটি তৈরি করতাম। কিন্তু গ্রামের চেয়ে শহরে এই রুটির চাহিদা বেশি। তাই গ্রাম থেকে এসে ফুটপাতেই দীর্ঘদিন ধরে কালাই রুটির ব্যবসা করছি।
কালাই হাউসের কারিগর রাসেল জানালেন, তার মা-বাবার কাছ থেকে এই রুটি তৈরি করা শিখিছেন। এই রুটি তৈরি করতে তাকে প্রথমে এক ভাগ চালের আটা, তিন ভাগ কালাইয়ের আটা মিশিয়ে পানি দিয়ে আটার গোল গোল তৈরি করা হয়। আটার বল দুই হাতের তালুর চাপে চাপে তৈরি হতে থাকে কালাই রুটি। মাটির খোলায় (তাওয়া) এপিট ওপিঠ সেঁকতে হয়। তারপর চুলা থেকে নামিয়ে ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী কালাই রুটি পরিবেশন করা হয়।
রাজশাহী নগরীর উপশহর, সাহেবাজার, বিনোদপুর, কোর্ট এলাকা, রেলগেট, শালবাগান, রানীবাজার, লক্ষ¥ীপুর, পিএন স্কুলের বিপরীত দিকে, পদ্মার বাঁধসহ বিভিন্ন এলাকার রেস্তোরায় ও ফুটপাতে একটি কালাই রুটি ২০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে স্পেশাল বললে আরও ১০ টাকা যোগ করতে হবে। আর কালাই রুটির সাথে অন্য খাবার যোগ করতে হলে আলাদা বাড়তি টাকা দিতে হবে। শুধু ধনিয়া চাটনি কিংবা লবণ ঝাল কালাই রুটির সাথে ফ্রি দেয়া হয়। মূলত শীতের খাবার হলেও ক্রেতাদের চাহিদার কারণে সারাবছরেই রাজশাহীতে এই খাবার পাওয়া যায়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ