ওমিক্রণ : সোনামসজিদ স্থলবন্দর কতটা নিরাপদ!

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১, ২০২২, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

মাহাবুল ইসলাম ও সফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ:


রাজশাহী বিভাগজুড়ে করোনা সংক্রমণের রেকর্ড সংখ্যক শনাক্তের হার এখনও নিম্নগামী হচ্ছে না। রাজশাহীর পাশাপাশি সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জেও প্রতিদিনিই প্রায় ৪০ শতাংশের উপরে শনাক্ত হচ্ছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধে বিধিনিষেধের পাশাপাশি বাড়তি নজরদারির কথাও বলছে স্বাস্থ্যবিভাগ। কিন্তু সংক্রমণ ছড়ানোর অন্যতম ঝুঁকির্পূণস্থান শিবগঞ্জ সোনামসজিদ স্থলবন্দরে কার্যকরভাবে নিশ্চিত হচ্ছে না সরকারি নির্দেশনা। সংক্রমণ প্রতিরোধে এলাকাভিত্তিক বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণেও তেমন গুরুত্বারোপ না করাই ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

রোববার (৩০ জানুয়ারি) সোনার দেশের শিবগঞ্জ প্রতিনিধি স্থলবন্দর এলাকা ঘুরে দেখে জানান, সেখানে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে তেমন কোনো কড়াকড়ি নেই। বিজিবি’র সদস্যরা যখন চেক করছেন, শুধু তখনই মাস্ক পরছেন ভারত থেকে আসা চালকরা। বাকি সময় মাস্ক ছাড়াই বন্দর ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন পয়েন্টে যাতায়াত করছেন। হোটেল-রোস্তোরাঁয় বসে খাচ্ছেন খাবারও। রাত্রী যাপনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রায়শই কোনো কোনো চালক তা মানছেন না। মাস্ক ছাড়াই শ্রমিকদের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে উঠছেন। এভাবে প্রতিদিনই গড়ে ৩০০ গাড়ির সঙ্গে চালকরাও এভাবেই বাংলাদেশ পয়েন্টে চলাফেরা করছেন।

শুধু শ্রমিকরাই নয়- বন্দর সংশ্লিষ্ট মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীরাও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে তেমন সচেতন না। বন্দরের প্রবেশ পথে জেলা সিভিল সার্জনের মেডিকেল টিমও কাজ করছে। তবে তাদের কার্যক্রমও চলছে ঝিমিয়ে। বর্তমানে তিন সদস্যের একটি টিম সেখানে কাজ করছেন বলে জানানো হলেও পরিদর্শনকালে একজনকে পাওয়া যায়। তিনিও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে তেমন সচেতন না। নামমাত্র উপস্থিত থাকেন বলে জানা গেছে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তারা চলেও যান এমনটিও জানা যায়। এছাড়া ভারত থেকে চালকের কোনো সহযোগী আসতে পারবে না-এবিষয়ে কড়াকড়ি করা হলেও অনেকেই সহযোগী নিয়ে আসছেন।

বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জেলা সিভিল সার্জন অফিস বলছে, করোনার সংক্রমণ যেন ভারতীয়দের মাধ্যমে দেশে না ঘটে এ বিষয়ে তারা তৎপর রয়েছেন। ভারত থেকে আসা চালকদের টিকা সনদ দেখা হচ্ছে। এছাড়া চালকদের কোনো সহযোগী বা দর্শনার্থী এই বন্দর দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। এটা অনেক আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে।

চালকদের টিকা কার্ড দেখা হলেও তারা করোনায় আক্রান্ত কি না- এ বিষয়ে কোনো সনদ দেখা হচ্ছে না। তাপমাত্রা পরিমাপের একটি যন্ত্র সামনে রেখেই দায় সারছে স্বাস্থ্য টিম। এখানকার দায়িত্বরতদের অলসতায় সেটিরও কার্যকর ব্যবহার হচ্ছে না।

সরকারের দেয়া বিধিনিষেধে দেশের স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরে স্ক্রিনিঙের সংখ্যা বাড়াতে বলা হয়েছে। এছাড়া স্থলবন্দরগুলোতেও আগত ট্রাকের সঙ্গে শুধু ড্রাইভার থাকতে পারবে। কোনো সহকারী আসতে পারবে না। একইসঙ্গে আগত চালকদের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে বাড়তি নজরদারির কথাও বলা হয়েছে। অথচ এ বন্দরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উর্ধ্বমুখি সংক্রমণ রোধে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় নি।

অথচ সংক্রমণে পিছিয়ে নেই এই জেলা। সোমবার (৩১ জানুয়ারি) চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনা শনাক্তের হার ছিলো ৪০ শতাংশ। যা বিভাগের আটটি জেলার মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে। এর আগের দিন এই জেলায় শনাক্তের হার ছিলো ৪৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। ২৯ জুলাই বিভাগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শনাক্ত ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ ছিলো চাঁপাইনবাবগঞ্জে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ট্রাফিক পরিদর্শক আলিমুজ্জামান মুঠোফোনে জানান, বন্দরে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে গতবার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট সংক্রমণের পর যে সকল ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিলো সেগুলোই বাস্তবায়ন হচ্ছে। ভারত থেকে আগত প্রতিটি ট্রাককে স্প্রে করা হচ্ছে। প্রতিটি গাড়ির কাগজসহ চালকের করোনা টিকা সনদ দেখা হচ্ছে। চালকের সঙ্গে কোন সহযোগীকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। আর এখানে চালকরা যেদিন আসেন সেদিনই চলে যান। থাকার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি আরও জানান, চালকরা এখান থেকে অতিক্রম করে ট্রাক আনলোড করতে বিভিন্ন পয়েন্টে যান। সেখানে তারা কী করছেন এ বিষয়ে তাদের কোনো নজরদারির বিষয় নেই। আর এটা রাখাও সম্ভব না। তবে তাদের যেহেতু একটি নির্দিষ্ট সময় পর আবার ফিরে যেতে হচ্ছে। তারা আশেপাশের খাবার হোটেলগুলোতেই থাকেন।

তিনি আরও জানান, এসব চালকদের কেউ করোনা আক্রান্ত কি না- এ বিষয়ে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট বা এ জাতীয় কোনো বিষয় নেই। এক্ষেত্রে কিছুটা শঙ্কা থাকতে পারে। তবে সিভিল সার্জনের স্বাস্থ্য টিম চালকদের শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করেন। এক্ষেত্রে অসুস্থতার কোনো লক্ষণ থাকলে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
পণ্যপরিবহণ ছাড়া সকল কিছু বন্ধ বলা হলেও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বরত এসআই জাফর আলি জানান, ২০২০ সালের ১৫ মার্চ থেকে লোক যাতায়াত বন্ধ আছে। তবে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বৈধ কাগজপত্র থাকা ভারত থেকে আসা যাত্রীদের আসতে দেয়া হচ্ছে। তবে সংখ্যায় নগণ্য।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. এসএম মাহমুদুর রশিদ জানান, তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন হিসেবে কিছুদিন আগে যোগদান করেছেন। এখানে প্রায় দেড় মাস সিভিল সার্জন ছিলেন না। বন্দর এলাকা ঘুরেও দেখা হয় নি। তবে মেডিকেল অফিসারের মাধ্যমে খোঁজখবর নিচ্ছি। সেখানে মেডিকেল অফিসারসহ তিন সদস্যের একটা মেডিকেল টিম কাজ করছে। এদের দায়িত্বপালনে অবহেলা থাকলে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি আরও জানান, ভারত থেকে আগত চালকরা করোনায় আক্রান্ত কি না- এ বিষয়ে মেডিকেলি শুধু তামপাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। এছাড়া করোনা পরীক্ষার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে আগামী সভায় এখানকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হবে। এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।