ওরা একুশকে বন্দি করতে পারেনি

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

মুস্তাফিজুর রহমান খান (আলম):


বায়ান্নর একুশ ছিল রক্তাক্ত। ঢাকার রাজপথের কালোপীচ লাল করা একুশ। দামাল ছেলেরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে রক্ষা করেছিল মাতৃভাষা বাংলা। সেই থেকে একুশ আমাদের কাছে সংগ্রামের প্রতীক। অর্জনের লাল সূর্য। শুধুই সামনে এগিয়ে চলার অমিত তেজ আর দৃপ্ত পদভারে ধরণী প্রকাম্পিত করার দুঃসাহস।
তারপর পাকিস্তানি দুঃশাসন, স্বৈরাচারী স্টিম রোলার, পুলিশি নির্যাতন, ১৪৪ ধারা, কারফিউ উপেক্ষা করে প্রতি বছরই পালিত হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি। “আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি”। উষালগ্নে খালি পায়ে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার প্রভাত ফেরী আর আবেগ জড়িত কন্ঠে গীত “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো…।” শহিদ মিনারে মিনারে পুষ্পাঞ্জলি। বুকে বুকে শোভা পেত শোকের প্রতীক, সংগ্রামের দৃপ্ত অঙ্গীকার ‘কালো ব্যাজ’।
তখন ছিল অস্থায়ী সব শহিদ মিনার। পাকিস্তানি পুলিশের কাজ ছিল পরের দিনই সে সব শহিদ মিনার ভেঙ্গে ফেলার। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে প্রোক্ষিত সব শুহদ মিনার কেবলই দৃঢ় ভিত্তি লাভ করছিল। গভীর থেকে গভীরতর পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছিল। ভয়ভীতি ত্চ্ছু করে একুশের উষালগ্নে মিছিল মিছিল আর মিছিলে প্রকম্পিত করছিল গ্রাম-গঞ্জের পায়েহাঁটা পথ থেকে শহরের পাকা রাস্তা আর রাজধানীর পীচ মোড়া রাজপথ পর্যন্ত। সূর্য রক্তিম বর্ণ ধারণ করার আগেই শোনা যেত “আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি।’’ এখন মধ্যরাতে শহিদ মিনারে ফুল দেওয়ার পীড়াপীড়ি। অথচ বাঙালি বাংলার সব কিছুই শুরু সূর্র্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে।
রাজশাহীতে ১৯৬৯ সালের একুশ আসে অন্য পটভূমিতে। ১৮ ফেব্রুয়ারি ড. জোহা- নুরুল ইসলাম শহিদ হওয়ার পর সেদিন দুপুর থেকে কারফিউ জারী করেছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। সকালের দিকে কয়েক ঘণ্টা কারফিউ শিথিল করার পর সন্ধ্যা নামার আগেই কারফিউ। ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি সেভাবেই বন্দি জীবন পার করেছিল রাজশাহীবাসী। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি শেষরাত্রি শেষে ভোর চারটায় কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়। তারপরই তড়িৎ গতিতে একুশ পালনের প্রস্তুতি শুরু হয়। সেই শেষ রাতেই সাহেববাজারের কাপড়পট্টির বেশ কয়েকটা দোকান খোলা পাওয়া য়ায়। ভুবন মোহন পার্কের দক্ষিণে সরু পথ দিয়ে ঢুকেই এক দোকানদার আমাদের এক থান কালো কাপড় দেয়। মুহূর্তে কেটে কেটে হাজার হাজার কালো ব্যাজ হয়ে যায়।
সেই ব্যাজ বুকে বুকে লাগিয়ে মিছিল চলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে ড. জোহার সমাধির দিকে। তখনের সংকীর্ণ পথ ধরে মিছিল চলেছিল পূবপানে বিশ^বিদ্যালয়ের দিকে। আর মিছিল ফিরছিল বাঁধের উপর দিয়ে। কোথায় কোনো ছেদ ছিলোনা। শহর থেকে বিশ^বিদ্যালয় যেন জনসমুদ্র। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে আর বাঁধের উপর দিয়ে ফিরছে। সে এক বিজয় মিছিল। রাস্তায় কোনো পাকিস্তানি পুলিশ, পাকিস্তানি মিলিটারি দেখা যায় নি। কিন্তু আশংকা ছিল বোধ হয় একুশ পালন হবে না।
১৯৬৯, ১৯৭০ ১৯৭১-এর একুশ পালন হয়েছিল প্রায় বন্দি অবস্থায়। ১৪৪ ধারা কারফিউ উপেক্ষা করে। ১৯৭১ এর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণ নিরস্ত্র বাঙালিদের নির্মূল করার ব্যর্থ চেষ্টা শুরু হয় ২৫ মার্চ মধ্য রাত্রি থেকে। বাংলাদেশের সব শহিদ মিনার ধ্বংস করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। জনযুদ্ধ। জনগণের যুদ্ধ। নিরস্ত্র বাঙালি সশস্ত্র হয়ে উঠে। লাঙ্গল-কোদাল-কুড়াল, কাস্তে-হাতুড়ি-বাটালি, কলম-পেন্সিল ফেলে ধরেছিল লাঠি-বল্লম-বর্শা। তারপর হাতে তুলে নিয়েছিল রাইফেল। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি হয়ে উঠেছিল সাড়ে সাত কোটি মুক্তিযোদ্ধা।
একাত্তর ৭ই মার্চ এর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষণের পরই যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল তাতে অংশ নিয়েছিল সাড়ে সাত কোটি বাঙালি। সশস্ত্র বাঙালি। সেজন্য ন’মাসেই দেশ স্বাধীন হয়েছিল আর এক একুশ আসার আগেই। তাই পাকিস্তানি সামরিক জান্তা একুশকে বন্দি করতে পারে নি। ১৯৭২ এর একুশে পালন করেছিল বিজয়ী জাতি মুক্ত স্বদেশে। বেদনা বিধুর পরিবেশে বিজয়মালা গলায় ধারণ করে গেয়েছিল “আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী…।’’
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক