ঔপনিবেশিক আবহে রবীন্দ্রসৃজন-বেদন

আপডেট: মে ৮, ২০২১, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


উপনিবেশাধীন কবি-শিল্পীদের বড়ো অসুবিধা, তাঁরা নিজ দেশের জীবন ও সমাজের চিত্র উপস্থাপনে স্বাধীন চিত্তবৃত্তির প্রকাশ ঘটাতে বাধাগ্রস্ত হন। উনিশ শতকের বৃটিশ উপনিবেশে গন্ধর্বনারায়ণ মিত্র দীনবন্ধু মিত্র ছদ্মনামে ‘নীলদর্পন’ রচনা করেন। শোনা যায় মধুসূদন সেটি ইংরেজি অনুবাদের পরে পাদরী লং এর নামে প্রকাশ করা হয়। পাকিস্তানি উপনিবেশে শেখ আজিজুর রহমান শওকত ওসমান ছদ্মনামে লেখতেন। মহাকাল সেই ছদ্মনামটি তাঁর ভালে জয়টীকা পরিয়ে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ছদ্মনাম গ্রহণ করেননি, তা নয়। যেমন, ভানু সিংহ ঠাকুর। উল্লেখ্য, ভানু রবি শব্দের সমার্থক। তাছাড়া ভানুসিংহঠাকুরের পদাবলী (১৮৮৪) সমকালীন রাষ্ট্রীয় ও সমাজকেন্দ্রিক নয়। বৈষ্ণব পদাবলীর ভাববাহক।
উনিশ শতকের অনেক লেখক বাস্তব সমাজ-জীবন রচনার পরিবর্তে, অতীত অথবা কল্পলোকে বিচরণ করেছেন। এঁদের অন্যতম রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। নানা কারণে রবীন্দ্রনাথ অনেকটা কল্পলোক বিহারী হয়ে পড়েছিলেন। যাকে প্রমথনাথ বিশী মনে করতেন রবীন্দ্র প্রতিভার অপচয়। তাই ‘কল্পনা’ থেকে ‘বলাকা’ পূর্ব পর্যন্ত কাব্যগুলোতে অতীতচারণ আর ব্যক্তিগত দুঃখবোধের বেদনা প্রাধান্য পেয়েছে। ‘কল্পনার স্বপ্ন’ কবিতায় উজ্জয়িনী অভিসার শেষে ‘সেকাল’ কবিতায় পরিহাস ছলে তিনি বলেছিলেন, ‘কালিদাস তো নামেই আছেন, আমি আছি বেঁচে।’ বেঁচে থাকলে কী হবে! শোষক উৎপীড়ককে নয়, তাদের বিরুদ্ধে অদৃশ্যলোকে অভিযোগ করতে হয়েছে। পুনশ্চের ‘প্রশ্ন’ কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘যাহারা তোমার বিষাইছে রায়ু, নিভাইছে তব আলো। তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো।’ এর উত্তর পাওয়া কঠিন। পাওয়া যায়নি, যায়ওনা। এসত্য বুঝতেন বলে আত্মসান্ত¡না বাক্য উচ্চারণ করলেন, ‘তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সমদহে।’
যৌবনে রবীন্দ্রনাথ ইয়োরোপীয়দের সাহিত্য-দর্শন পাঠ করে এবং ব্যক্তিগতভাবে তাদের সাথে মিশে একটা সাময়িক পরিতৃপ্তি লাভ করেছিলেন। পরে তাদের স্বরূপ উপলব্ধি করে ক্ষুব্ধ হন। যার ছায়া লক্ষ্য করা যায় ‘সভ্যতার সংকট’ রচনায় (১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ, রবীন্দ্র জীবদ্দশার শেষ জন্মদিনে প্রকাশিত)।
ইয়োরোপীয়দের ছদ্মবেশী শাসকের শোষণের চিত্র রবীন্দ্রনাথ ‘সোনার তরী’ রচনার যুগে রূপকাশ্রয়ে ‘দুইবিঘা জমি’ কবিতায় উপস্থাপন করেছেন। উপেন ‘সবহারাদের’ প্রতিনিধি। কেবল তাই নয়, এযে ‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’ পংক্তির মাধ্যমে ক্ষমতাবান লুটেরাদের পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
কবিকে স্মরণ করার প্রধান উদ্দেশ্য তিনি মানবমনের গভীর এবং সমাজজীবনের গতি প্রকৃতি কতখানি চিরকালের করে তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথ যে পেরেছেন তার প্রমাণ তাঁর অক্ষয় রচনাসমগ্র। প্রসংগত একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, তিনি জীবনকেন্দ্রিক ভাবের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে উচ্চকণ্ঠ হননি। কারণ, একথা স্বীকার করতে হয়, উচ্চকণ্ঠ সাময়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি করে; কিন্তু সেখানে স্থায়ী সমাধান মেলা কঠিন। সভ্যতার সূচনা থেকে নানা মতবাদ আমাদের জীবন-চর্যাকে বহুধাবিভক্ত করেছে; পূর্ণ সমাধান দিতে পারেনি। স্বার্থবাদিতা পদে পদে আমাদের বিভক্ত করেছে। রবীন্দ্রনাথ বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে মতবাদের প্রচারক সাজেন নি। প্রার্থনা করেছেন, ভেদাভেদ ভুলে ‘বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন’-যেন এক হয়।
প্রথম জীবনে মহর্ষীর প্রভাবে ব্রাহ্মধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়েছেন, প্রচারের সবিশেষ অধিকর্তা থাকেন নি। রাজনীতির মঞ্চেও তাঁকে দেখা গেছে; সেখানেও থিতু হননি। ইয়োরোপীয় আগ্রাসীদের বণিকের মানদ- শোষকের রাজদ-ে’ রূপান্তরিত হলে কতিপয় বিদ্বজ্জন, ক্ষমতাসীনদের সাথে ভাববিনিময়ের মোড়কে ‘কংগ্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন, উদ্দেশ্য রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করা (১৮৮৫)। ঠাকুর পরিবার তাতে যুক্ত ছিলো। রবীন্দ্রনাথ সে সময়ে ‘রাজর্ষি’ রচনায় ব্যাপৃত। উক্ত উপন্যাসে মানবকল্যাণে রাজার আচরণ সম্পর্কে যে চেতনার কথা বলেছিলেন, শতবর্ষেরও পরে একালের শাসনব্যবস্থায় তা প্রণিধানযোগ্য। একালে মানুষের স্বাধিকার সম্পর্কিত নানা ভাবনা রবীন্দ্র রচনা-সম্ভারকে সমৃদ্ধ করেছে। এ আলোচনায় আংশিকের পরিচয় দেওয়াও কঠিন। তবে একটি উপনিবেশে কী পরিমাণ অসহায় থেকে মানুষ জীবনের যাথার্থ থেকে বঞ্চিত হয়, তার পরিচয় আছে অনেকের ভালোলাগা ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পে। সামাজিক সংস্কারের কারণে হয়তো গিরিবালার কৈশোরের ভালোবাসা ঝরে গেল। কিন্তু শশিভূষণ এম.এ. বি.এল. পাস করেও মানবাধিকার কর্মে অংশ নিতে পারবেনা। এ কোন শাসন ব্যবস্থা! রবীন্দ্রনাথ শশিভূষণের জীবনের ব্যর্থতার সাথে যেন জাতীয় ব্যর্থতার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত ‘স্বদেশ’ কাব্যখানি দেশ প্রেমের একখানা অনন্য দৃষ্টান্ত। এ কাব্যে যে ছেচল্লিশটি কবিতা স্থান পেয়েছে, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, সবগুলোই অধিকার সচেতনতা এবং স্বদেশ-প্রশস্তির আকুলতায় পূর্ণ। এইযে আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ বাংলার প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার এক অতুল দৃষ্টান্ত। বাউল সুরে গীত হওয়া এই গান বাংলার মধ্য অঞ্চলের মানুষের যেন আত্মার প্রতিধ্বনি অনুরণিত হয়। এই ‘স্বদেশ’ কাব্যেই আমরা পাব বাঙালির ঐক্যের জন্য রবীন্দ্র-প্রার্থনা: ‘বাঙালির প্রাণ’, ‘বাঙালির মন’, এক হবার আকুতি। উপনিষদের নির্দেশও ছিলো সেটি।
প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য, পাকিস্তানি উপনিবেশাধীন সময়ে বাঙালির মুক্তির সাধনাপর্বে বঙ্গবন্ধু দেশের আনাচে-কানাচে জনমত তৈরির জন্য জনসমাবেশে কোথাও কোথাও ‘আমার সোনার বাংলা’ সঙ্গীতটি পরিবেশনের কালে, ‘তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’ শুনে স্বাধীনতার কবির চোখ ভিজে আসতো, তিনি রুমালে চোখ মুছতেন। এই বিরল দৃষ্টান্ত তাৎক্ষণিক আবেগ নয়। বাঙালির মানস-সত্তার বৈশিষ্ট্য। কেননা লাঞ্ছিতা জননীর মলিন মুখ দেখে ‘মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে জল ভরে’ তো বাঙালি শ্রেষ্ঠেরই হবে।
বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠ কবি জগতজেতা রবীন্দ্রনাথ আর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর মানসধারা একই পথে প্রবাহিত হয়েছে। তাইতো ঔপনিবেশিক আবহে রবীন্দ্রসৃজন বেদন এবং বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের মহিমা একাকার। রবীন্দ্রনাথ মানুষের মুক্তি চেয়েছেন, বঙ্গবন্ধু সে পথে ছিলেন অকৃত্রিম। বলেছিলেন, ‘এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশআল্লাহ’। আমরা কতখানি মুক্ত হতে পেরেছি তা বোধকরি ভেবে দেখার অবকাশ আছে। এই অপূর্ণতার কথা যেন ‘ভুলে না যাই, বেদনা পাই শয়নে স্বপনে।’
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ