কঠোর লকডাউন: উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি, আটগুন ভাড়ায় গন্তব্যে

আপডেট: জুন ১৪, ২০২১, ৯:৩৪ পূর্বাহ্ণ

মাহাবুল ইসলাম:


রাজশাহীতে করোনার ভারতীয় ডেল্ডা ভ্যারিয়েন্ট সংক্রমণের অন্যতম ‘হটস্পট’ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ও তার পাশর্^বর্তী এলাকা। বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ অন্যান্য জেলাগুলো থেকে রোগিরা আক্রান্ত হয়ে রামেক হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে আসছেন। একাধিক বিশেষজ্ঞ এটিকে হটস্পট এলাকা হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। রোগির চিকিৎসা সহযোগী, দর্শনার্থীসহ হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত কর্মীরা করোনা ওয়ার্ড থেকে শুরু করে এলাকার বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি ও খাবার দোকানগুলোতে যাতায়াত করছেন। আর এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি খুব কমই গুরুত্ব পাচ্ছে তাদের কাছে। অথচ ভারতীয় এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ রোধে প্রশাসন ৭ দিনের কঠোর লকডাউন বাস্তবায়ন করছে। লকডাউনে নগরীর অন্যান্য এলাকা ফাঁকা থাকলেও জরুরি প্রয়োজনের কারণে এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি না মেনেও মানুষের বাধাহীন চলাচল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমন অবস্থায় লকডাউনের কার্যকর সুফল পেতে এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে জোর দেয়ার প্রয়োজনীয়তাসহ ব্যবস্থাপনায় ভোগান্তিগুলো কমানোর জন্য পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আর লকডাউনের তৃতীয় দিনেও নগরীতে গাড়ি চলাচলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকায় পাঁচ থেকে আটগুন বেশি খরচে জরুরি প্রয়োজনে চলাচল করেতে দেখা গেছে অনেকেই।
রোববার (১৩ জুন) দুপুরে নগরীর লক্ষ¥ীপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য এলাকার চেয়ে এই এলাকায় মানুষের সমাগম বেশি। রোগির স্বজনসহ ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা বিভিন্ন ফার্মেসি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাতায়াত করছেন। কিছু কিছু ফার্মেসিতে গাদাগাদি করেই কর্মচারীরা অবস্থান করছেন। ফার্মেসিগুলোতে অধিকাংশ কর্মীদের মাস্ক নাক ও মুখের নিচে থাকতেই দেখা গেছে। অনেককে মাস্ক খুলেও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে। ভেতরের সরু রাস্তায় অনেকেই চায়ের আড্ডাতেও মেতেছেন। ফার্মেসিগুলোর বাইরে ওষুধ কোম্পানির লোকদেরও আড্ডা জমতে দেখা গেছে। সেখানেও অনেকেই সঠিক নিয়মে মাস্ক না পরে গল্পতে মেতেছিলেন। এছাড়া হাসপাতালের সামনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার বিক্রি করা হচ্ছে। সেখানেও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত হচ্ছে।
অপরদিকে, কঠোর লকডাউনে নগরীর সড়কগুলো প্রায় ফাঁকা ছিলো। রাস্তায় চার্জার অটোর চলাচল ছিলো না বললেই চলে। তবে অটো রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করতে দেখা গেছে। এই গাড়িগুলো কেউ পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখিন হতে দেখা গেছে। একারণে অধিকাংশ চালক নগরীর ভেতরের সরু রাস্তাগুলো দিয়েই চলাচল করছিলেন। জরুরি প্রয়োজনে চলাচল করছেন এটা প্রমাণে ব্যর্থ হলে গাড়ির বাতাস ছেড়ে দেয়াসহ গাড়ির টিউব নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে বলেও জানান কয়েকজন অটোরিকশা চালক। আর ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালানোর কারণে যাত্রীদের থেকে ভাড়া বেশি নিচ্ছেন বলে জানাচ্ছেন চালকরা।
অটোচালক রুবেল হোসেন জানান, নগরীর প্রত্যেকটা মোড়ে মোড়ে পুলিশ। ধরলেই বাতাস ছেড়ে দিচ্ছে। কখনো জরুরি প্রয়োজন উল্লেখ করে অনুরোধ করলে যদি তাদের বিশ^াস হয় তাহলে ছাড়ছে। অন্যথায় থাপ্পরও খাইতে হচ্ছে। অধিকাংশ সময় তিনি ভেতরের রাস্তাগুলো দিয়ে ঘুরেই যাচ্ছেন। আর ভাড়াও কম। একারণে ভাড়া বেশি নিচ্ছেন। তাছাড়া কিভাবে চলবো।
নগরীর কোর্ট এলাকায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন আফজাল হোসেন। তিনি জানান, মেডিকেলে তার রোগি আছে। সেখানে রোগির দেখাশোনার জন্য আরেকটা লোক লাগবে। তাই তিনি যাচ্ছেন। কিন্তু গাড়ি তেমন চলছেন না। কিছু অটো রিকশা চলছে। কোর্ট থেকে লক্ষ¥ীপুর পাঁচ টাকায় যাওয়া যায়। এরা ৫০ টাকা চাচ্ছে। বাধ্য হয়ে এটাকা খরচ করেই তাকে যেতে হচ্ছে। বিধি নিষেধের আওতার বাইরে থাকা জরুরি স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যরাও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এবিষয়ে জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত এসব ব্যক্তি ভোগান্তিহীন লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর সাইফুল ইসলাম জানান, করোনার সংক্রমণ রোধে প্রশাসনের লকডাউনের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। এটি না হলে সংক্রমণ বাড়বে। তবে মানুষের ব্যক্তিগত সচেতনতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ মানুষ সচেতন না হলে লকডাউনের কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব হবে না। আর বর্তমানে সচেতনতার বিষয়ে মানুষের উদাসীনতা রয়েছে। একারণে প্রশাসন কঠোরভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করছে। আর কিছু ভালোর জন্য কিছু ভোগান্তি হতে পারে। তবে এই ভোগান্তিটাকে কমানোর জন্য সুব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পরিবহনের সমস্যায় স্থানীয় প্রশাসন কিছু গাড়ি চালু করতে পারে। যেখানে জরুরি সেবাপ্রার্থীরা দুর্ভোগে পড়বে না।
রামেক হাসপাতাল পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, সংক্রমণ রোধে রাজশাহীতে কঠোর লকডাউনের প্রয়োজন আছে। যদিও এটা আরো আগে থেকে দিতে পারলে বেশি কার্যকর হতো। তবে মানুষের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। মানুষকে আরো সচেতন হতে হবে। আর লক্ষ¥ীপুর এলাকায় করোনা রোগি কিংবা সংক্রমণ ঝুঁকি রয়েছে এসব ব্যক্তিদের চলাচল রয়েছে। সুতরাং এখানে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। ফার্মেসিগুলোতেও নজরদারি বাড়াতে হবে।
তিনি আরো জানান, হঠাৎ করে লকডাউন দেয়ায় প্রথম দিনে হাসপাতালের জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত কিছু স্টাফ গাড়ি না পেয়ে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। এখন হাসপাতালের নিজস্ব পরিবহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুইটি বাস চলাচল করছে। সামনে হয়তো আরো ১ টা যোগ হবে।
এ বিষয়ে রাজশাহী পুলিশ কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক জানান, রাজশাহীতে এবার কঠোরভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন হচ্ছে। এলক্ষে পুলিশ, র‌্যাব, আনসারসহ সবাই কাজ করছে। লকডাউন মানে লকডাউন। আর লক্ষ¥ীপুর এলাকাসহ অন্যান্য জায়গাতেও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে। আইনগত ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ