কদম কদম বঢ়ায়ে যা…

আপডেট: মার্চ ৭, ২০১৭, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়



নেতাজি আসছেন! নেতাজি আসছেন! খবরটা বাতাসে উড়ছিল। সতেরো বছরের মেয়েটাও সে কথা শুনেছে। সবাই বলে, নেতাজি দারুণ বক্তৃতা দেন! আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব! আসল নাম সুভাষচন্দ্র বসু। মেয়ে শুনেছে, তিনি নাকি ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে ভারত থেকে পালিয়েছিলেন। এখন তাঁর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতকে স্বাধীন করার জন্য লড়বে। সেই মানুষটা কুয়ালালামপুরে আসবেন আর তাঁকে দেখতে যাওয়া হবে না, তা কি হয়? কিন্তু বাড়িতে বললে বড়রা ছাড়বেন? মেয়ে কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। সোজা সাইকেলটি নিয়ে কাউকে কিচ্ছুটি না বলে মাঠে গিয়ে হাজির!
কম লোক নাকি? মেয়ে ঠেলেঠুলে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বক্তৃতা শেষ করে সকলের কাছে ফৌজের জন্য অনুদান চাইলেন নেতাজি। সেই মেয়ে, জানকী তার নাম, অবলীলায় কান থেকে হিরের দুল খুলে নেতাজির হাতে দিল। দেওয়ামাত্র খচ করে ক্যামেরার ক্লিক। পরের দিন কাগজে প্রথম পাতায় জানকীর ছবি।
তামিল ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে জানকী থেবর। বাড়িতে জানাজানি হয়ে একদম হইহই কা-। জানকী জানে, বাঁচাতে পারেন এক জনই। অসামান্যা সুন্দরী এক দিদিকে সে দেখেছে আগের দিন। তাঁর নাম ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন। সেই লক্ষ্মীকেই চায়ের নেমন্তন্ন করল জানকী। লক্ষ্মী এসে বাড়ির সবাইকে রাজি করালেন।
করানো গেল। কারণ এশিয়ার প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ভাবনার প্রসার আগে থেকেই ছিল। তাঁরা ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স লিগ তৈরি করেছিলেন। তার উপরে ১৯৪২-এ বর্মা (এখন মায়ানমার), মালয় (এখন মালয়েশিয়া) আর সিঙ্গাপুরে জাপানের কাছে হেরে যাওয়ার পর  ব্রিটিশ সেনাকে অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হচ্ছিল না।
ফল? জানকী তাঁর সৎ বোন পাপাতি আর কয়েক জন বন্ধুকে নিয়ে ‘ঝাঁসির রানি বাহিনী’তে যোগ দিলেন। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বীরাঙ্গনাকে মনে রেখেই সুভাষচন্দ্র মেয়েদের নিয়ে এই কমব্যাট ইনফ্যান্ট্রি ইউনিট গড়েছিলেন। শুধু মেয়েদের নিয়ে এমন ইউনিট দুনিয়ায় এই প্রথম।
মেয়েদের কারওরই আগে কোনও সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল না। নেতাজির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে না-দেখা দেশের জন্য আত্মবিসর্জন দিতে তৈরি হয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু কারও জানা ছিল না, অন্য একটা ইতিহাসেরও জন্ম দিচ্ছেন তাঁরা। নারীরা যুদ্ধে গিয়েছেন অনেক বার। কিন্তু শুধু নারীদের নিয়ে একটি সেনা ইউনিট, দেখা যায়নি আগে।
১৯৪৩ সালে, অঞ্জলি ভৌমিকের বয়স ছিল বারো। তাঁর বাবা ধীরেন্দ্রচন্দ্র ভৌমিক ঢাকায় থাকতে ফরওয়ার্ড ব্লকের সদস্য ছিলেন। পরে চাকরি নিয়ে মালয়ে চলে যান। তাঁর দুই মেয়ে শান্তি আর অঞ্জলি যখন ঝাঁসির রানি বাহিনীতে যোগ দিল, অঞ্জলি তখন বাহিনীর কনিষ্ঠতম সদস্য।
১৯৪৩-এর ৯ জুলাই নেতাজি যখন সিঙ্গাপুরে ৬০ হাজার ভারতীয়ের সমাবেশে বক্তৃতা দিচ্ছেন, ঝাঁসি বাহিনী গঠনের আহ্বান সেখানেই শোনা গেল। তিন দিন পরেই একটি সভায় লক্ষ্মী স্বামীনাথনের নেতৃত্বে ২০ জনের একটি নারী ইউনিট রাইফেল নিয়ে তাঁকে গার্ড অব অনার দিল। ইউনিফর্ম তখনও আসেনি। মেয়েরা সে দিন সাদা শাড়িই পরেছিলেন। গোটা ব্যাপারটা আইএনএ-র মধ্যে সবারই যে খুব ভাল লেগেছিল, এমন নয়।
তবু সুভাষের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন সত্যি করে ঝাঁসি বাহিনী যে গড়ে উঠল, তার পিছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ক্যাপ্টেন লক্ষ্মীর। মাদ্রাজের বিখ্যাত উকিলের মেয়ে লক্ষ্মী বড় হয়েছিলেন সাহেবি কায়দায়। ওঁর মা সেই আমলে নিজে গাড়ি চালাতেন। টেনিস খেলতেন। এক বার একটি সাহেব খুনের মামলায় অভিযুক্ত ভারতীয় ছাত্রের হয়ে লড়ছিলেন লক্ষ্মীর বাবা। ছাত্রটি ছাড়া পেয়ে যায়। সাহেব উকিলরা তাই নিয়ে লক্ষ্মীর বাবাকে যা নয় তাই বলতে থাকে। লক্ষ্মীরা তার পর আর বিলিতি জামাকাপড় পরেননি। লক্ষ্মীর মা কংগ্রেসে যোগ দেন।
লক্ষ্মী নিজে ডাক্তারি পড়ছিলেন। মাঝপথে এক পাইলটের সঙ্গে প্রেম এবং পালিয়ে গিয়ে বিয়ে। বিয়েটা টেকেনি অবশ্য। কয়েক মাসের মধ্যেই লক্ষ্মী আবার পড়ায় মন দিলেন। এ বার তাঁর সম্পর্ক হল এক ডাক্তারি ছাত্রের সঙ্গে। লক্ষ্মী তাঁর সঙ্গে চলে এলেন সিঙ্গাপুর। ডাক্তারি করার পাশাপাশি যোগ দিলেন ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স লিগে। সেই সূত্রেই নেতাজির সঙ্গে পরিচয়। তিনি লক্ষ্মীর মধ্যে দেখতে পেলেন তাঁর ক্যাপ্টেনকে, লক্ষ্মী পেলেন তাঁর রাজনৈতিক গুরুকে। চাকরি, প্রেমিক সব ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আইএনএ-র কাজে।
লক্ষ্মীকে দেখে অন্য মেয়েরা সাহস পেলেন, অনুপ্রাণিত হলেন। মালয়ের রক্ষণশীল খ্রিস্টান পরিবারের দুই মেয়ে রসম্মা আর পুন্নাম্মা যেমন নেতাজির বক্তৃতা শুনে জেদ ধরল যুদ্ধে যাবে। কে বোঝাবে বাড়ির লোককে? এখানেও লক্ষ্মী।
বর্মার স্কুলে পড়াতেন প্রতিমা সেন। তিনি তাঁর ভাগ্নি মমতা গুপ্তকে তো আনলেনই, আরও বহু মেয়েকে জোটালেন। এমনিতে রেঙ্গুনে ঝাঁসি বাহিনীর সদস্য সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন লীলাবতী মেটা। তাঁর দুই মেয়ে রমা আর নীলম মায়ের সঙ্গেই বাহিনীতে আসে। পুরোদস্তুর সামরিক ইউনিফর্মে রাইফেল কাঁধে পতাকা নিয়ে সকলে যখন শহরের রাস্তায় গান গাইতে গাইতে কুচকাওয়াজ করতেন, লোকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকত।
কত জন ছিলেন ওঁরা? পূর্ণাঙ্গ তালিকা সে ভাবে পাওয়া যায় না। তবে জার্মান ইতিহাসবিদ হেরা হিলডেব্রান্ডট তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণায় বলছেন, সংখ্যাটা হয়তো সাড়ে চারশোর বেশি হবে না। এর অন্তত ষাট শতাংশ মালয়ে রবার শ্রমিক পরিবারের। দরিদ্র, নিরক্ষর। যুদ্ধের বাজারে তখন ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কট, সঙ্গে এস্টেটের অত্যাচার। অনেকেই পেটের টানে আইএনএ-তে নাম লিখিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের ব্যক্তিগত বয়ান ইতিহাসে ধরা নেই।
বাহিনীর দুটো শিবির ছিল। একটা সিঙ্গাপুরে, একটা রেঙ্গুনে। মেয়েদের থাকা-খাওয়া, ইউনিফর্ম, প্রশিক্ষণ- পুরো খরচটাই বহন করতেন প্রবাসী ভারতীয়রা। ১৯৪৩-এর ২২ অক্টোবর সিঙ্গাপুর ক্যাম্পের উদ্বোধন করলেন নেতাজি। সবাইকে একটা করে তোশক, বালিশ আর কম্বল দেয়া হল। সরু কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি বিছানা। টিনের থালায় খাওয়া। শৌচাগার পরিষ্কারের দায়িত্বও নিজেদেরই। সকলকে বলে দেয়া হল, চুল যেন কাঁধ না ছাড়ায়। গয়না পরা চলবে না। শুধু মঙ্গলসূত্রে ছাড়।
সেনা ব্যারাকে দিন শুরু হত ভোর ছ’টায়। প্রথমেই পতাকা উত্তোলন। তার পর ৪৫ মিনিট ব্যায়াম। সাড়ে সাতটায় প্রাতরাশ। তার পর দু’ঘণ্টা প্যারেড। পরের দু’ঘণ্টা গোসল, কাপড় কাচা ইত্যাদি। দুপুরের খাওয়ার পর এক ঘণ্টা বিশ্রাম। তার পর দু’ঘণ্টা ক্লাসরুমে। আবার দু’ঘণ্টা প্রশিক্ষণ। বেয়নেট ড্রিল, রুট মার্চ, রাইফেল-মেশিনগান চালানো। সাড়ে ছ’টায় পতাকা নামানো। সাতটায় নৈশাহার। সাড়ে ন’টার মধ্যে আলো নিবিয়ে দেয়া। রোববার ছুটি। সে দিন সিনেমা দেখতে যাওয়া, সমুদ্রের ধারে বেড়ানো, আইসক্রিম খাওয়া চলত। রেঙ্গুনে অনেকে নিজেদের বাড়ি থেকেও ঘুরে আসতেন।
ব্যারাকে প্রতিদিন একটা করে সাঙ্কেতিক শব্দ ঠিক করা হত। সেই সঙ্কেত বলতে পারলে তবেই কারও ক্যাম্পে ঢোকার অনুমতি মিলত। এক রাতে পাহারার দায়িত্বে মমতা। নেতাজি এসেছেন ক্যাম্পে। মমতা সঙ্কেত চাইলেন। নেতাজি বলতে পারলেন না। মমতাও তাঁকে ঢুকতে দিলেন না!
সুভাষচন্দ্র ভেবে রেখেছিলেন, আইএনএ বাহিনী বর্মা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢোকার পর তিনি মেয়েদের দেশের মাটিতে যুদ্ধ করতে পাঠাবেন। মেয়েরা মরণপণ যুদ্ধ করছেন দেখলে দেশবাসী স্থির থাকতে পারবে না। সুভাষের আশা ছিল, মেয়েদের রণাঙ্গনে দেখলে ব্রিটিশ বাহিনীর দেশীয় সেনারাও অস্ত্র ত্যাগ করবেন।
আশি জন মেয়ের একটি দলও বেছে রেখেছিলেন সুভাষ। শহিদ হওয়াই হবে যাদের কাজ। মানবতী পা-ে, রসম্মার মতো মেয়েরা সে কথা জানতেন। দেশের জন্য প্রাণ দেবেন, এটা তাঁদেরও স্বপ্ন ছিল। আইএনএ-র সিক্রেট সার্ভিসেও কিছু মেয়েকে নেয়া হয়েছিল। মমতা-প্রতিমা-মায়া-শান্তিদের কাছে সেটা ছিল বিরাট সম্মান। আঙুল কেটে নেতাজির কপালে রক্ততিলক এঁকে দিয়েছিলেন তাঁরা সবাই।
৪ জানুয়ারি ১৯৪৪ আইএনএ-র সদর দফতর সিঙ্গাপুর থেকে রেঙ্গুনে সরে এল। কয়েক দিনের মধ্যে লক্ষ্মীও চলে এলেন। ঠিক হল, প্রশিক্ষণ শেষ হলেই সিঙ্গাপুর থেকে রেজিমেন্টের বাকিদেরও নিয়ে আসা হবে। জাপ-আইএনএ যৌথ বাহিনী তখন ইম্ফল জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। রেঙ্গুনে এসে লক্ষ্মীর প্রথম কাজ হল ক্যাম্পের জন্য একটা নতুন জায়গা দেখা।
এর পরে অনেকগুলো ঘটনা দ্রুত ঘটে গেল। ১৮ মার্চ আইএনএ ভারতে ঢুকল। লক্ষ্মী তখন দিন কয়েকের জন্য সিঙ্গাপুরে। রেঙ্গুন থেকে মানবতী পা-ের নেতৃত্বে ২০ জন মেয়ে মেমিও রওনা হয়ে গেল। ভারতের কোহিমা থেকে বর্মার মেমিও-র দূরত্ব ৩০০ মাইলের মতো। যুদ্ধ যেহেতু তখন ভারতের মাটি ছুঁয়েছে, ঘাঁটি হিসেবে মেমিও-র গুরুত্ব বেড়ে গেল। লক্ষ্মীও তত দিনে রেঙ্গুন থেকে মেয়েদের আরও একটা দলকে নিয়ে মেমিও চলে এলেন। সেখানকার হাসপাতালের দায়িত্ব নিলেন।
ও দিকে শুরু হয়ে গিয়েছে ব্রিটিশ সেনার ভারী বোমাবর্ষণ। মে মাসের শেষে সিঙ্গাপুর থেকে একটা দল রওনা হয়ে গিয়েছিল রেঙ্গুনের উদ্দেশে। প্রায় ১২০০ মাইল রাস্তা। থাইল্যান্ড অবধি তাও এক রকম। সেখান থেকে বর্মা পৌঁছনো এক অভিজ্ঞতা বটে। মালগাড়িতে কুঁকড়ে বসে চাপাচুপি দিয়ে আসা। ট্রেন চলবে শুধু রাতে। আলো ফুটলে দাঁড়িয়ে যাবে। তখন জঙ্গলে লুকোতে হবে। কোয়াই নদী পার করা সেই রেললাইন যে কেন ‘মৃত্যু লাইন’ নামে পরিচিত, সেটা মেয়েরা আগে জানতেন না। তাঁরা ভেবেছিলেন, কষ্টকর পথ বলে বুঝি ওই নাম। কিন্তু হাড় জিরজিরে যুদ্ধবন্দিরা ধুঁকতে ধুঁকতে লাইনে কাজ করছে-এই দৃশ্য দেখার পরে, যতই হোক ব্রিটিশ সেনা, আইএ অনেকেরই মনটা কেমন হয়ে গিয়েছিল।

আসল ধাক্কাটা শুরু হল অগস্ট মাস থেকে। ইম্ফল আর কোহিমায় আইএনএ বড় রকম বিপর্যয়ের মুখে পড়ল। কাতারে কাতারে সেনা আহত অসুস্থ অবস্থায় ফিরতে লাগলেন। মেমিও হাসপাতালে মেয়েরা সকলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন নার্সিং-এর কাজে। সেপ্টেম্বরে নেতাজি মান্দালয়ে জরুরি মিটিং ডাকলেন। লক্ষ্মীকে নির্দেশ দিলেন, প্রশিক্ষিত নার্সদের রেখে মেয়েদের যেন রেঙ্গুনে ফিরিয়ে দেয়া হয়। ভারতের মাটিতে তাদের যুদ্ধে পাঠানো যে তখনকার মতো সম্ভব নয়, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট। হয় মেয়েরা যুদ্ধে শহিদ হবে, নয় নিরাপদে বাড়ি ফিরবে। মাঝামাঝি কিছু নয়।
যে আত্মবলিদানের জন্য এত দিন ধরে প্রস্তুত হলেন, সেটা অপূর্ণ রেখেই ফিরতে হবে? সারা রাত কান্নাকাটি করে মেয়েরা মেমিও থেকে ফের রেঙ্গুন পাড়ি দিলেন। অতঃপর ৫১ জন মেয়েকে মালগাড়িতে তুলে দেয়া হল ব্যাঙ্ককের উদ্দেশে। ইতোমধ্যে বর্মা ব্রিটিশদের পক্ষে নাম লিখিয়েছে এবং জাপানকে আক্রমণ করার জন্য তৈরি হচ্ছে। সেই অবস্থায় রেঙ্গুন থেকে ব্যাঙ্কক পৌঁছনো দুঃসাধ্য। লুকিয়েচুরিয়ে থেমে থেমে এগনো হচ্ছে। ৪ এপ্রিল সিত্তাং নদীর ধার থেকে রাত্তিরে ট্রেন আবার ছাড়ল। খানিক পরে একটা ধানখেতের মধ্য দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। ট্রেনের ছাদে উপুড় হয়ে রয়েছেন মেয়েরা। অন্ধকারে ট্রেন দৌড়চ্ছে। শোনা যাচ্ছে কাতরানি, নাকে রক্তের গন্ধ। কিন্তু মাথা তোলার জো নেই। খানিক পর সব শান্ত হলে সকলে টর্চ জ্বেলে দেখলেন, জোসেফিন বলে একটি মেয়ের মাথা ফুঁড়ে দিয়েছে গুলি। স্টেলা কাতরাচ্ছেন। পর দিন সকালে মারা গেলেন তিনিও। দুজনকেই জঙ্গলে কবর দেয়া হল।
২১ এপ্রিল নেতাজি রেঙ্গুন শিবিরে বাকি মেয়েদের সঙ্গে দেখা করলেন। পরের দিন বর্মার সমস্ত মেয়েকে টাঙ্গা ডেকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হল। বাকি রইলেন মালয়ের মেয়েরা আর সিঙ্গাপুরের আরও কিছু।
দু’দিন পরে জানা গেল, ব্রিটিশ সেনা অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। কিছু ক্ষণের মধ্যেই তারা রেঙ্গুনে ঢুকে পড়বে। জাপানের তরফে নেতাজিকে প্রস্তাব দেয়া হল, তিনি যেন বিমানে ব্যাংকক চলে যান। তিনি বললেন, মেয়েদের ফেরার ব্যবস্থা না হওয়া ইস্তক এক পা-ও নড়বেন না। তখন তাঁকে বলা হল, পর দিন মেয়েদের ট্রেনে তুলে দেয়া হবে। প্রতিশ্রুতি মতো ট্রেন এল ঠিকই। কিন্তু জাপানি সেনারা দুদ্দাড়িয়ে উঠে পড়লেন। মেয়েদের জায়গা হল না। নেতাজি রেগে বললেন, তিনিও যাবেন না।
শান্তি ভৌমিকের স্মৃতি, ২৪ এপ্রিল তালিম সেরে বিকেলে ব্যারাকে ফিরেছেন। হঠাৎ ঘণ্টা বেজে উঠল। সকলকে বলা হল, জিনিসপত্র গুছিয়ে খেয়েদেয়ে নাও। রাত ন’টা নাগাদ ট্রাকের কনভয় রওনা হল। অল্প কিছু দূর এগোতে না এগোতেই আকাশে বোমারু বিমানের চক্কর। সকলে ট্রাক থেকে মাটিতে ঝাঁপ দিলেন। নিমেষের মধ্যে ট্রাকগুলো ছাই হয়ে গেল।
সিঙ্গাপুরের শিবির তখনও চালু ছিল। ঝাঁসি বাহিনী আনুষ্ঠানিক ভাবে ভেঙে দেয়ার বিজ্ঞপ্তি সেখানে পৌঁছয় ১৫ অগস্ট। এর মধ্যে অন্যরা ফিরে এলেও লক্ষ্মী থেকে গিয়েছিলেন হাসপাতালেই। ডাক্তারির কাজে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন নিজেকে। ১৯৪৫-এর মার্চে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। তত দিনে ক্যাপ্টেন প্রেম সেহগলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল তাঁর। পরে ওঁদের বিয়ে হয়।
সেপ্টেম্বরে যুদ্ধ শেষ। নেতাজি নেই। ভারতও পরাধীন। যে উদ্দীপনা নিয়ে মেয়েরা সেনা দলে নাম লিখিয়েছিলেন, সেই আবহ এ বার বদলে গেল। অনেকেরই বাড়িতে বলা হল, আইএনএ নিয়ে বেশি কথা বলার দরকার নেই। চাকরি, বিয়েতে সমস্যা হতে পারে। বিশ্বের প্রথম নারী ইনফ্যান্ট্রির সদস্যরা অনেকে তাই স্বামীকেও জানাননি তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা। কিন্তু প্রত্যেকেই আমৃত্যু একটা কথা মানতেন। ১৯৪৩-’৪৫ ছিল তাঁদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দুটো বছর।
( আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে)