কবর বৃত্তান্ত

আপডেট: জানুয়ারি ১৪, ২০২২, ৭:৫৬ অপরাহ্ণ

আরিফুল হাসান


ফুলও শুকিয়ে গেলে ময়লা হয়ে যায়। মানুষ আর কি ছার! ময়লার গন্ধে বিড়াল কাঁদে সেই মানুষটা গেলে মারা। তবু ময়নাল হোসেন লাশ হতে চায়। তার দীর্ঘপরিক্রমার কবরজীবনে এছাড়া আর চাওয়া নেই। চার রাস্তার মোড়ে একটা কবরস্থানের পাশে ছোট্ট একটা কবর খুঁড়ে তার উপর চালা তুলে দিয়েছে সে। ছোট্ট বলতে এতটা ছোট্ট নয়। মোটামোটি একজন মানুষ থাকতে, উঠে বসতে, চাইলে হামাগুড়ি দিয়ে এদিক সেদিকে যেতে পারে এমন। তবে দাঁড়ানের জায়গাটাই সংকট। বেশি উঁচু করলে আর কবরের আকৃতি থাকে না অথবা কবরকে বেশি গভীর করে ফেললে তাতে আর শ্বাস ফেলার মতো পর্যাপ্ত বায়ু পৌঁছায় না।

তাই কবরকে কবরের মতোই রেখেছে সে। ভেতরে একটা পিতলের কুপি। তামাক খাওয়ার গুড়গুড়ি, মাটির দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়া একটা শিকেয় কয়েকটি নারকেলের পরিত্যাক্ত মালা। এগুলো সে খোপ হিসেবে ব্যবহার করে। কবরের এক কোণায় একটা মাটির কলসি তার উপর টেপ-খাওয়া টিনের মগ উপুর। প্রতিদিন সূর্য উঠার আধঘণ্টা আগে ময়নাল হোসেন কবর থেকে বের হয় এবং প্রাতকৃত্য শেষে খাবার পানি সংগ্রহ করে আবার চলে যায় কবরে। চব্বিশ ঘণ্টায় এই একবারই সে লোকালয়ে বের হয়। গ্রামের নাম চন্দ্রপুর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমানা প্রাচীর হতে পূবে নয়তো উত্তরে এর অবস্থান। দুটি রোড দুদিক দিয়ে চলে গেছে পরস্পরকে যোগচিহ্নে কেটে। একটা গেছে কাউলিয়া গ্রামের দিকে, আরেকটি চন্দ্রপুর বাজার হয়ে তোতাখান রোড ধরে সোজা ট্রেন রাস্তার দিকে। ময়নাল হোসেনের কবরের বাসিন্দা হওয়ার গল্পটা বেশ রহস্যের। অনেক আগে সে ব্ল্যাকার ছিলো। অতঃপর সে একদিন চোরাই মালের অপরাধে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীর কাছে আটক হয়ে আগরতলার একটা জেলে মাস ছ’য়েক থাকে।

ছাড়া পেয়ে সে আর দেশে ফিরেনি। আরও মাস ছ’য়েক গড়িয়ে যায়। শোনা যায় ময়নাল হোসেন কামরূপ গিয়ে মন্ত্রটন্ত্র শিখছে। তারপর একদিন সে দেশে ফিরে। দেশে ফিরে মানে একেবারে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে দেশে ফিরে। গায়ে সুতোটি পর্যন্ত নেই। একেবারে দিগম্বর পাগল হয়ে যখন সে বাড়ি আসে তখন তার বাড়ির মানুষেরা তাকে দূর দূর করে খেদিয়ে দেয়। এরপর পাগল ঠাঁই নেয় বাজারে। বাজারের একটা দোকান-ছাউনির নিচে তুমুল বৃষ্টির সন্ধ্যায় গ্রামের লোকেরা তাকে আবিষ্কার করে অন্য এক ময়নাল হোসেন রূপে। তারপর সমস্বরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেÑ আহ, গেলো! বাজারেও ময়নাল হোসেনের ঠাঁই হয় না বেশিদিন। একদিন সে রাতের ট্রেন ধরে কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হয়ে পড়ে। এই অবসরে তার জায়গাজমি সব দখলটখল হয়ে যায় এবং দীর্ঘ সতের বছর পর যখন ময়নাল হোসেন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গ্রামে ফিরে তখন আর তার মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকে না। পরিচিত পরিজন হয়তো একদিন দুইদিন সৌজন্যতার বশে আশ্রয় দেয় কিন্তু তৃতীয় দিনটিই তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠে। ময়নাল হোসেন এভাবে সপ্তাখানেক থাকার পর সিদ্ধান্ত নেয়, না, এই গ্রামে আর না। মাজারে মাজারে পড়ে থাকবে, গাছতলায় পড়ে থাকবে, তবু সে আর তার জন্মগ্রামে ফিরে আসবে না। কিন্তু এ গ্রামেই তাকে থাকতে হয়। সেটি তার গ্রামে ফেরার অষ্টম দিনের ঘটনা।

রাত একটা বাজে। ময়নাল হোসেন ঝোলাতে কয়েকজনের দেওয়া কেজি দেড়েক চাল সম্বল করে রেলস্টেশনের দিকে যাচ্ছে। নিজের জন্মগ্রামটার প্রতি কেমন যেন মায়া উথলে উথলে উঠছে তার। হঠাৎ সে কবরের কাছাকাছি একটা কিছুর শব্দ শুনে থমকে গেলো। একটা আতংক তার শিরার গহীনে কাঁপন ধরিয়ে দিলো। গোঙানির মতো একটা আওয়াজ আসছে কবরস্থান থেকে। ময়নাল হোসেন প্রথমে মনকে বোঝায়, বোধহয় শেয়াল-টেয়াল হবে। গতকাল রইজুদ্দির ছেলেকে কবর দেয়া হয়েছে। তাকে খেতেই হয়তো শেয়ালেরা কবর খুড়ছে এখন। কিন্তু ঝোপ- জঙ্গলে বেড়ে উঠা আর বন-বাদারে বাস করা ময়নাল হোসেনের কাছে এটি শেয়ালের গোঙানি বলে মনে হয় না। তার মনে হয় এটি পিশাচের কণ্ঠ। পিশাচ সে কখনো দেখেনি। বাব-দাদার মুখে গল্প শুনেছে পিশাচ খুব ভয়ানক প্রাণি। মরা মানুষ খায়। আগুনের মতো চোখ জ্বলে।

ময়নাল হোসেন আল্লা-নবীর নাম নিয়ে বুকে ফু দেয়, থুথু দেয়। তবু তার ভয় যায় না। আবার একটা কৌতূহলও জাগে তার। জীবনের তরে সে একবার অন্তত পিশাচ দেখতে চায়। সে ভয়ে ভয়ে এগুতে থাকে। তারপর সে যা দেখতে পায় তার জন্যে তার চোখ কোনোদিনও প্রস্তুত ছিলোনা। সে দেখে আজ থেকে সতেরো বছর আগের ময়নাল হোসেন রইজুদ্দীনের ছেলের কবরটি খুঁড়ছে। গায়ে কোনো সুতোটি পর্যন্ত নেই। দুই হাতের নখ দিয়ে, দাঁত দিয়ে সে কবরের মাটি সরাচ্ছে। ময়নাল হোসেনের একবার ইচ্ছে হয় গিয়ে পাগলটিকে থামায়। কিন্তু কিসের যেন ঘোরে তার পায়ের নিচে শেকড় গজিয়ে গেছে। গ্রামের নিস্তব্ধ রাস্তায় কবরের পাশে সে গাছপালা হয়ে সব দেখতে থাকে। তরুণ ময়নাল হোসেন কবরের মাটিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলতে থাকে এদিকে ওদিকে। টেনে টেনে চাটাই ও বাঁশ তুলে ফেলে। তারপর কবরে নেমে টেনে হিঁচড়ে তুলে আনে লাশটিকে।

তার শরীরে যেন অশুরের শক্তি ভর করেছে। ময়নাল হোসেন তার চোখকে বিশ্বাস করাতে পারে না। সেকি সত্যি দেখছে এসব? নাকি তার স্বপ্নের ভেতর ঘটে যাচ্ছে এমনসব অবিশ্বাস্য কা-? কিন্তু না, যা ঘটছে বাস্তবেই ঘটছে। ময়নাল হোসেন দেখে তার অতীতের ছায়াটা অতঃপর লাশটিকে কবরের পাশে শুইয়ে দেয়। তারপর মৃতমানুষটির কানের কাছে মুখ এনে বলে, তুই মরা না আমি মরা? ক, কতা ক? ক, তোর জন্য কবর, না আমার জন্য কবর? অন্ধকারের ভেতর তার কথার শেষাংশ প্রতিধ্বনিত হয়ে তার কাছে ফিরে আসে। হ হ, দেখছোস, কইসিলাম না, আমার জন্যই কবর, আমিই মরা। অতঃপর ময়নাল হোসেনের সতেরো বছর আগের ছায়াটা কবরের ভেতর শুয়ে পড়ে। রইজুদ্দীনের ছেলের লাশটা বিভৎস অবস্থায় পড়ে থাকে কবরের পাড়ে। এতটুকুই দেখতে পারে ময়নাল হোসেন। তারপর তার পায়ের নীচের শেকড়ের বাঁধনগুলো আলগা হয়ে গেলে সে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যায়।

পরদিন গ্রামের লোকেরা কোনো খোড়া কবর পায় না কিংবা পায় না রইজুদ্দীনের ছেলের লাশ বিভৎস অবস্থায়, বরং ময়নাল হোসেনকে তারা কবরের কাছ থেকে উদ্ধার করে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তোলে। বেহুঁশ অবস্থায় কবরের কাছে পড়ে থাকতে দেখে গ্রামের অনেকেরই তার উপর মায়া হয়। কেউ কেউ বলে, থাকতে দাও না তারে গ্রামে। কোনো এক কোণায়-কাণায় ছাপড়া-টাপড়া তুলে পড়ে থাকবে,। কেউ কেউ বলে, তার নিজের জায়গাটা ছেড়ে দিলেই তো হয়।

চেরমেন ক্যান যে শুধু শুধু তার জায়গাটা দখল করে রেখেছে। চেয়ারম্যানও অবশেষে তার জায়গাটা ছেড়ে দিতে সম্মত হয়। কিন্তু রাজি হয় না ময়নাল হোসেন। তার একই কথা। সে আর বেঁচে নাই। সুতরাং মরা মানুষের জাগা-সম্পত্তি দিয়া কী হইবো? তার জাগা-সম্পত্তির দরকার নাই। দিতেই জুদি চায় গ্রামের লোকজন, তবে যেন তারে কবরস্থানে থাকার অনুমতি দেয়। সেই থেকে ময়নাল হোসেন কবরবাসী। জিন্দা হয়েও সে লাশের পরিভাষা।