কবিকীর্তন

আপডেট: মার্চ ২৪, ২০১৭, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

খৈয়াম কাদের



কবিরাই সবচেয়ে সূক্ষ্মদর্শী। অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সমাজ গবেষক, ধর্মগুরু, দার্শনিক, এমনকি বিজ্ঞানীদের চেয়েও। তবে চেতনার এই সূক্ষ্মদর্শীতা কেবল সেই কবিতেই উদ্ভাস্য যে কবি আত্মমূর্তির সংকীর্তক নয়। বরং তার মনন, বোধি ও সংবিত্তি সহজাত শুদ্ধতা ও সুস্থতায় হৃষ্ট এবং তার স্বজ্ঞায় প্রতিভাত প্রত্যয়ী প্রেম ও জৈবনিক প্রণয়। যে কবি বৈভব বাসনায় বিভোর, প্রতিপত্তির ক্রীড়নক এবং যশ, খ্যাতি ও প্রাচুর্যের প্রতি অনুরক্ত, তার  অন্তর্বোধে সংবেদনশীলতা এবং স্বতঃস্ফূর্ত কবিত্ব নেই, নেই জীব ও জগতের প্রতি মর্মনিষ্ট মানবিক দায়বদ্ধতা। সুতরাং এই আলোচনায় সেই কবি অপ্রাসঙ্গিক, অপাংতেয়।
বিজ্ঞানী বস্তুর ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক কার্যকরণের নিরীক্ষানির্ভর প্রমাণের মাধ্যমে কোন বিশেষ এবং নির্দিষ্ট সত্য উদ্ঘাটনে নিমগ্ন থাকে। কিন্তু কবির অভিলক্ষ্য যাপিত জীবনে সংঘটিত সকল সত্যের অভিজ্ঞান। তার বোধিতে সক্রিয় থাকে লৌকিক কার্যকারণের প্রত্যক্ষণ প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যয়ন সংবেদ। অর্থনীতিবিদের উপযোগ অন্বিষ্ট প্রাক্কলন এবং তদানুবর্তিক উৎপাদন ও বণ্টন-বিপননের সংবীক্ষণ থেকেও কবি চেতনের জীবনবীক্ষা আমূল ভিন্ন। কবি কোন হিসেব ও হিস্যা বোঝে না, বোঝে না সম্পদ সঞ্চয় ও অর্থ প্রবাহের কেতাবি নীতি। সে শুধু জীবনকে বোঝে, তরল স্বপ্নাবিষ্ট হৃষ্ট জীবন, যেখানে বহমান চিত্তজারিত শতস্রোতী প্রেমের সরবর। আর সাংবাদিক? সে তো অনেকটাই দায়বদ্ধ কারক। কারণ সংবাদ মাধ্যমগুলো মূলত পুঁজিবাদের উদরোত্থিত জনমন আকর্ষণকারী গণকীর্তির তথ্যকলা এবং সাংবাদিক সেই কলার আদিষ্ট এবং নিয়ন্ত্রিত উপস্থাপক। তাই সত্য সন্ধানের ব্রত সত্ত্বেও সময় ও ক্ষেত্রবিশেষে সাংবাদিককেও নিকেশ করে লিখতে হয়, বুঝতে হয় পুঁজি ও প্রভুর অভিলক্ষ। কিন্তু কবির কণ্ঠ উচ্চকিত, বাঁধাবন্ধনহীন। কারো ধমক বা চোখ রাঙ্গানীতে সে অবনত হয় না, স্তব্ধ হয় না; বন্ধ করে না তার কলমের গতি।
২.
সমাজ গবেষক মানব সমাজের পরিবর্তন ও প্রগতির প্রতৈœতিহাসিক ইস্তেহার নির্মাণ করে। অঙ্কন করে গত ও রত জীবনের বিচিত্র কথকতা। বায়োস্কোপের মতো দৃশ্যান্তরিত করে সভ্যতার অগণিত স্তর। কিন্তু আত্মার মুকুর? সে তো কেবল কবিরই অভিষ্ঠ স্থল। আবেগ ও অনুভূতির সুকোমল পলি সমৃদ্ধ মানবাত্মার সেই নিভৃত প্রদেশে প্রবেশের গোপন মন্ত্রটি শুধু কবিরই জানা। তাই মানুষের নিবিড়তম প্রত্যাশার ভাষা কবির কলমেই প্রাণবান হয়। কবিরাই হয়ে ওঠে মানুষের শ্রেষ্ঠ স্বজন। মানুষই কবিদের কাব্য কথামালা। জীবনই কবিদের অনন্ত প্রেম। আর রাজনীতি? সে এক জটিল অভিধা এবং রাজনীতিকগণ সেই জটিলতার স্রষ্টা ও শিকার। ফলে রাজনীতিকের কথা ও কাজে প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয় সত্যাসত্য এবং স্বত:স্ফূর্ততার অভাব। তাকে বলতে ও চলতে হয় দল নির্ধারিত নির্দিষ্ট পথে। এছাড়াও ক্ষমতার ভেতরে অথবা বাইরে অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতেও বক্তব্য প্রদান ও আচরণ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাকে অবলম্বন করতে হয় সচেতন এবং সুচতুর কৌশল। এক কথায় তার বিবেককে বন্দী রাখতে হয় দলের নিজস্ব নীতি ও আদর্শের লৌহ সিন্দুকে। তাই ভয় থাকে দলচ্যূৎ হওয়ার যদি স্বকীয় সক্রিয়তায় জেগে ওঠে তার নিজস্ব ন্যায়বোধ। আবার রাষ্ট্র ক্ষমতার সংশ্লিষ্টতার সুবাদে রাজনীতিকের একদিকে যেমন জনকল্যাণে আত্মনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, আরেক দিকে ঠিক তেমনি ভোগবাদী ও অত্যাচারী চরিত্র পরিগ্রহণের সম্ভাবনাও প্রবল হয়ে ওঠে। এমন কি অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তবেও রূপায়িত হয়। কিন্তু কবির জগত অসীম। তার বিচরণক্ষেত্র সমগ্র বিশ্বচরাচর। মানব অধিকৃত পৃথিবী নামের এই প্রাণময় গ্রহ থেকে শুরু করে অন্তহীন ব্রহ্মা-ের সর্বত্র বিচারী তার কল্পসরণ। কারণ, তার নিয়ন্ত্রক জীবন এবং নিমিত্তও জীবন। সুতরাং কোন বিশেষ বলয়ের কাছে তার দায়বদ্ধতা নেই, নেই চ্যুতি-বিচ্যুতিরও কোন ভয়। কবি বিদগ্ধ, বৈষয়িক নয়। তাই ক্ষমতার দাপট বা অর্থের লোভ-প্রলোভনÑ কোন নেতিচিন্তাই স্পর্শ করে না তার শুদ্ধতা-পিয়াসী মরমী মননকে। অন্যদিকে দার্শনিকের দাবী দর্শনের অধিভুক্ত জগতের সমস্ত জ্ঞান। কিন্তু কবি তা মানতে নারাজ। কারণ কবির কল্পনার চেয়ে সম্প্রসারিত আর কোন ক্ষেত্র নেই। তাই দর্শনকেও আত্মস্থ করতে হয় কবির সৃষ্টিকে আর কবি তো অবিরাম ধাতস্থ করে দর্শনের তাবৎ অধ্যায়। দার্শনিকের অধিবিদ্যা জ্ঞান-অন্বেষার অধ্যয়নকে বিস্তৃত করে। চিন্তনস্নাত করে মানব বোধির গ্রন্থিগুলো। জাগতিক কর্ম পরিক্রমায় উপস্থাপন করে স্রষ্টা ও সৃষ্টি বিষয়ক অসংখ্য জটিল জটিল প্রশ্নমালা। উসকে দেয় মানুষের গভীরতর অনুসন্ধিৎসাকে। আর কবি অংকোচে অবগাহন করে সেই অমীমাংসিত প্রশ্নকুহেলির অতল কন্দরে। মননকল্পে বিনির্মিত শিল্পিত উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও বাণীচিত্রের মাধ্যমে বিমূর্ত এবং মূর্তমান করে তোলে সেইসব প্রশ্ন মালার আখ্যান-উপাখ্যানসহ সকল রাহস্যিক সারাৎসার। তাহলে দেখা যাচ্ছে কবি দর্শন থেকে যতটা নেয় দেয় তার অধিক। সুতরাং দার্শনিক কবির শিক্ষক বা পথনির্দেশক নয়; প্রভাবক মাত্র। কিন্তু কবি দার্শনিকের উপস্থাপক এবং উৎপাদক।
সভ্যতার সূচনালগ্নে ধর্মগুরুরাই মানুষকে আলোর দিশা দিয়েছিলো। অশীলিত আদিমতা থেকে তুলে এনেছিলো প্রজ্ঞাময় পরিশীলনের পথে। তাকে যুগিয়েছিলো চিন্তার খোরাক, ভাবনার উপকরণ। কিন্তু সেই আলো যতই প্রজ্জলিত হতে থাকলো, উদ্ভাসিত করতে থাকলো দিকদিগন্তর; ততই ভয়ার্ত, শংকিত এবং সংকুচিত হতে থাকলো এই ধর্মগুরুর দল। তারা ভাবলো সেই আলোর দাহ্যদাহে নিজেরাই না ভস্ম হয়ে যায়। তাই তারা অবগুণ্ঠিত হতে থাকলো নিজেরই ভেতরে। চিন্তার গতিপথে নির্মাণ করলো দুর্লংঘ্য দেয়াল; অবরুদ্ধ করলো জীবনকে, জননকে। আর ঠিক তখনই অর্গল ভাঙার হুংকারে আবির্ভূত হলো কবি। পৃথিবীকে শোনালো মুক্তির বাণী, দিকেদিকে জ্বাললো আঁধারবিতারী দাউ দাউ মশাল। শাস্ত্র, সংস্কার ও গতিহীনতার অন্ধকারে কবিই প্রদীপ্ত করলো প্রগতির প্রথম প্রদীপ। আর শিক্ষক? সে তো পরিক্রমণ করে এক গ-িবদ্ধ পরিসরের মাঝে। উদার ও উম্মুক্ত চিন্তার অবকাশ তার খুবই সীমিত। ফলে গদে বাঁধা আপ্তবিষয়গুলোই তার প্রধান বাহন ও বহন। আর জ্ঞানচর্চার যে কিঞ্চিৎ মুক্ত ময়দানটুকু তার রয়েছে, সেদিকেও সে উদাসীন, উন্নাসিক। সে চর্বিত-চর্বনের অলস জাবরে অভ্যস্ত এবং তৃপ্ত। তার দৃষ্টি সম্প্রসারিত এবং বিস্ফারিত নয়, স্থীরিকৃত। কিন্তু কবি তো অতৃপ্ত, অস্থির। সুতরাং কবির কাতারে শিক্ষক নেই, যদিও শিক্ষকের মাঝ থেকে সৃষ্টি হতে পারে কবি। প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকারদের থেকেও কবির প্রকাশ ভঙ্গি ও নির্মাণ কলা ভিন্ন। গদ্যকার তার অনুভব, উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতাকে ব্যক্ত করে সুবিস্তৃত বর্ণনা, বিবৃতি ও কথোপকথনের মাধ্যমে। ঘটনার ভেতর ও বাহিরকে উম্মোচিত করে অনুপুংখ উপস্থাপনায়। কিন্তু কবি সে কাজটি করে অতি সংক্ষিপ্ত এবং সৌন্দর্যমন্ডিত শব্দ গাঁথুনি আর সুরসমৃদ্ধ ধ্বনি-দ্যোতনার আবহে। তার দায়িত্ব ইশারায় ইঙ্গিত করা। পাঠককে ঠেলে দেয়া বহুমুখী ভাবনার মাঠে।
কবিরা এক স্বতন্ত্র সম্প্রদায়। তাই  বলে তারা অন্যদের থেকে বিছিন্ন নয়, বিভক্ত নয়। বরং কবিরা সকলের স্বজন, আর সকল মানুষই তাদের অনুভব ও অনুধ্যানের মৌলিক উপকরণ। ভাব ও চিন্তা জগতের প্রতিটি ক্ষেত্রই মূলত নিজ নিজ পরিম-লে ব্যাপৃত থাকে। অন্যকে ধারণ বা অন্যের প্রতি সম্প্রসারণের প্রবণতা নিতান্তই কম। কিন্তু কবির প্রাঙ্গনে সকলের প্রবেশ সিদ্ধ এবং কবিও কর্ষণ ও গ্রহণ করে সকলকে। ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে শুরু করে ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতিÑ সবই থাকে তার সহজাত অধিগ্রহণে। অর্থাৎ সে একই সঙ্গে জীবননিষ্ঠ সকল পাঠের সংশ্লেষণ ও প্রবাহনে ঋদ্ধ। তাই তার ভুবনে কোন বিভাজন থাকে না, থাকে না কোনো অভাজনও। কবি জীবনের সুখে অভিভূত হয়, আপ্লুত হয়; উপভোগ করে তার সমস্ত সুন্দর ও সৌন্দর্যকে। আবার কষ্ট দেখলে ক্লিষ্ট হয়, আহত হয়; প্রতিবাদ করে শব্দশিল্পের অস্ত্র উঁচিয়ে। কবি ভালবাসে ভালোবাসাকে, সুন্দরকে; ভালোবাসে ঘৃণিতকে এবং ঘৃণ্যকেও। তবে ঘৃণা করে ঘৃণাকে। তার চিত্তে কোন বিবাদ থাকে না, থাকে প্রতিবাদ; বিরাগের আড়ালে থাকে অনন্ত অনুরাগ। তাই জীবন দিগন্তে সে এক শ্রেষ্ঠ প্রেমিক। মনন, প্রতীতি ও সৃষ্টির মাঠে এক অনন্য স্মারক।