কবি অনীক মাহমুদ ও রবীন্দ্রচেতনা

আপডেট: মে ১৩, ২০২২, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

এস এম তিতুমীর:


কবি আর তার কাব্যচেতনা, এ দুয়ের সার্থক ও পরিপুষ্ট সম্মিলনদ্যুতি আলোকিত করতে পারে হাজারো মননাঙ্গন। সুকুমারবৃত্তির অনন্য ধারা কবিতা, যুগ যুগ ধরে তার স্বাতন্ত্র্যবৈশিষ্ট্য নিয়ে বয়ে চলেছে। আধুনিক কাব্যচেতনায় কবিতার রূপাঙ্গিক ও অবয়বগত পরিবর্তন হলেও বোধের জায়গা যখন উদ্দীপ্ত তখন তা মনকে নাড়া না দিয়ে নিরব থাকতে পারে না।

কাব্যভাবনার ভূয়সি আর নিরঙ্কুশ উচ্ছ্বলতা এবং প্রদীপ্ত তন্ময়তার তরী যে পথ দিয়েই যাক না কেনো তার কাব্যপ্রেমিদের তা আকৃষ্ট করেই করে। আর সেই আকর্ষণের আকীর্ণতায় আজন্ম প্লবতা বুকে নিয়ে কবিতা জেগে থাকে। প্রায়শই শোনা যায়-‘এখন আর আগের মতো কবিতা হয় না’। তাহলে কবিতা হয় বা হচ্ছে এ কথা সত্য, এখন প্রশ্ন হলো আগের মতো হলো কি না সেটা। আমরা যা জানি যা পড়ি তার যেমন পরিবর্তন এসেছে তেমনি কবিতারও পরিবর্তন এসেছে।

তাই বর্তমানের সাথে যুক্ত থেকে যদি কবিতাকে অনুধাবনের চেষ্টা করা হয় এবং সবসময় আমি যা জানি তার সাথে কবিতা না মিলিয়ে উপলব্ধির জায়গায় নতুনের সুস্থ-স্থান নিশ্চিত করতে পারি তবে তা আত্মগ্রহণে অপর্যাপ্ততা বর্জনে এগিয়ে আসবে অনায়াসে। কবিতা পুরাণের ওথেনো, জুপিটার। কেশবতী সিনড্রেলার কেশউর্মী।

তার নিজস্ব আলিঙ্গনশক্তি আছে। আর সে শক্তির ছায়াতলে পতঙ্গের মতো টুপ করে কখন যে মন ঝাপ দেয় তা মন নিজেও জানে না। ভালোলাগার ক্ষুৎপিপাসা জোগান দিতে দিতে কবিতা কখনো কখনো অমর হয়ে উঠে, হয়ে উঠে ঠোঁটস্ত। আসলে শৈশবের লোরি থেকে অধুনাকালের যান্ত্রিক সুর সবটা জুড়েই আছে কাব্যের পরিচলন। বাংলা কাব্যাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথ পরিহার্য। সাহিত্যের সব অঙ্গনই আঁকড়ে আছে তাঁর অসীম সাহিত্য ভাণ্ডার।

কবি অনীক মাহমুদ তাঁকে নিয়েই রচনা করলেন কাব্যগ্রন্থ-‘আজি এ প্রভাতে রবির কর’। গেল সপ্তাহেই পালিত হয়ে গেল রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী। বিধায় প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথ। কবি অনীক মাহমুদ ‘বিহাস’এ বসেই লিপিবদ্ধ করেছেন গ্রন্থের ভাবনা। এতে উঠে এসেছে রবীন্দ্রজীবনের নানান দিক। তার মধ্যে আছে পারিবারিক, সাংসারিক, সামাজিক ও আত্মোস্ফূরণ।

রবীন্দ্রনাথকে আমরা অনেক পড়েছি। তবুও নতুন আঙ্গিকে নতুন ভাবনায় কবি অনীক মাহমুদ এ গ্রন্থে উপস্থাপন করেছেন। যা নান্দিপাঠের নিমগ্নতাকেও ছাপিয়ে অতুল ভালোলাগার পাশে আবদ্ধ করার ক্ষমতা জাগিয়েছে প্রতিটি পরতে পরতে।

তিনি কাব্যগ্রন্থের প্রথমেই ‘চিরনমস্য রবীন্দ্রনাথ’-এই শিরোনমে কবিতা সংযোজন করেছেন। বলছেন-‘ আমাদের নিত্যকাজে প্রতিদিনের একান্ত আত্মযোগে কবিগুরু / অনিবার্য স্বপ্নর খিলান ধরে কীভাবে দাঁড়াও এসে নিজের অজান্তে?/ অত্যাশ্চর্য হয়ে খাবে আমি শরৎচন্দ্রের বিস্ময়বোধের উর্মিলতা খুঁড়ে,/ ‘কবিগুরু, তোমার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই।’ ‘আত্মযোগে কবিগুরু’ এই বাক্য দ্বারা সাহিত্যসেবিদের কাছে কবিতাটি অনেক বেশি আপন হয়ে উঠেছে।

কবি এখানে রবীন্দ্রনাথের অপরিহার্যতাকেই আত্মসুরে নিবেদন করেছেন। রবীন্দ্র-রচনার, ব্যাপকতার কাছে নিত্য আমরা ডুবে যায়। আর তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ‘হরিপদ কেরানি’ তা নিয়ে কবি লিখেছেন ‘হরিপদ কেরানির তামামি’। -এ তে লিখছেন-‘ হরিপদ কেরানি মশায়, তোমার এ কাটা ঘায়ে/ কখনো দিতে চাই না কাগজি লেবুর রস পাষণ্ডের মতো।

/…তুমিও এলিয়টি প্রফ্রুকের গানে নিজেকে সঁপে দিলে,/ গরসাহসের খাদে বাঁধলে নিজের পরাজয় আষ্টেপিষ্ঠে;’। জীবন-জীবিকার দৈন্যতাবশে ছা পোষা মানুষের আকার খুব সহজে এ কাব্যে আমারা খুঁজে পায়। আর পুরানোকে আবার নতুন করে নতুন রূপে পায়।

এখানে কাব্যতালে নিঃশেষ তলানিটুকুও ভরে দেয় আনন্দেন অনুরণন। আবার ‘রতনের শূন্যতায়’ আঝে- এই কবিতায় কবি আরেক চরিত্রকে আন্দোলিত করেছেন অনুপম আয়োজনে ‘..হায় রতন ! হায় পোস্টমাস্টার !/ জীবনের পালে এভাবেই বাতাসের বহ্নি আন্দোলিত হয়,/ পোড়ায় বাসর, পোড়ায় দোসর !/ জন্ম-মৃত্যু-বিরহের সুরলোকে ক্লান্তির বাঁধন খুরে যায়,/ একা ! গভীরতর একার কিন্নর শোনায় ভয়াল সত্যাভাস ;/ ‘ফিরিয়া ফল কী ! পৃথিবীতে কে কাহার ?’ পোস্টমাস্টার আমাদের খুব চেনা চরিত্র। যা চিরঞ্জীব।

এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ, বাঙালি লেখক, সংগীতস্রষ্টা ও ভাষাবিদ, ব্রিটিশ ভারতের নারীমুক্তি আন্দোলনের বলিষ্ট ভূমিকা পালনকারী ‘সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর’। তাঁকে নিয়ে কবি লিখছেন-‘নারীর স্বাধীন কলাবৃত্তি মননের মুক্ত সাজে/ সত্যেন্দ্রের সোৎসাহ করেছিলো স্পর্শ বাঙালি আকাশ;/ রাঁচির নির্মিতি সত্যধাম ও শান্তিধাম-/ ছেড়ে মাঝে মাঝে/ কলতকাতার যান্ত্রিক হাতছানি,/ কথায় ও কাজে অভিন্ন দোসরতা/ রবীন্দ্র-মনীষা দিগালয়ে ছিলো তাঁর/ হর্ম্যকান্তি আদর্শবিস্তার।’

এরপরের কবিতায় আছে ‘কাদম্বরী কৈফিয়ৎ’-এতে ছয়টি পর্বে যুক্ত হয়েছে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য। এতে এসেছে অর্ধাঙ্গীনীর কথা-‘বর তার যে উনিশ বছরের ফিরিঙ্গি যুবক/ বাহারি মাথার চুল, স্নিগ্ধ আঁখি, বুদ্ধিদীপ্ত চাহিনিটা!/ আমিতো শ্যামাঙ্গী, হলফলে দেহভার নাদান কিশোরী’

ছয় নম্বর পর্বে এসেছে-‘আমি কাদম্বরী ছিলাম আশায় নতুন বাবুটা/ নিশ্চয়ই নিতে আসবেন’
..রবির সাহিত্য, ভানুর সফেদ কথকতা,/ভারতীর জ্যেষ্ঠ বিহঙ্গের পদত্যাগ,/ শ্বশুর মহর্ষি তাঁরই নির্দেশে ভস্মীভূত চিঠিপত্র,/ ভস্মীভূত স্মৃতিচিহ্ন!…অপলাপে হারায় না চিরায়ত মাহাত্ম্য সংবেদ!’
আবার জনীর কথা আছে সাবলীল ভাষায় ‘সারদা সুন্দরী দেবী’- ..একান্ত সরল প্রাণ রবীন্দ্র-জননী সর্বোপরি,/ ঠাকুরবাড়ির গৃহবধূ নারী, সারদা সুন্দরী।

সবশেষে যুক্ত হয়েছে ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর’। এখানে কবি আবারো তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথের কাব্য অবদান ও ঋণ। রবীন্দ্রনাথ হয়তো ফুরোবার নয় কখনো। শিক্ষা, দর্শন, বিজ্ঞান, অধ্যাত্মচেতনা, ছন্দ, তাল, লয়, মাত্রা, সুর, সঙ্গীত, গীতিনাট্য, নাটিকা, উপন্যাস, গল্প, শিশুসাহিত্য সবই অফুরান। তিলোত্তমা সাধনার নিচে দাঁড়িয়ে আছে সাহিত্যের যুগ-যুগন্ধর।

কবিগুরু আকাক্সক্ষা কবি অনীক মাহমুদের এই কাব্যের শেষ কবিতায় উঠে এসেছে বলাকার গতিতে ‘ আমাদের ঋণ আছে রবীন্দ্র ভাবের ঘরে,/ যে ভাণ্ডার আমাদের বোধের আয়ুষ্কাল ধরে/ এনে জমা করে অমরতা পাষণ্ডের সখ্যে,/ কখনোবা গড়ে তোলে সখ্য যাযাবর।/ এক কবির আকুতি ‘আমি পৃথিবীর কবি’। কবির পদাবলি আর ভাবনার তরঙ্গ সন্তোরণে আমরা যারা যুক্ত হয়েছি তারা কাব্যভুবনে মিশে গেছেন।

অনেক ভয় কাটানো ভালোবাসার অভয় নিয়ে হৃদয়ের অলিন্দে যে মুখ উঁকি দেয় বারবার তার সাথে কবিতা একাত্মতা প্রকাশ করে। কবি অনীক মাহমুদ এ গ্রন্থে তাঁর চেতনাগত ভাবনার সাথে মিশিয়ে ফুটিলে তুলেছেন রবীন্দনাথকে। কবি আর কবিতা, চিরকালীন এই আবেদনে অটুট ও অনবদ্য।