কবি রজনীকান্তের স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে গেলেও রাজশাহী নির্মিত হলো রজনীকান্ত সেন মঞ্চ

আপডেট: এপ্রিল ১৭, ২০২১, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ জুলফিকার:


পঞ্চকবির অন্যতম কবি রজনীকান্ত সেন ছিলেন আমাদের রাজশাহীর কবি। তিনি লেখা-পড়া করেছেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে এবং রাজশাহী কলেজে। তাঁর বসতবাড়িও রয়েছে এখানে। শত বছর আগে রাজশাহীর সাহেববাজারের সেই বাড়িতে তিনি পরিবার নিয়ে মহাসুখে বসবাস করতেন এবং এখানেই রচনা করেছেন বাংলার বিখ্যাত গান-কবিতা। ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের সময় বিলাতের মিহি কাপড় বর্জনের সিদ্ধান্ত হয়। শুরু হয় বিদেশি মিহি কাপড়ের পরিবর্তে বাঙালির জন্য দেশীয় কলে মোটা কাপড় তৈরি। কিন্তু কোলকাতার বাবুরা বিলাতি মিহি কাপড় ছাড়তে পারছেন না। কবি রজনীকান্ত মোটা কাপড় ও দেশীয় পণ্যকে জনগণ চিত্তে স্থান করে দিতে এবং ভারতবাসীকে জাগানোর উদ্দেশ্যে লিখলেন এবং মুক্তকণ্ঠে গাইলেনÑ
‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তু’লে নে রে ভাই।
দীন-দুঃখিনী মা যে তোদের তার বেশী আর সাধ্য নাই।’
তাঁর এই দেশাত্মবোধক গানটি স্বদেশি আন্দোলনের যুবকর্মী ও শিক্ষার্থীরা কোলকাতার রাস্তায় খালি পায়ে মিছিল করে গাইতে শুরু করলেন। মুহূর্তেই কবি রজনীকান্তের নাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লো। সারা বাংলায় তাঁর যশঃকীর্তি ঘোষিত হল। বাঙালির কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হতে লাগলো এ গান। বাংলার বিখ্যাত মনীষীরা অকুন্ঠচিত্তে রজনীকান্তের দেশাত্মবোধের মহিমা বর্ণনা করে পত্র-পত্রিকায় তাদের মন্তব্য প্রকাশ করলেন। এরই সাথে আমাদের ছোট্ট শহর রাজশাহী (তৎকালে রাজসাহী) ভারতবর্ষে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করলো। অবশ্য ওই সময় অনেক কবি-সাহিত্যিক গান রচনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর এই গানটি সমগ্র বাংলায় সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
কবি রজনীকান্ত ছিলেন প্রচ- ঈশ^রভক্ত। প্রতি ক্ষণে ক্ষণে তিনি করতেন ঈশ^^রের আরাধনা-প্রার্থনা। রাজশাহীর বাড়িতে বসেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর সেই অমর প্রার্থনা সঙ্গীত
‘তুমি, নির্ম্মল কর, মঙ্গল করে
মলিন মর্ম্ম মু’ছায়ে;
তব, পুণ্যকিরণ দিয়ে যাক্, মোর
মোহ-কালিমা ঘুচা’য়ে।
তাঁর গান-কবিতা হারিয়ে গেলেও এই প্রার্থনা সঙ্গীতটি এখনও বাংলার মন্দিরে মন্দিরে এবং খ্রীষ্টানদের চার্চে গাওয়া হয়।
কবি তাঁর রাজশাহীর ঐতিহাসিক বাড়ির দাওয়ায় বসে লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার সুখ’ নামের বিখ্যাত কবিতা
বাবুই পাখিরে ডাকি’, বলিছে চড়াই,
‘‘কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই;
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা ‘পরে,
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।’’
আজ ভাবতে অবাক লাগে, বাংলার সাহিত্য ভা-ার সমৃদ্ধ করতে যে কবি এবং বাড়িটির এতো অবদান, তা আমরা রাজশাহীবাসী ও সাহিত্যসেবিরা বেমালুম ভুলে গেলাম! আমরা এমনই অকৃতজ্ঞ-অভাগা যে, ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের স্মৃতিমাখা ঐতিহাসিক সেই বাড়িটি আমরা সংরক্ষণ করতে পারলাম না। বরং তা কেড়ে নিয়ে তাঁর সব স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেললাম। তাঁর শয়ন কক্ষ ও সাহিত্য চর্চার স্থানও বিলীন করে দেওয়া হয়েছে। এখন সেখানে স্থাপন করা হয়েছে সোনালী ব্যাংক।
বাংলা সাহিত্যের এই খ্যাতিমান কবি-গীতিকার ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দের ২৬ জুলাই পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলা) অন্তর্গত বেলকুচি উপজেলার ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানে তাঁদের পারিবারিক বিশাল দালান বাড়ি ছিল। কিন্তু কবির অকাল প্রয়াণের পর সেটিও বিলীন হয়ে গেছে। ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের নেপথ্যের নায়ক ও বাংলার খ্যাতিমান এই কবির স্মৃতিচিহ্ন বলতে আর কিছুই নেই।
কবি সিরাজগঞ্জের ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন রাজশাহীর সাহেববাজারের বাড়িতেই। এখানে থাকাকালেই তিনি কালব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দের ১০ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য সপরিবারে কোলকাতায় যান এবং ১৯১০ খ্রীষ্টাব্দের ১৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৫ বছর বয়সে বাংলার সাহিত্যসেবি ও অসংখ্য ভক্তদের কাঁদিয়ে কবি সুকান্তের মত অকালে পরপারে চলে যান। রয়ে যায় ক্ষণজন্মা এই কবির স্মৃতিমাখা সিরাজগঞ্জের দালান বাড়ি, রাজশাহীর সাহেববাজারের বাড়ি। কিন্তু আমরা তাঁর কোনো স্মৃতিচিহ্ন টিকিয়ে রাখতে পারিনি, সব মুছে ফেলেছি।
তবে আশার কথা, তাঁর সাহিত্যকর্ম বর্তমান সাহিত্যসেবিদের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মাঝে পৌঁছে দিতে এবং তাঁর স্মৃতিচিহ্ন টিকিয়ে রাখতে আমরা রাজশাহীতে কবি রজনীকান্ত সেন স্মৃতি পরিষদ গঠন করেছি। সেই পরিষদের অনুরোধে রাজশাহী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান তাঁর বিদায়ের লগ্নে কলেজ চত্বরে ‘রজনীকান্ত সেন মঞ্চ’ নির্মাণ করেছেন এবং গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন সেটি উদ্বোধন করেন। ওই সময় তাঁর সাথে ছিলেন রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান, কবি রজনীকান্ত সেন স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জুলফিকার এবং রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান প্রফেসর শিখা সরকার প্রমুখ।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক , কবি রজনীকান্ত সেন স্মৃতি পরিষদ