কবি সালিম সাবরিন : জয় হোক কবির, জয় হোক কবিতার

আপডেট: মে ৭, ২০২১, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

সিরাজুদ্দৌলাহ বাহার:


দীর্ঘ তিনটি দশক কবিতা নামক এক স্বপ্নসড়ক আর তার অলিগলি ধরে একত্রে একসাথে পাশাপাশি হেঁটে আসছি আমরা। হাঁটতে হাঁটতে কখন মাথার ওপরে পূর্বাহ্নের সূর্য মধ্যাহ্ন গড়িয়ে অপরাহ্নে নেমে এসেছে বুঝতেই পারিনি। চলতে চলতে কখন পাল্টে গেছে পরিপাশর্^-প্রতিবেশ, প্রাণ ও প্রকৃতি- বুঝতেই পারিনি। এমনই এক মোহময়ী মায়াবিনী শিল্প মাধ্যম কবিতা। সন্মোহিতের মত আমরা কজন তার পিছু পিছু, তার প্রেমে, তার মাতাল আকর্ষণে- একত্রে একসাথে পাশাপাশি হেঁটে হেঁটে এতদূর অব্দি চলে এসেছি। সেই আমাদেরই একজন কবি সালিম সাবরিন। মতিহারের তারুণ্যোজ্জ্বল তরতাজা সবুজের প্রাঙ্গণে তার সাথে হয়তো বা প্রথম সাক্ষাৎ। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। হালকা-পাতলা দীর্ঘ গড়ন, তা¤্রবর্ণ অঙ্গের বরণ। সুকণ্ঠ নামের একটি কবিতা সংগঠনের কাব্যপাঠ অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে চলতে চলতে তার সাথে টুকরো টুকরো আলাপ সালাপ। তারপর সম্পর্ক ধীরে ধীরে অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছে। মতিহার ছেড়ে সম্পর্ক আর আড্ডা এসে ঠেকেছে রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দ্র সোনাদিঘী মোড়ের প্যাভেলিয়ন চত্ত্বরে। প্রচ- লু হাওয়ার দিনশেষে সন্ধ্যা পেরিয়ে কখনো তা মধ্যরাত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আমরা কতই না নিত্য মিলিত ও মেতে উঠেছি যথারীতি সান্ধ্য আড্ডায়। কখনো হাঁটতে হাঁটতে একটু এগিয়ে পদ্মাপাড়ে বসেছি সবাই। কখনো বা তিনি যেখানে মেসে থাকতেন, সেই শহরতলীর লক্ষীপুর ঝাউতলার মোড়ে। আবার কখনো শহরতলীর আরেক মোড় শালবাগানে জমিয়েছি আড্ডা। আমাদের ভেতরে তখন প্রেম আর কবিতা ছাড়া কিছুই তেমন ছিলো না। কবিতা ও প্রেমে ঘোরাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম আমরা। প্রয়াত কবি কালাম উল্লাহ ছানা, মাহবুবুর রহমান বাদশাহ, রাব্বানী সরকার, রশিদ খোকন, আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, প্রয়াত ছড়াকার ডাবলু হাসান, প্রয়াত কবি খালিদ ইফতেখার- আহা, নক্ষত্রের মত কত সব উজ্জ্বল নাম! আরো অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে
মিলিত হতেন আমাদের সাথে। রাণীমাতা ইলামিত্রের প্রজাসন্তান সালিম সাবরিন। নাচোলে জন্ম নেয়া এই কবি (১৯৬৫) তখন তাঁর ছাত্রযৌবনকাল কাটাচ্ছেন বরেন্দ্রের তীর্থভূমি বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে। কবিতা লিখছেন দেদার, দুহাতে। আর আড্ডায়- অনুষ্ঠানে তার প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছেন উদ্দীপ্ত-উদাত্ত উচ্চারণে। ছাপাছাপির
কাজও চলছে পুরো মাত্রায়, যত্রতত্র। সেসব সেই সময়ের কথা। মধ্য আশির দশকের কবি হলে সালিম সাবরিনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দু মুখো ঈগলের কোলাজ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে। মাঝখানে পড়াশোনা, পেশা এবং ভাষাগত বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা নিয়ে ব্যস্ততা হয়তো বা তাঁকে, তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশনাকে ব্যাহত ও বিলম্বিত করেছে খানিকটা। মূলত একটি দীর্ঘ সময়পটকে ধারণ করতে পেরেছে ‘দু মুখো ঈগলের কোলাজ’। বিশেষত তাঁর মননে- দর্শনের আওতায়। যে সময়গুলোতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক আগ্রাসন ও একটি পরাশক্তির পতন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, প্রযুক্তি ও প্রচারের ক্রম ব্যাপক প্রসারণ, জাতীয় জীবনে দীর্ঘ সামরিক স্বৈরশাসন, ড্রাগস ও দুর্নিয়মের দূষণে মানুষের দিশেহারা হয়ে যাওয়ার জোগাড়।
‘বৃক্ষহীন বনভূমির প্রান্তরে
বয়ে যায় পারদের ঢেউ
রেডিয়েশন নদীও যায়
রাশ রাশ ¯্রােতে
রূপোর যন্ত্র শব্দ তোলে’
(পারদমানব, পৃষ্ঠা, উনচল্লিশ)

আর প্রেম-মিলন-বিরহ-সংকটে কবির হৃদয় তো সততই আবেগার্ত-ব্যথিত- কম্পমান:
এই শহর থেকে মিনিবাস ভবানীগঞ্জের দিকে, অলিভ সবুজ
বাড়ির দিকে ছুটে গেলে, খাঁচার নিঃসঙ্গ পাখির মতন
ছটফট করে হৃদয় আমার। তবু আমি পারি না যেতে শর্তহীন।
(ভবানীগঞ্জ, পৃষ্ঠা বত্রিশ)

বাংলা কবিতার আবহমান গীতিধর্মীতার সাথে কবির আধুনিক মনষ্কতা, দ্বান্দিক দৃষ্টি, স্বতঃস্ফুর্ত উচ্চারণ, সাম্প্রতিক বিষয় ও বৈচিত্র্যের সমাবেশ, পাঠ ও বোধের প্রাজ্ঞতায় সালিম সাবরিনের কবিতা ধীর ও নিরপেক্ষ পাঠের দাবী রাখে। পাঠক নিবিষ্ট হলেই ধীরে ধীরে চলে যেতে থাকবেন কবির দেখানো ভিন্ন পথ ধরে, ভিন্নতায়।
সালিম সাবরিনের ‘নদীমহলের জার্নাল’ প্রকাশকাল ২০০৯ সাল। এটিও তাঁর দীর্ঘ সময় নিয়ে রচিত, দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। পূর্ববর্তী কাব্যের ধারাবাহিকতা এর মধ্যেও বিদ্যমান। বিশেষত এখানে তিনি ভূমি, নদী, নিসর্গ, স্মৃতি ও বিরহ কাতরতায় সমর্পিত হোন। কালিদাসের মেঘদূতের মত আধুনিক কবিও রচনা করেন মেঘগান:
তুমি উড়ে যাও দূরে
জলজবাষ্প মেঘ
পাখিমেঘ উড়ো
উড়ে যাও দূরে

গৌরবান্বিতা মেঘ
উড়ে যেতে যেতে
একটুকুও রেখো না নীল
দৃষ্টিতে আজ।
(মেঘগান, পৃষ্ঠা ৪৩)
পূর্ববর্তী কাব্যের ‘নদী আখ্যান’ এর মত নদী ও জীবনের গতি-প্রকৃতির অভিন্নতার উপলব্ধির পুনরাবৃত্তি আমরা লক্ষ্য করি একই কবিতার পুনঃমুদ্রণেও। নদীমহলের জার্নাল, হাওয়ার নীল নদী, উজান ¯্রােতে নাও ভাসালাম, ভূত নিদিয়াড়া, কবিতাগুলো এ ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। সেই সাথে নদীর সাথে কবির নৈকট্য ও দুর্বলতার বিষয়টিও আর আমাদের মনন এড়িয়ে যেতে পারে না। প্রেম এমনই। কখনো কখনো তা একতরফা হয়েও উঠতে পারে। এ কাব্যের না নাঙ্গে সাইতে, হামলো বাফলাই আমাদে, মণীষা মাসী কবিতাগুলো আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে
যায়।
কবি প্রতিবাদীও। কখনো প্রকাশ্য, কখনো প্রতীকায়িত। মত ও পথের প্রতিবন্ধকতায় তাঁকে আশ্রয় নিতে হয় আবরণের। কেননা তিনি অস্তিত্ববাদী। পরাবাস্তব মেজাজে, স্যাটায়ারের মধ্য দিয়ে তিনি তার অন্তর্গত ক্ষোভ ও আকাঙ্খাকে চাড়িয়ে দেন পাঠকের উদ্দেশ্যে। এটি সালিম সাবরিনের সহজাত- নিজস্ব ধরণ:

সারি সারি শিক শুধু- সারি সারি শিক
শিকে ঘেরা শৃঙ্খলিত চিতাবাঘ গুটিসুটি
মাটি পৃথিবী মেপে দেখ; দেখ জগত জুড়ে
পথঘাটের গোলক ধাঁধা- ধাঁধার যাদুকর দেখ।
চিড়িয়াখানায় চিতাবাঘ, নদী মহলের জার্নাল, (পৃষ্ঠা ২৮)
কবি বন্ধুবৎসল। যৌবনের দুর্দম স্বপ্নময় দিনগুলোর সঙ্গী, হারিয়ে যাওয়া কবিবন্ধুর স্মৃতি এখনোও তাঁকে তাড়া করে ফেরে। আত্মহত্যায় মধ্য দিয়ে আমাদের ভেতর থেকে পালিয়ে যাওয়া এক কবির নাম কালাম উল্লাহ ছানা। সারাক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকতেন কবিতায়। ভালো কবিতা লিখতেন। অন্তত দু যুগ পর তাঁকে নিয়ে, তাঁর উদ্দেশ্যে লিখলেন সালিম সাবরিন ‘বন্ধুকে নিয়ে বিনীত লজ্জায়’:
যে নিজেই বিষণœতা ছেড়ে উড়তে চেয়েছিল ভোরের আকাশে
এক আকাশ রোদ্দুর হতে চেয়েছিলো সে
তুমুল বৃষ্টির পর ভোরের রোদ্দুর যেমন গাছের পাতায়
সলজ্জ হাসির মতো ফুটে ওঠে-
(যে পৃথিবী জেগে থাকে ঘুমের ভেতরে, পৃষ্ঠা ৩৩)
আবার ঈর্ষাকাতর, অহঙ্কারী বন্ধুকেও ছাড় দেন না একদম। কাব্যস্বভাবগত স্যাটায়ারে যথোচিত পাওনা মিটিয়ে দেন কড়ায় গ-ায়। (সন্ধ্যার আড্ডায়, পৃষ্ঠা ৩০)
দেখতে দেখতে দিন চলে যায়। পূর্বাহ্নের সূর্য কখন অপরাহ্নে গড়ায়। আমাদের ছেড়ে কিংবা নিয়ে আসা প্রেম-কবিতা-ব্যস্ততা-বন্ধুত্ব-আড্ডা-ঈর্ষা- আন্তরিকতা-ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপের দিনগুলোও সঙ্কুচিত হয়ে আসতে থাকে। অনুভব
করি আমরাও ‘সূর্যাস্তে সকলে একা’ কবির সাথে । ‘সূর্যাস্তে সকলে একা’ চতুর্থ কাব্যগ্রন্থে এসে সালিম সাবরিন নিজ
জন্মদিনের কথা বলছেন। বলছেন না ফেবার কথা। আত্মজৈবনিক, কবরের পাশের বৃক্ষ দেখছেন, কন্যার উদ্দেশ্যে লিখছেন। যথারীতি সেই বৈঠকী মেজাজে, সুক্ষ্ম স্যাটায়ারও করছেন যুদ্ধ আর রক্তপাতের:

রহস্যময় খেজুর তোমার মধ্যে কালো ক্রীতদাস,
আরব গেরিলার বুলেট, প্যালেস্টাইন শিশুর হৃৎপি-
রহস্যময় খেজুর তোমাদের আমি খেতেই পারছি না।
(রহস্যময় খেজুর, পৃষ্ঠা ১৪)

আমরা এখানেই জীবনকে দেখি। প্রেমে আর প্রতিবাদে বেঁচে থাকতে চাই। জীবনানন্দের ‘যে জীবন দোয়েলের ফড়িঙের- তার সাথে দেখা করতে চাই। আশা আর আন্তরিকতায় ‘সূর্যাস্তে সকালে একা’ হয়েও আমরা আবার একত্রে পাশাপাশি দাঁড়াতে চাই। সূর্যাস্তের দিকে হেঁটে যেতে চাই।
এবারে পাঠ করছি একবার মুগ্ধ হতে চাই। কাব্যগ্রšে’র শুরুতেই চোখে পড়লো কবিতা ‘নাফ নদীতীরে’। বর্তমান সময়ের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে লিখা কবিতা। রোহিঙ্গা সংকটটি এখন শুধু বাংলাদেশ এবং মায়ানমারের মধ্যস্থিত দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়। হত্যা, নির্যাতন, উচ্ছেদ, অগ্নিসংযোগ আর নজিরবিহীন নিষ্ঠুরতায় এটি সারাবিশে^র মানবিকতাকে পদদলিত করে চলেছে প্রতিনিয়ত। একজন সচেতন, সংবেদনশীল কবি হিসেবে সালিম সাবরিনও নির্বিকার থাকতে পারেননি বিষয়টি নিয়ে।
অনেক জোয়ারের ¯্রােত/ ঢেউয়ে ঢেউয়ে নৌকোডুবি/ অনেক ভরাডুবি
মানুষের লাশ-/ আমি বাড়াতে পারিনি হাত ডুবে যাওয়া শিশুটির আলুথালু
হাতের দিকে / আমি বাড়াতে পারিনি হাত ডুবন্ত রোহিঙ্গা মুসলিম বৃদ্ধটির
দিকে; (পৃষ্ঠা)
সালিম সাবরিনের কবিতায় আন্তর্জাতিকতা তথা মানবিকতার অনুষঙ্গ আজ নতুন নয়। মনে পড়ে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ দুমুখো ঈগলের কোলাজ এর কথা। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমাজতান্ত্রিক বিশে^র ভাঙচুরের ভেতর
বাইরের প্রসঙ্গ-চিত্র তিনি এঁকেছিলেন কাব্যগ্রন্থটিতে। মূলত বাংলা কবিতায় আন্তর্জাতিকতা আর সমাজতান্ত্রিকতা পাশাপাশি হাত ধরেম হেঁটেছে অনেকটা সময়। সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সমর সেন, আল মাহমুদের সোনালি কাবিন সনেটগুচ্ছ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহার ফুল কই শুধু অস্ত্রের উল্লাস কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো এখনো আমরা বিস্মৃত হইনি। এছাড়াও শামসুর রহমান, শহীদ কাদরী, দিলওয়ার, আবুল হাসান এবং আরো
অনেকের কবিতায় আমরা ভিন্নভাবে আন্তর্জাতিকতা প্রত্যক্ষ করি। সময় পাল্টে গেলেও আন্তর্জাতিকতারোধে আবারো আবর্তিত হচ্ছে বিবর্তনের নতুন ধারায়। এ গ্রন্থের অগ্নিগোলকের ভেতর থেকে কবিতাটিও আন্তর্জাতিক
চেতনাকে ধারণ করেছে। পাঠ করছি বনকুটীরে বৃষ্টির রাত, পাঠ করছি তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোয় একরাত, চিল নেই তবু চিলাহাটি কবিতায় কবির সাথে আমিও ভ্রমণে চলেছি। যাপন করছি রাত। চলেছি কবির সাথে একদিন মথুরার পথে।
নীলাকাশে ভেসে যাচ্ছি মেঘভাসানে/ আমি মথুরা পেরিয়ে আসি
বৃন্দাবনে / কালিন্দির জলে আমার প্রেমাঞ্জলি / ভাসিয়ে দেই ¯্রােতের টানে / উড়ে
আসে মথুরার নীলময়ূর ওই কালিন্দিতে (পৃষ্ঠা ২৩)
এ যেন সবটাই সেই পৌরণিক ভ্রমণ। যা আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। বৃষ্টি, বনভূমি, ছন্দময় শব্দের সিম্ফনি, মধুমতি, সোমেশ^রী নদী, নীলকমল, দোয়েল শ্যামা, তুলসী, কদম, কেয়াবনের কত কথাই না বলেছেন সাবরিন। তাঁর ভ্রমণ বিষয়ক কবিতাগুলো আমাদের পুরোটাই ছুঁয়ে যায়। হৃদয়ে এক ধরণের প্রশান্তি এনে দেয়। বাস্তবতার ভেতরে যেন ভিন্ন বাস্তবতায় মুগ্ধ হয়ে উঠি আরেকবার।
বিষয়বস্তুর নানান বৈচিত্র্য রয়েছে কাব্যগ্রন্থটিতে। কিছু এলিজি রচিত হয়েছে ভক্তি আর ভালোবাসার মানুষদের নিয়ে। হৃদয়ের গভীর থেকে স্বতঃসারিত উচ্চারণে মহাশে^তা দেবীর মৃত্যুতে উৎসর্গীত হয়েছে শোক আর শ্রদ্ধার আশ্চর্য অমোঘ পঙক্তিমালা।
বাতিঘরে নিভে গেল আলো / গাঢ় অন্ধকারে কী বিপুল ফুল / ঝরে পড়ল / কালের
যাত্রায় / সমস্ত চরাচরে / সমস্ত হৃদয়ে হৃদয়ে / বাজে তার হাহাকার ধ্বনি../ ভূমা থেকে
ভূমি থেকে ভূমি / ভারতবর্ষে ব্রাত্য দলিত মানুষের / তুমি মা, তুমিই
মাতৃভূমি- (পৃষ্ঠা ২৫)
কিংবা অগ্রজ কবিবন্ধু ওয়ালী কিরণের অকাল মৃত্যুতে শোকসন্তপ্ত হৃদয়ে লিখেছেন।
সারারাত আকাশ থেকে বৃষ্টি আর অন্ধকার নেমে আসে/খাট্টাসের হুংকার প্রহরে
প্রহরে জটলা করে তোমার সমাধি পরে/আমি জেগে আছি স্মৃতির দুয়ার খুলে
নির্ঘুম প্রহরে/ভয়ঙ্কর অন্ধকারে তুমি ঘুমিয়ে আছো দুশো কোটি
আলোকবর্ষ দূরে..। (কবি ওয়ালী কিরণ স্মরলে, পৃষ্ঠা ২৭)
সাম্প্রতিক ধারার কবিতায় মানব-মানবীর হৃদয়ঘটিত বিষয় আশয় অর্থাৎ প্রেম অনুষঙ্গটির অনুপস্থিতি বেশ লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে। রোমান্টিকতা, আধুনিকতা হালে উত্তরাধুনিকতা- প্রতিটি বাদের পৃথকীকরণে মানবমনের আদিম প্রবৃত্তিজাত এবং বিদ্যমান চিরায়ত এ প্রবণতাটিকে কী অস্বীকারম কিংবা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব! সালিম সাবরিন প্রেম অনুষঙ্গটিকে এড়িয়ে যাননি। বরং তাঁর কবিতার অনেকটা স্থান জুড়ে প্রেমের প্রবল উপস্থিতি
প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
অবশেষে তুমি এলে এই মধুকূপী ঘাসের দেশে/বাতাসে নদীর গন্ধে ঘনত্ব বেড়ে
যায় নিঃশ^াসে/মাটির গভীর থেকে সবুজের গতিসূত্রে বিস্ময়ে/আবিষ্কার
করি মেঘের শরীর যেন এই পৃথিবী/এক দারুচিনি দ্বীপ দিগন্তে ছড়িয়ে আছে
নিজস্ব নির্জনতায়। (অনন্য অপরাজিতা, পৃষ্ঠা ২৮)
কবিতাটি সুন্দর। কিন্তু স্বরটি যেন বড়ই চেনা চেনা। কবিতায় জীবনানন্দ দাশের আধিপত্য কি এড়াতে পারবেন না সাবরিন। এ গ্রন্থে আরও কিছু কবিতার ভেতর এভাবে উঁকিঝুঁকি মারেন রূপসী বাংলার এই কবি। বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা ও সতর্কতা আমাদের সকলের ক্ষেত্রেই সমান প্রযোজ্য। প্রেমের পাশাপাশি কিছু স্যাটায়ারধর্মী কবিতাও রয়েছে কাব্যগ্রন্থটিতে। এ ধারার একটি অন্যতম কবিতা চল্লিশোর্ধ কিশোরীদের প্রতি।
চল্লিশের ওপর এখন যাদের বয়স/ সেইসব নিষ্ঠুর কিশোরীদের আমরা
ভালবাসতাম / তাদের রূপ চুরি করে / এখন তাদের কন্যারা দারুণ প্রতিশোধ নিয়েছে।

হালকা মেজাজে, বৈঠকী ঢঙে লিখা। কিন্তু গভীর ও সার্বজনীন। এ কবিতা যে কোন ভাষায় লিখা হলেও আবেদন সর্বত্র সমানের দাবীদার। তারপরও কবিতাটি পড়তে গিয়ে আরেকটি কবিতার কথা মনে হয়, জীবনানন্দের ইহাদেরি কানে। তবে দুটোই আলাদা, ভিন্ন মাত্রা।
বিচিত্র বিষয় আশয়, আপাত সরলভঙ্গিতে লিখা কবিতাগুলো পাঠান্তে এক ধরণের আবেশ এবং প্রশান্তিবোধ অনুভব করলাম। মুগ্ধ হলাম। কবিতা নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, যত তত্ত্ব, যত বাদ, বিতর্কই করা হোক না কেন- চুড়ান্ত বিচারে কবিতার বিকল্প কবিতাই। কবিতা তাইই- যা কম্যুনিকেট করে, হৃদয়ে সঞ্চারিত হয় এবং মস্তিষ্ক ধারণ করে। কম্যুনিকেশনের পৃথিবীতে বাস করে- এসবের একটিকেও অস্বীকার করা নিশ্চয় আধুনিক মানুষের পক্ষে যথাচিত নয় এবং অস্বীকার করা যাবে না সালিম সাবরিনের কাব্যগ্রন্থ একবার মুগ্ধ হতে চাই আধুনিক মানুষের মানস পরিচয়কেই বহন করে। তাঁর কবিতা আমাদের কম্যুনিকেট করে, হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়, আমাদের ভাবায়। জয় হোক কবির, জয় হোক কবিতার।