কমিটি বাতিলের দাবি বিএনপিপন্থী জনপ্রতিনিধিদের || বেড়েই চলছে অসন্তোষ

আপডেট: জানুয়ারি ১, ২০১৭, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



সদ্য গঠিত রাজশাহী নগর ও জেলা বিএনপির কমিটি নিয়ে নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ। নতুন এই কমিটি বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে নগর ও জেলা বিএনপির একাংশের নেতাকর্মী। তারা এই কমিটিতে স্থান পাওয়া নেতাদের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় কর্মবিহীন অযোগ্য ব্যক্তি বলে পরিগণিত করছেন।
ইতোমধ্যে এই কমিটি বাতিলের দাবিতে দলীয় কার্যালয়ে তালা দিয়েছে নগর বিএনপির একাংশ। হামলা হয়েছে গণকপাড়ায় অবস্থিত রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন শওকতের চেম্বারে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল শনিবার লিখিতভাবে বিএনপির চেয়ারপারসন বরাবর রাজশাহী সিটি করপোরেশনরের বিএনপিপন্থী ১৪ জন কাউন্সিলর ও তিন জন নারী কাউন্সিলর নগর কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। জেলা কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার বিএনপিপন্থি চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়ররা।
গত ২৭ ডিসেম্বর সাত বছর পর কেন্দ্র থেকে প্রভাবশালী দুই নেতাকে বাদ দিয়ে রাজশাহী নগর ও জেলা বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। নগর বিএনপির সভাপতি পদ থেকে কেন্দ্রীয় বিএনপির উপদেষ্টা ও সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনুকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের বরখাস্ত হওয়া মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। জেলায় সাবেক সাংসদ ও জেলা সভাপতি নাদিম মোস্তফাকে বাদ দিয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপুকে। নগর কমিটিতে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, কেন্দ্রীয় বিএনপির ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক সহ-সম্পাদক শফিকুল হক মিলনকে। তিনি আগের কমিটিতেও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। জেলায় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সাবেক কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মতিউর রহমান মন্টুকে।
এই কমিটি গঠনের পর থেকে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে নগর ও জেলা বিএনপির দুই গ্রুপ। নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিনু ও নাদিম দীর্ঘদিন ধরে নগর ও জেলা বিএনপির দায়িত্বে ছিলেন। তারা এলাকায় প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিতি। কিন্তু এবছর তাদের কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তাদের পরিবর্তে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে নতুনদের।
নগর ও জেলা বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নিকট মিথ্যা, বিভ্রান্তি ও ষড়যন্ত্রমূলক তথ্য উপস্থাপন করে তৃণমূল ও স্থানীয় নেতাদের মতামতকে উপেক্ষা করে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে আন্দোলনবিমুখ, স্থানীয় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়, গণবিচ্ছিন্ন ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের স্থান দেয়া হয়েছে। এই কমিটি গঠনের মাধ্যমে রাজশাহীর বিএনপিকে ধ্বংস করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে। যতদিন না এই কমিটি বাতিল হবে ততদিন আন্দোলন চলতে থাকবে। রাজশাহীর বিএনপিকে বাঁচানোর লক্ষ্যেই এই আন্দোলন চলছে।
তবে নবগঠিত কমিটির নেতারা বলছেন, কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড থেকেই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি গঠনের আগেও বহু নেতারা কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডকে এই কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিন একক আধিপত্য বিস্তার করে কমিটিতে ছিল মিনু-নাদিম। তাদের সময়ে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের কোনো মূল্যায়ন করা হতো না। পছন্দের লোকদের নিয়ে তারা তাদের কার্যক্রম চালাতো। তারাই পদ ফিরে পাবার জন্য তাদের পছন্দের লোকদের দিয়ে এইসব করানো হচ্ছে।  কিন্তু কোনো লাভ হবে না। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভালোভাবে জেনেবুঝেই এই কমিটি গঠন করে দিয়েছেন।
কমিটি বাতিলের দাবিতে লিখিতভাবে আবেদন জানিয়েছেন, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাহবুব সাইদ টুকু, ৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সোহরাব হোসেন শেখ, ১১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবু বাক্কার কিনু, ১২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন দিলদার, ১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রবিউল আলম মিলু, ১৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. টুটুল, ১৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুস সোবহান লিটন, ১৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর বেলাল আহম্মেদ, ১৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মুনজুর হোসেন, ১৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মনির হোসেন, ১৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুরুজ্জামান টিটো, ২৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর মোহাম্মদ মোল্লা, ২৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনোয়ারুল আমিন আযব, ২৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহজাহান আলী, সংরক্ষিত ওয়ার্ড-২ এর কাউন্সিলর নাসিরা খানম, ৩ এর কাউন্সিলর মুসলিমা বেগম বেলী ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড-৫ এর কাউন্সিলর সামসুন নাহার।
জেলা বিএনপির কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন, জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ মহসীন, রাজশাহী পবার নওহাটা পৌরসভার মেয়র মকবুল হোসেন, চারঘাট পৌরসভার মেয়র জাকিরুল ইসলাম, পুঠিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, তানোর পৌরসভার মেয়র মিজানুর রহমান মিজান, পুঠিয়া পৌরসভার আশাদুল হক, মোহনপুর উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ, তানোর উপজেলার চেয়ারম্যান এমরান আলী মোল্লা, চারঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ, বাগমারা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ডিএম জিয়া প্রমুখ।
বোয়ালিয়া থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর রবিউল আলম মিলু বলেন, মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল যুবদলের সভাপতি হিসেবে ঠিক আছেন। কিন্তু নগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে না। নগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে মিজানুর রহমান মিনুকেই রাখা উচিত। কারণ বুলবুল মামলা খেয়ে আওয়ামী লীগের নেতার বাড়িতেই তিন মাস আশ্রয় নিয়েছিল।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মন্টু বলেন, দীর্ঘদিন আধিপত্য থাকলে তা ছাড়তে কষ্টই হয়। কয়েকদিন এইরকম চলবে। পরে আপনাআপনি ঠিক হয়ে যাবে। কারণ দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা অমান্য করা মানে দলকে অস্বীকার করা।
নগর বিএনপির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে ফোন দেয়া হলে তিনি প্রশ্ন করেন, তারা কী স্বার্থের জন্য বিএনপি করেন। নাকি আওয়ামী লীগের চর হিসেবে কাজ করছেন। তারা যা করছেন, এর মধ্য দিয়ে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বিএনপির চেয়ারপারসনের সুনাম নষ্ট করছেন। তারা প্রভাবিত হয়ে এই ধরনের কর্মসূচি পালন করছেন।