করতোয়ায় ৬৯ জনের প্রাণহানি: ঘাট ইজারাদারকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন

আপডেট: অক্টোবর ৪, ২০২২, ৮:১৬ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক :


পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার করতোয়া নদীতে নৌকা ডুবির ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে; যেখানে আউলিয়ার ঘাটের ইজারাদারের অবহেলাকে দায়ী করা হয়েছে।

শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে মহালয়া উৎসবে অংশ নিতে যাওয়া পুণ্যার্থীদের নৌকা ডুবিতে ৬৯ জনের লাশ উদ্ধারের পর এখনও তিনজন নিখোঁজ রয়েছে। এর মধ্যেই রোববার রাতে দেওয়া এই প্রতিবেদনে ‘মাঝির অদক্ষতা ও অবহেলা এবং যাত্রীদের অসচেতনতাকেও দায়ী’ করা হয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক সদস্য জানিয়েছেন।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদনে ভয়াবহ নৌ দুঘটনার জন্য খেয়াঘাটের ইজারাদারকে দায়ী করা হয়েছে।”

তদন্ত প্রতিবেদন পেয়ে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক আরও বলেন, একই সঙ্গে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স তদন্ত করে তাদের প্রতিবেদনও নিজ নিজ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবে।

“সব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যে নির্দেশনা দেবে সে অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে ভয়াবহ এই নৌ-দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিস্তারিত কিছু জানাতে চাননি জেলা প্রশাসক।

২৫ সেপ্টেম্বর মহালয়া উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নৌকায় করে বোদা উপজেলার বরদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন উৎসবে যোগ দিতে। দুপুরে মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাট এলাকায় একটি নৌকা উল্টে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ডুবে যাওয়া নৌকাটিতে দেড় শতাধিক যাত্রী ছিল। কিছু মানুষ সাঁতরে তীরে ফিরতে পারলেও অনেকে নিখোঁজ থাকেন। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা নৌকা নিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করেন। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নামেন তল্লাশিতে। পরে কয়েকদিন ধরে লাশ উদ্ধার হতে থাকে।

এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দীপঙ্কর কুমার রায়কে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা নৌকা ডুবি থেকে ফিরে আসা যাত্রী, ঘাটের মাঝি, প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতদের পরিবারের সদস্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শুনেন। ঘটনার এক সপ্তাহের মাথায় কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকেও আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান দীপঙ্কর কুমার রায় প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, “অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেছে তাই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।”

অনুসন্ধানে কী পাওয়া গেছে- জানতে চাইলেও এর বেশি কিছু বলতে চাননি দীপঙ্কর।
পুলিশ বিভাগের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) সফিকুল ইসলাম এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তদন্ত কমিটির প্রধান পঞ্চগড় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক শেখ মো. মাহাবুবুল ইসলাম মঙ্গলবার দুপুরে জানান, তারা তাদের তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এরই মধ্যে জমা দিয়েছেন।

তবে দুই কর্মকর্তাই প্রতিবেদনের বিষয়ে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

দুর্ঘটনার পর কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছিলেন, নৌকাটি যখন ঘাট থেকে ছেড়ে যায় তখনও সেখানে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের লোকজন উপস্থিত ছিল। কিন্তু নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী উঠলেও তারা তাতে কোনো বাধা দেননি।

এ বিষয়টিও তদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “ঘটনার দিন ঘাটে লোক সমাগম বেশি হবে জেনেও ইজারাদার নিজে উপস্থিত ছিলেন না বা শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করেননি। এতে লোকজন ইচ্ছামতো নৌকায় উঠেন। ফলে তাদের নিবৃত করার কেউ ছিল না “

“দায়িত্বে অবহেলার কারণে প্রাণহানির দায় ইজারাদার কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। এমনকি তিনি যাত্রীদের ত্রুটিপূর্ণ নৌকা দিয়ে পারাপার করছিলেন। ঘাটে অধিক যাত্রী থাকলেও তাদের পারাপারের জন্য একাধিক নৌকার ব্যবস্থাও তিনি রাখেননি।”

ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটে তার জন্য প্রতিবেদনে পাঁচটি সুপারিশও করা হয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন জানিয়েছেন।

সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো, নিরাপত্তা ঝুঁকি বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টি, ইজারা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তদারকি বাড়ানো এবং খেয়া ঘাটগুলোকে আরও উন্নত ব্যবস্থা নেওয়া।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ