করতোয়া ঘাটে স্থাপিত হলো সম্প্রীতির অনন্য নজির

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২২, ৫:২২ অপরাহ্ণ


সোনার দেশ ডেস্ক :


প্রশাসন ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী থেকে অনেকের লাশ তুলে আনেন স্থানীয় লোকজন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। শুভ মহালয়ার ক্ষণ গণনা দিয়ে শুরু হওয়া এই উৎসব শেষ হয় দশমীর দিনে ঠাকুর বিসর্জনের মধ্য দিয়ে।

কিন্তু এ বছর ময়ালয়ার ধর্মসভায় যোগ দিতে যাওয়া হিন্দু স¤প্রদায়ের লোকদের নিয়ে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। আর এসব মানুষদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন মুসলিম স¤প্রদায়ের মানুষজন। ঘটনার মুহূর্তে নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে অনেককেই জীবিত উদ্ধার করেন তারা।

এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর নদীতে ডুব দিয়ে উদ্ধার করেন ২৫টি মরদেহ। আর এর মাধ্যমে করতোয়া পাড়ে স্থাপিত হলো হিন্দু-মুসলিম স¤প্রদায় সম্প্রীতির এক অনন্য নজির।

ঐতিহাসিক বদেশ্বরী মন্দিরে প্রতিবছর মহালয়ার দিনে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পূজা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আসেন। আত্মীয় স্বজনের মঙ্গল কামনায় তারা করোতোয়া ও ঘোড়ামাড়া নদীর মিলন স্থানে স্নান করেন।

গত রোববারও মহালয়ার দিনে ওই মন্দিরে হাজারো পূণ্যার্থী উপস্থিত হন। তাদের অধিকাংশই আউলিয়া ঘাট দিয়ে নৌকা যোগে মন্দিরে যান।

মন্দির ও ঘাট সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্যালো চালিত একটি নৌকা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে মন্দিরের দিকে রওনা হয়। মাঝ নদীতে পৌঁছাতেই নৌকাটি দুলতে শুরু করে। পরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে নৌকাটি কাঁত হয়ে ডুবে যায়।

এসময় নৌকাটির যাত্রীদের বাঁচাতে পাড়ে দাঁড়ানো মানুষরা নদীতে ঝাপিয়ে পড়তে শুরু করেন। তাদের একান্ত প্রচেষ্টায় সে সময় নদী থেকে অনেককেই জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

উদ্ধার কর্মীরা জানান, প্রথম দিন ২০ থেকে ২৫ জন নদীতে নেমে যান। এসময় চা শ্রমিকরাও নদীতে নেমে উদ্ধার কাজে যোগ দেয়। নদীতে মাছ ধরা জেলেরাও ছিলো। পরদিন স্থানীয় শতাধিক মানুষ নেমে যায় নদীতে মরদেহ উদ্ধার করতে।

তৃতীয় দিনেও স্থানীয়রা নদীতে নেমে মরদেহ খুঁজতে থাকেন। তারা ডুবুরি দল এবং ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করেন।
কমলাপুকুরী এলাকার ইকবাল জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন সজিব রায় এবং তার স্ত্রীকে। ওই দিনই সজিবের ছেলেরও মরদেহ উদ্ধার করে উদ্ধারকর্মীরা।

সজিব রায় বলেন, ‘স্থানীয়রা না হলে বেঁচে ফিরতে পারতাম না। আমার ছেলেটাকে কেউ বাঁচাতে পারলো না।’
সর্দারপাড়া এলাকার জেলে বাবুল হোসেন বলেন, ‘মাছ ধরছিলাম। এসময় নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যাওয়া মানুষদের উদ্ধারে নেমে যাই। দুইজন জীবিত এবং চার জনের লাশ উদ্ধার করেছি।’

সমাজকর্মী সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘দ্বিতীয় দিন আমরা দল বেঁধে নদীতে নামি। নদীর গভীরে ডুবে মরদেহ উদ্ধার করি। অনেক মরদেহের হাত কাটা গেছে। অনেকের পা নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকের শরীরে পঁচন ধরেছে। অনেকের শরীর ফুলে গেছে। অনেক মৃতদেহ থেকে বিকট গন্ধ বের হচ্ছিল।

অনেককেই চেনা যাচ্ছিল না। কিন্তু আমরা এসব তোয়াক্কা না করে উদ্ধার কাজে নিয়োজিত থাকি। কখনো কাউকে হিন্দু মুসলিম মনে হয়নি। স্থানীয় তরুণ উদ্ধারকর্মীরা গভীর রাত পর্যন্ত নদীর পানিতে ডুবে মরদেহ উদ্ধার করতে থাকে।’

নদী থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বলেন, যখন নৌকা ডুবে গেলো আমরা তখন দিশা হারিয়ে ফেলি। মুসলিম ভাইয়েরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের উদ্ধার কাজে নেমে পড়েন।
আরাজি শিকারপুর এলাকার জমিদার বর্মণ বলেন, ‘মুসলিম ভাইয়েরা নিজের ভাইয়ের মতো আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমরা তাদের উপর সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো।’

দেবীগঞ্জ উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিতু আক্তার বলেন, ‘এটা একটা অন্যরকম দৃষ্টান্ত। এখানকার মানুষ সা¤প্রদায়িক স¤িপ্রতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’

রোববার (২৫ সেপ্টেম্বর) পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাট এলাকার করতোয়া নদীতে শতাধিক যাত্রীসহ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। সে সময় অনেকে তীরে উঠতে পারলেও বিশেষ করে নারী ও শিশুরা পানিতে ডুবে যায়।

পরে উদ্ধার অভিযান শুরু করে স্থানীয়রাসহ প্রশাসন। এখন পর্যন্ত ৬৯ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এরমধ্যে ৬৮ জনই সনাতন ধর্মের। কেবলমাত্র মাঝি হাশেম আলীই ছিলেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এছাড়া আরো তিনজন সনাতনী এখনো নিঁখোজ রয়েছেন।
তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি