করোনাকালীন শিক্ষা ব্যবস্থা : ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা

আপডেট: নভেম্বর ১৩, ২০২১, ১:০২ পূর্বাহ্ণ

প্রিন্সিপাল মজিবুর রহমান:


২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান প্রদেশে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। ২০২০ সালের নববর্ষ উদযাপনে চীনের উহানের সঙ্গে ইটালির মিলানের বিমান যোগাযোগ চালু থাকায় সহজেই করোনা ভাইরাসের বিশ্বায়ন শুরু হয়। প্রথমে ইটালি এটি আমলে নেয়নি কিন্তু ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ‘বরিস জনসন’ আক্রান্ত হলে তাদের টনক নড়ে। এই প্রাণঘাতি ব্যাধিটি ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথম বাংলাদেশে সূচনা হয়। চারিদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে ১৭ মার্চ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই সঙ্গে ২৭ মার্চ থেকে সকল অফিস আদালতও বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর ১৪/১০/২০২১ তারিখ থেকে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এই দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ইউনিভারসিটির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ এজন্য যে, প্রথমত শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গন্ডিচ্যুত হয়ে নিজের ঘরে এক ধরনের বন্দি জীবন যাপন করে। এতে তারা অবসাদগ্রস্ত ও মানসিক বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ঘরে বসে তারা স্মার্ট ফোন, টিভি দেখা, লুডু খেলা প্রভৃতিতে আসক্ত হবার ফলে তাদের জীবন যাপন পদ্ধতির আমল পরিবর্তন আসে।

কোভিড-১৯ এর কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক, সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব, খেলাধুলা, আড্ডা, সংস্কৃতিচর্চা, বিনোদন প্রভৃতিতে বঞ্চিত থেকে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়। এগুলো থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত রাখার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘সংসদ টিভির’, ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় টিভিতে প্রাথমিকের ক্লাস চালু এবং অনলাইন ক্লাস চালু করলেও প্রান্তিক জনপদসহ অনেক ক্ষেত্রেই তার সুফল লক্ষ্য করা যায়নি। এমনকি ‘অ্যাডেক্সেল’ ও ‘ক্যামব্রিজের’ অধীনেও গত বছর ‘ও’ এবং ‘এ’ লেবেলের পরীক্ষা হতে দেখা যায়নি। ‘ইউনেস্কো’ ২৫ এপ্রিল ২০২০-এ জানিয়ে দেয়, কোভিড-১৯ এর কারণে হাম, ডিপথেরিয়া, পোলিও সহ বিভিন্ন টিকা গ্রহণ না করায় বিশ্বের ১৩০ কোটি শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

দীর্ঘদিন লকডাউনের কারণে বাড়িতে বন্দি থাকায় কিছু শিশু স্থুলকায় এবং গরিব শিশুরা চরম অপুষ্টিতে ভুগছে। ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ এর মতে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে অনুন্নত বিশ্বে মেয়ে শিক্ষার্থীরা বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশ, বাংলাদেশে এর পরিমাণ ৭৫০০ জনের মতো। তাছাড়া গরিব পরিবারের অনেক শিশু কর্মে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে। ফলে দুটো কারণের শিশুরাই আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসবে না। ইউনেস্কোর মতে, করোনার কারণে বিশ্বের ১৪০ কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন বন্ধ হয়ে গেছে।

শিক্ষার্থীদের এসকল ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের কিছু সুদুরপ্রসারী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখি করতে শিক্ষার্থী, তার পরিবার এবং শিক্ষকদের কিছু ‘প্রণোদনা’ দেয়া, ‘কাউন্সেলিং’ করা এবং সমাজসেবীদের নিয়ে ‘ট্রাস্টি বডি’ গঠন করা যেতে পারে। দীর্ঘদিন ফেস টু ফেস ক্লাসের বাইরে থাকা সহ জীবন যাপন পদ্ধতির পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীদের যে অবসাদজনিত শিখন ঘাটতি (লার্নিং গ্যাপ) তৈরি হয়েছে তা পুষিয়ে নিতে শিখন দক্ষতা অর্জনের নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা যেতে পারে। বিদ্যালয়ের ‘ফেস টু ফেস’ ক্লাসের পাশাপাশি ক্লাসের অডিও-ভিডিও ভার্সন তৈরি করে প্রচার করা যেতে পারে। ইতোমধ্যে আমাদের শিক্ষার্থীদের অবসাদগ্রস্ততা ও দুশ্চিন্তামুক্ত করতে ‘ফ্রি-টেলিমেন্টরিং’ সেবা চালু করা প্রয়োজন। ফলে তাদের স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসা সহজ হবে।

আমেরিকাসহ কিছু দেশ তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে এবং তা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আমাদের দেশে দ্রুতগতির ইন্টারনেট চালু করে তা করা যেতে পারে। এরূপ ভার্চুয়াল ক্লাসে শিক্ষার্থীরা বিশেষ সুবিধা ভোগ করবে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সকলের জন্য টিকা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি শিক্ষকদের ভূমিকায় বিশেষ প্রাধান্য থাকতে হবে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের মতে দেশের ৭০ ভাগ টিকা নিশ্চিত করতে পারলে মানুষের মধ্যে ‘হাই ইমিউনিটি’ গড়ে উঠবে এবং শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে যাবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রুটিনে ফেরানো এবং তার উন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং শিক্ষা পেশাকে আকর্ষণীয় করণসহ সামাজিক আন্দলনে পরিণত করতে পারলে শিক্ষার উন্নয়ন এবং তার বিশ্বায়ন করা যেতে পারে।