করোনাভাইরাস মহামারীর ‘দ্বিতীয় পর্যায়’: এশিয়া থেকে শিক্ষা

আপডেট: জুন ৮, ২০২০, ১:২০ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক:


মহামারীর বিস্তার, লকডাউন ঘোষণা এবং অবস্থার উন্নতি হলে তা উঠিয়ে নেওয়া – করোনাভাইরাস নিয়ে এই অভিজ্ঞতাগুলো এশিয়াতেই প্রথম পাওয়া গেছে। এশিয়াতেই আবার নতুন করে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় পর্যায় দেখা যাচ্ছে – সিউলের নাইট ক্লাবগুলোতে, রাশিয়া-চীন সীমান্তসহ আরও কিছু জায়গায়। এখনও অবশ্য এ থেকে কোনো উপসংহারে পৌঁছানো যায় না, তবে কিছু শিক্ষা নেওয়া যায় কি?
আবার আসবে ফিরে
‘সেকেন্ড ওয়েভ’ বা করোনাভাইরাস মহামারীর দ্বিতীয় পর্যায়, ‘স্পাইক’ বা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এবং ‘ক্লাস্টার’ অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় অনেক বেশি সংক্রমণ – কথাগুলো এখন ঘুরেফিরে আসছে।
চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ বলতে মহামারী একবার কমে যাওয়ার পর আবার নতুন করে ছড়ানোটাকে বোঝায়। অতীতে মহামারীগুলোর ক্ষেত্রে এমনটা দেখা গিয়েছিল।
এশিয়াতে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন এলাকায় যেমন আবার করোনাভাইরাস ফিরে এসেছে। আবার কোথাও পুরো অঞ্চলে হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঘটনাও আছে। তবে সেগুলো দ্বিতীয় পর্যায়ের মহামারী কিনা সেটা অনুমান করা কঠিন।
তবে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের জীববিজ্ঞানী জেনিফার রনের কাছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় পর্যায় আসবে কিনা সেটা নিয়ে আর সংশয় নেই। তার কাছে কখন আসবে আর তা কেমন ধ্বংসাত্মক হবে সেটাই দেখার বিষয়।
এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পরীক্ষা, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং এবং লকডাউন ব্যবস্থাপনায় সফল দেশগুলোতেও হঠাৎ করে প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট এলাকায় অনেক বেশি সংক্রমণের ঘটনা দেখা গেছে।
সুতরাং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন বলছে, ভাইরাসটি হয়তো টিকে থাকার জন্যই এসেছে, তখন দেশগুলোকেও বুঝতে হবে, তাদের নতুন সংক্রমণের মুখোমুখি হতে হবে। এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে তা আগেই অনুমান, চিহ্নিত ও মোকাবিলা করা যায়।
ফিরে আসতে পারে বিধিনিষেধ
“খুব আশাবাদী হবেন না”, সতর্ক করে দিয়েছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের স্বাস্থ্যনীতি বিভাগের স্বাস্থ্য অর্থনীতির চেয়ার অধ্যাপক অ্যালিস্টার ম্যাকগুইয়ার।
“একটি সফল লকডাউনের অর্থ এই নয় যে কোনও অঞ্চল করোনাভাইরাস মুক্ত থাকবে।”
জাপানের হোক্কাইডো অঞ্চলে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে কঠোর লকডাউন ছিল। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা দিনে এক-দুটিতে কমে এসেছিল। ব্যবস্থাগুলো এত ভাল কাজ করেছিল যে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়েছিল এবং এপ্রিলের মধ্যে স্কুলগুলো আবার চালু হয়েছিল। তবে এক মাস পার হওয়ার আগেই আবার জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছিল। কারণ দ্বীপটিতে হঠাৎ সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাপ দেখা দেয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ের এই লকডাউন এখন আবার উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানে, এটি আবারও হতে পারে- ক্ষণ পর্যন্ত না কোনও টিকা আসবে।
চিনেও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমে যাওয়ার সাথে সাথে বিধিনিষেধ উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে উহানসহ কয়েকটি অঞ্চলে ভাইরাসের নতুন ‘ক্লাস্টার’ দেখা দেয়।
চিনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জিলিন প্রদেশের শুলানে কয়েক ডজন নতুন আক্রান্তের ঘটনায় সেখানে আবার কঠোর লকডাউন ফিরে আসে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় সিউলের বাইরের একটি লজিস্টিক সেন্টারে সর্বশেষ ক্লাস্টারের কারণে ২০০টি স্কুল মাত্র কয়েক দিন খোলা রাখার পর আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
চিনের জিলিন এবং হেইলংজিয়াং প্রদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার জন্য প্রতিবেশী রাশিয়া আসা চিনাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
এক পরীক্ষায় রাশিয়া থেকে আসা আটজন চিনা নাগরিকের মধ্যে করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ওই সময়ে রাশিয়া ভ্রমণ করা ৩০০ জন চিনাকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়।
চিনে অনেক সময়ই দেখা যাচ্ছিল, বিদেশ থেকে আসা সংক্রমণের সংখ্যা স্থানীয় সংক্রমণকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি মোকাবিলায় কঠোর কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা ফিরে এসেছে। যেমন বেইজিংগামী সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পাশের বিভিন্ন শহরে পাঠিয়ে যেখানে যাত্রীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কোয়ারেন্টাইন করা হচ্ছে।
বিদেশ থেকে ফেরাদের গতিবিধি দেখতে ও তাদের কোয়ারেন্টাইন মেনে চলাটা নিশ্চিত করতে হংকং ইলেক্ট্রনিক ব্রেসলেট ব্যবহারের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের পদক্ষেপগুলি গুরুত্বপূর্ণ।
পরীক্ষা এবং কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং থামানো যাবে না
ফেব্রুয়ারির গোঁড়ার দিকেই দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিদিন ১০ হাজার পরীক্ষা বিনামূল্যে চালানোর ব্যবস্থা করেছিল। একই সঙ্গে অ্যাপস এবং জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে আক্রান্তদের খুঁজে করার চেষ্টা চলছিল। ফলে নতুন প্রাদুর্ভাব দ্রুত নির্মূল করার কাঠামো তারা গড়ে তুলতে পেরেছিল।
এতে স্থানীয়ভাবে একটা সতর্কতা ব্যবস্থা চালু হয়ে যায়। তাই সাধারণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় যদি নতুন কোথাও প্রার্দুভাব দেখা দেয় তবে নির্দিষ্ট সেই এলাকা লকডাউন করা সম্ভব হবে।
এ ব্যবস্থা কাজেও দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ নতুন কোনো অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ না পাওয়ার পর ১২ মে নতুন একটি ক্লাস্টারের খোঁজ পাওয়া যায়। দ্রুত বের করা যায় যে সিউলের জনপ্রিয় নাইটক্লাব এলাকার কিছু জায়গার সঙ্গে একটি সম্পর্কিত। কর্তৃপক্ষ এখন এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ৯০ হাজার মানুষকে চিহ্নিত করেছে।
ক্লাবগুলোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত প্রায় ৩০০ আক্রান্তকে পাওয়া গেছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের কাঠামো থাকাতেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেছে।
“আমরা জানি যে এটি খুবই সংক্রামক ব্যাধি”, ম্যাকগুইয়ার বলেন। “আপনার কেবল দেখতে হবে, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে, যেখানে কার্যকর নীতিমালা আছে, সেখানে কী হয়েছিল। এগুলো শিথিল হতেই ভাইরাস আবার ফিরে এল। এক সপ্তাহান্তে একজন ব্যক্তিই ১০০ জনেরও বেশি মানুষকে সংক্রমিত করেছিল।”
কোরিয়ান সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (কেসিডিসি) নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার অনেক ঘটনাগুলোর উৎস বের করতে পেরেছে। আর রাশিয়ার সীমান্তবর্তী চীনা শহর শুলানে কর্তৃপক্ষ বের করেছে লন্ড্রির এক কর্মী ১৩ জনকে শুরুতে সংক্রমিত করেছিলেন। তবে ওই কর্মী কিভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন তা কর্মকর্তারা এখনও বের করতে পারেননি।
একবার নয়, দুইবার পরীক্ষা করতে হবে
অধ্যাপক ম্যাকগুইয়ার বলেন, “ভাইরাসটিতে কে আক্রান্ত হয়েছে – আমাদের কেবল সেটা জানলেই হবে না। … অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে জানতে হবে, আগে কে আক্রান্ত হয়েছিল।”
সিঙ্গাপুরের ডিউক-এনইউএস মেডিকেল স্কুলের সহকারী অধ্যাপক অ্যাশলি জন যোগ করেন, “এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আগে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে খুব সম্ভবত ভাইরাসের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এবং অন্তত স্বল্পমেয়াদে হলেও তাদের আবার ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”
সিঙ্গাপুরের প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে দুজনের রক্তের পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল তারা আগে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন কিন্তু কোনো উপসর্গ ছিল না। তখন ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে বিষয়টি সহায়তা করেছিল।
“ভাইরাসে আক্রান্ত হলে যেহেতু কোনো উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে অথবা খুবই হালকা উপসর্গ হতে পারে, তাই কোনও ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন কিনা জানার আগেই বা অসুস্থ হয়ে পড়ার আগেই এটি ছড়িয়ে দিতে পারেন। অন্যকোথাও দেশজুড়ে ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠা নিয়ে পরীক্ষা হয়েছে কিনা আমি জানি না; তবে সিঙ্গাপুরে এটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ক্লাস্টারগুলো খুঁজে বের করতে ও সন্দেহজনক কেস শনাক্ত করতে।
সিঙ্গাপুরে অবশ্য পুরো দেশজুড়ে এই পরীক্ষা করা হয়নি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে যেমন প্রাক-স্কুলের শিক্ষকদের এ পরীক্ষা করা হয়েছে।
তাদের যুক্তিটি হল, আগে আক্রান্ত হয়েছিলেন কিন্তু এখন ছড়াবেন না এমন কাউকে পাওয়া গেলে তাকে কাজে ফেরানো যাবে।
খাপ খাইয়ে নেয়ার মতো জনস্বাস্থ্য পরিষেবা
বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক জুদিত ভাল খেয়াল রাখছেন স্বাস্থ্য খাত কীভাবে করোনাভাইরাসের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। তার মতে, জনস্বাস্থ্য পরিষেবা কী শিখতে পারে তা দেখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
“এই মহামারীতে স্বাস্থ্যসেবা খাত প্রমাণ করেছে যে এটি নিজেকে পুনর্গঠন করতে এবং দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে,”
চিন কেবল আট দিনের মধ্যে উহানে এক হাজার শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল তৈরি করেছিল এবং দেখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে জরুরি অবস্থায় হাসপাতাল পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনা করতে হয়।
অধ্যাপক ভাল বলেন, “বিশ্বজুড়ে হাসপাতাল এবং প্রাথমিক পরিচর্যা কেন্দ্রগুলি একে অন্যের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছে। তারা নিজেদের কাছ থেকেও শিখেছে। পরবর্তী ধাপের মহামারী মোকাবিলায় তারা আরও ভালো অবস্থানে থাকবে।”
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি জনস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেছে যাতে দেশগুলি প্রস্তুত অবস্থায় থাকতে পারে।
নির্দিষ্ট কোনো সমাধান নেই
করোনাভাইরাসের মহামারী নিয়ে ড. রন বলেন, “ভাইরাস নতুন হলে আর মানুষের মধ্যে এর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকলে লকডাউন তুললে সংক্রমণ ফিরে আসবে।”
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ডব্লিউএইচও-এর কোভিড-১৯ বিষয়ক কর্মকর্তা ড. নাওকো ইশিকাওয়ার কাছে সম্ভবত সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হলো, “এমন কোনও একক ব্যবস্থা বা কৌশল নেই যা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।”
“কেবল পরীক্ষা করে অথবা কেবল শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিধিনিষেধ আরোপ করে হবে না।”
ড. রন বলেন, “জনগণের মধ্যে রোগ প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। কার্যকর এবং সবার হাতে পৌঁছানোর মতো টিকা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা সবাই ঝুঁকিতেই আছি।”
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ