করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ‘ওমিক্রন’ নিয়ে শঙ্কা রক্ষাকবজ স্বাস্থ্যবিধিতে, নেই ভ্রুক্ষেপ

আপডেট: ডিসেম্বর ৪, ২০২১, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহী অঞ্চলে বর্তমানে করোনার সংক্রমণ স্বস্তিজনক অবস্থায় রয়েছে । রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালেও করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃতের হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। স্বস্তির এমন আবহে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে কারও কোনো ভ্রক্ষেপ নেই। সরকারি-বেসরকারি অনেক অফিসের সামনে করোনার উচ্চ সংক্রমণকালীন হাত ধোঁয়ার জন্য যে অবকাঠামো স্থাপন করা হয়েছিলো সেগুলোও প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে। জমেছে ময়লার স্তুপ। আর জনজীবনে বাধ্যতামূলক মাস্কের ব্যবহার, সামাজিক দূরত্ব এসব বিষয়ের কোনো বালাই নেয়। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আফ্রিকা মহাদেশে চোখ রাঙ্গাচ্ছে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ‘ওমিক্রন’। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কেউ যাতে না আসেন সেটিতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আসলেও তাকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখতে বলা হচ্ছে। কিন্তু গত এক মাসে আফ্রিকা থেকে আসা ২৪০ ব্যক্তির খোঁজ নেই। এতে নতুন এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ঝুঁকির শঙ্কায় রয়েছে রাজশাহী অঞ্চলও।

নতুন এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কার কথা জানিয়ে রাজশাহীর স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট আমাদের দেশে এখনও চিহ্নিত হয় নি। তবে শঙ্কাটা কম নয়। বিশেষ করে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে ছড়িয়ে পড়লে আমাদের দেশেও মারাত্মক সংক্রমণ ঘটতে পারে। আবার আক্রান্ত দেশ থেকে যদি আক্রান্ত ব্যক্তি ব্যক্তির যথাযথ ব্যবস্থাপনায় নজরদারি না থাকে সে ক্ষেত্রেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো- আফ্রিকায় সংক্রমণ চিহ্নিত হলেও সেখান থেকে অনেকেই দেশে প্রবেশ করেছে। যাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

তারা আরও বলছেন, নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টার চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। সেক্ষেত্রে সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে চলমান উদাসীনতা কাটিয়ে সচেতন হতে হবে। আর শীতকালিন পূর্বেও সংক্রমণটা বেশি দেখা গেছে। সুতরাং সাবধানতার বিকল্প নেই।
এদিকে, ওমিক্রন নিয়ে বিশ্বের গবেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাসের এই ভ্যারিয়েন্টটি অন্তত ৩২টি মিউটেশন (জিনগত গঠনের পরিবর্তন) ঘটিয়েছে। যার বৈজ্ঞানিক নাম বি.১.১.৫২৯। এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার অন্যতম কারণ এটি অত্যন্ত দ্রুত ও সহজে ছড়াতে পারে এবং মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এড়াতে পারে। যার ফলে এর বিরুদ্ধে টিকা কম কার্যকর হবে বলে ধারণ করা হচ্ছে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে মিউটেশন ছিল ১০টি আর বেটায় ৬টি। আর ওমিক্রনের ‘ইউনিক’ মিউটেশনের সংখ্যা এর অনেক বেশি। মোট ২৬টি। এতে বোঝা যায় একে মোকাবিলা করা কত কঠিন হতে পারে।

অপরদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকার মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান এ্যানজেলিক কোয়েৎজি গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সে দেশে ওমিক্রনে আক্রান্তদের অধিকাংশেরই হাসপাতালে চিকিৎসা নেবার দরকার হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে এটার লক্ষণ অত্যন্ত মৃদু। প্রথম যে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তারা চিহ্নিত করেছিলেন সে একজন পুরুষ। তার বয়স ছিল প্রায় ৩০। সে দু’দিন ধরে প্রচন্ড ক্লান্তি অনুভব করার কথা বলছিল। তার মৃদু উপসর্গ ছিলো।

তিনি আরও জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় সংক্রমিত সবারই লক্ষণ তাদের বিবেচনায় অত্যন্ত মৃদু। কাউকেই হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় নি। আফ্রিকা হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউটির ফ্যাকাল্টি সদস্য এ্যালেক্স সিগাল ওয়াশিংটন গণমাধ্যমকে জানান, এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোটা ভুল হবে। তবে বলা যায় যে, আমরা আগে যা দেখেছি, এটা তার চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন বলে মনে হচ্ছে না। এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু করবে এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই।

তবে ওমিক্রন নিয়ে তথ্য প্রকাশের পরপরই বিভিন্ন দেশ তড়িঘড়ি করে দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আক্রান্ত দেশগুলোতে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় বাংলাদেশসহ অনেক দেশের সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ দেশে ঢুকে পড়লে সংক্রমণের শঙ্কাটা বেশি থাকবে। আর আমাদের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনেক উদাসীনতা বিদ্যমান। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে নজরদারি রাখতে হবে যেন সীমান্ত অতিক্রম করে সংক্রমণ দেশে ছড়িয়ে না পড়ে। তবে যদি ছড়িয়ে পড়ে সেক্ষেত্রে জনসাধারণের সচেতনতার বিকল্প নেই। আর পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে তারা প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন। নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট কতটা ভয়ানক হবে এটা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে যেমনিই হোক সচেতন থাকতে হবে। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছে সেভাবেই তারা কাজ করছেন।

এদিকে, করোনার সংক্রমণ ঝুঁকি শূন্যের কোটায় না নামলেও রাজশাহীর সরকারি-বেসরকারি অফিস, হাট-বাজার, রাস্তাঘাটে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে সচেতনতা নেই বললেই চলে। হাতে গোনা কিছু মানুষকে মাস্ক ব্যবহার করতে দেখা গেলেও সিংহভাগ মানুষ এ বিষয়ে উদাসীন। করোনার উর্ধ্বমুখি পরিস্থিতিতে রাজশাহীতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে স্থাপন করা হাত ধোয়ার আধুনিক ব্যবস্থা, জীবাণুনাশক ট্যানেল করা হলেও সেগুলোর অধিকাংশই এখন অকেজো।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাবিবুল আহসান তালুকদার জানান, গ্লোবালাইজেশনের যুগে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা অনেক বেশি। সেদিক দিয়ে রাজশাহীতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা আছে। তবে এখন পর্যন্ত যে সকল দেশে নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট চিহ্নিত হয়েছে। সে সকল দেশ থেকে আমাদের দেশে দুটি মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের মাধ্যমে এবং আকাশপথে সে সকল দেশে থেকে কেউ আসলে। সুতরাং এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি আরও জানান, রাজশাহীসহ সারাদেশেই সংক্রমণ কমে যাওয়ায় স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে সচেতনতা কমেছে। এই বিষয়ে প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে। আর তারা সরকারের তরফ থেকে যে নির্দেশনা পাচ্ছেন সে অনুযায়ী কাজ করছেন।

বাংলাদেশ কিংবা পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে এখনো করোনার এই নতুন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ শনাক্ত হয় নি। তবে আফ্রিকা থেকে আসা ২৪০ ব্যক্তির খোঁজ না পাওয়া নতুন শঙ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর সংক্রমণ ঝুঁকিসহ সার্বিক দিক বিবেচনায় এরইমধ্যে করণীয় নির্ধারণ করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ১৫ দফা নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নির্দেশনাগুলোয় আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আগতযাত্রীদের বন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং জোরদার করা, আক্রান্ত দেশ থেকে আগত যাত্রীদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করাসহ সর্বক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি জোরদার ও জনসমাগম এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।