‘করোনার বাস্তবতা মেনে সহনশীলতা বাড়াতে হবে’

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২২, ১২:৪৩ অপরাহ্ণ

প্রতীকী ছবি

সোনার দেশ ডেস্ক :


গত ২ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডির একটি ভবনের পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে একা থাকা মহসিন খান ফেসবুকে লাইভে এসে মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন।

রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান ঘটনাস্থলে থাকা গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, তিনি বাসাটিতে একাকী জীবনযাপন করছিলেন প্রায় পাঁচ বছর।

ফেসবুক লাইভে নিজের শারীরিক অবস্থা, একাকিত্ব, ব্যবসায় লোকসান, কাছের মানুষের প্রতারণা—এসব উল্লেখ করে লাইসেন্স করা পিস্তল মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করেন আবু মহসিন খান।

সাজ্জাদুর রহমান জানান, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা যেটা জানতে পেরেছি, মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন একা বসবাস করছেন। জীবনের প্রতিও আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন।’

বেসরকারি সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ১০১ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

এদের মধ্যে ৬৫ জন ছিলেন পুরুষ ও ৩৬ জন নারী শিক্ষার্থী। ৬২ জন ছিলেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

এদের মধ্যে সম্পর্কগত কারণে ২৪.৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী, পারিবারিক সমস্যার কারণে ১৯.৮০ শতাংশ, মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ১৫.৮৪ শতাংশ, পড়াশোনা সংক্রান্ত কারণে ১০.৮৯ শতাংশ, আর্থিক সমস্যার কারণে ৪.৯৫ শতাংশ এবং মাদকাসক্ত হয়ে ১.৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

এছাড়া বিবিধ কারণে আত্মহত্যা করেছেন ২১.৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।
করোনা মহামারিতে পুরো বিশ্বই এক নতুন পরিস্থিতির চিত্র দেখেছে।

করোনা আক্রান্ত হয়ে ভীত হওয়া, পরিবারকে পাশে না পাওয়া, সামাজিক ট্যাবু, কর্মহীনতা, উপার্জন কমে যাওয়া, পরিবারের সদস্যের মৃত্যু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ কমে যাওয়া—সবই তীব্রভাবে ছুঁয়ে গেছে সবাইকে। এগুলো মনকে করেছে অস্থির ও বিষাদগ্রস্ত।

তরুণদের মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, বৃদ্ধদের জন্য বাইরে না যাওয়ার মতো বিষয়গুলোও প্রভাবিত করেছে অনেককে।

লাইভে আত্মহত্যার বিষয়টি সমাজে কতটুকু প্রভাব ফেলবে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই ভিডিও যারা দেখেছে

তারা অনেক দিন ট্রমাটাইজড থাকবে। আমি ভিডিওটি দেখিনি। দেখার ইচ্ছেও নেই। তবে বিস্তারিত শুনেছি। এর মাধ্যমে মানুষ সাইকোলজিক্যালি ট্রমাটাইজড থাকবে অনেক দিন

। দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মহসিন সাহেবের মতো আরও যারা রয়েছেন, যাদের পরিবারের মানুষগুলো দূরে থাকেন, সন্তানরা দূরে বা যাদের সঙ্গী নেই—তারা একটা আইডিয়া পেয়ে গেলেন।

তারা উৎসাহিত হবেন। ভাববেন, ‘এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো, এটা আমাকে একটা সমাধান দেবে’।”

তিনি আরও বলেন, ‘করোনার এই সময়ে অনেকেই সামাজিকভাবে, পারিবারিকভাবে দূরে আছেন। অনেক কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন আছেন। তাদের জন্য এই ঘটনা নতুন ট্রমা তৈরি করবে। সবাই এ কাজ করবেন, সেটা বলছি না।

কিন্তু এখান থেকে কেউ আইডিয়া নিতে পারেন। এটা খুবই বিপজ্জনক হবে।’ যদিও ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে, কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা ভিডিওটি নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছেন।

এমনটা জানিয়ে অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলেন, ‘এটা তারা প্রায়ই দেখবে এবং যারা মানসিকভাবে সুস্থ নয়, তারা আনন্দ পাবে। এটা কোনোভাবেই সমাজের জন্য ভালো হবে না।’

মহসিন খান ভিডিও বার্তায় বলেছেন তার নিঃসঙ্গতার কথা, হতাশার কথা, নিজের উপার্জন দিয়ে অন্যদের জন্য অনেক কিছু করেও নিজের না পাওয়ার কথা।

তার এসব কথা দেশের অন্য বৃদ্ধদের প্রভাবিত করতে পারে জানিয়ে অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলেন, ‘পরিবারে যারা এমন রয়েছেন তাদের গুরুত্ব দিতে হবে। সময় দিতে হবে। তাদের ভেতর বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে।

এই মানুষগুলোর ভেতর একাকিত্বের বোধ যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’
করোনাকাল একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি।

এই সময়ে মানসিক সংকট দেখা দেওয়া স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের এই সমস্যাকে মান্য করতে হবে, করোনাকে মান্য করতে হবে। পারিবারিক বন্ধন পরিবর্তিত হচ্ছে। সামাজিক কাঠামো বদলাচ্ছে। মানুষ নিঃসঙ্গ হচ্ছে।

এগুলো তো অস্বীকার করতে পারবো না। কিন্তু এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আমাদের রেজিলেন্সি তথা সহনশীলতা বাড়াতে হবে।’

‘মানসিক স্বাস্থ্যের জায়গাটি শক্তিশালী করতে হবে। যাতে যে কোনও প্রতিক‚ল পরিস্থিতিরি মোকাবিলা আমরা করতে পারি।’ পরামর্শের প্রশ্নে ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘করোনাকালে কেবল নেতিবাচক দিকগুলো মাথায় নিলে হবে না। এই সময় কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছে।

সেটা হলো—তারা নিজেদের বাঁচিয়ে রেখেছে। করোনার মতো একটি প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার যে সক্ষমতা, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার যে শিক্ষা তারা পেয়েছে, সেটা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাতেও হয় না। সুতরাং সবসময় নেতিবাচক না ভেবে বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখতে পারি।’- বাংলা ট্রিবিউন