করোনার সঙ্গে রাজশাহীবাসীর এক বছর

আপডেট: এপ্রিল ১৪, ২০২১, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

তারেক মাহমুদ:


করোনার সঙ্গে এক বছর পার করল রাজশাহীবাসী। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেই কোভিড-১৯ এখন যাপিত জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে টিকা। তবু শুরুতে যারা ভুগেছেন, অদৃশ্য এই শত্রুর এখনো অজানা আতঙ্ক তাড়া করছে মানুষকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে দেশ। তবে করোনাকালে রাজশাহীর স্বাস্থ্য খাতের যে ক্ষতগুলো বেরিয়ে এসেছে, তা ভাবতে হবে, সেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে।
রাজশাহীতে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল। জেলার পুঠিয়া উপজেলায়। শনাক্ত ওই ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জ থেকে বাড়ি এসেছিলেন। রাজশাহীর ল্যাবে পরীক্ষার পর তাঁর শরীরে করোনা ‘পজিটিভ’ ধরা পড়ে। এরপর থেকেই রাজশাহীতে ছড়িয়ে পড়ে করোনা ভাইরাস। শনাক্ত হয় অন্য উপজেলাগুলোতে, সাথে রাজশাহী মহানগরীও। প্রশাসন সকল শনাক্ত ব্যক্তির বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করেছিলো। পাশাপাশি এলাকায় মাইকিং করে সবাইকে বাড়ি থেকে বের না হওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। একই সাথে বিদেশ ফেরত ও ঢাকা নারায়ণগঞ্জসহ অন্য জেলা থেকে আসা ব্যক্তিদের করোনা পরীক্ষা করা হয়। রাজশাহীতে এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে করোনা। বাড়তে থাকে করোনা শনাক্তের সংখ্যা ও মৃত্যু।
৮ মে ২০২০ সালে রাজশাহীতে প্রথম লকডাউন দেয়া হয়। এরপরেই সরকারিভাবে প্রশাসনের সহয়তায় শুরু হয় লকডাউনে থাকা অসহায় ও নি¤œমধ্যবিত্ত মানুষদের বাড়ি বাড়িতে খাদ্য বিতরণ প্রক্রিয়া। করোনা শনাক্ত পরিবারের মাধ্যে লকডাউন চলাকালীন দেয়া হয় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য। কয়েক মাস পরে করোনা একটু স্বাভাবিক হয়। ওইসব দিন ছিল আতঙ্কের। দুঃসহ স্মৃতি ভোলার নয়। আশার সঞ্চার হয়েছিল- করেনোকালের অবসান হবে। কিন্তু আবারো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার নিয়ে চলতি বছরের মার্চ থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হেনেছে আরো ভয়ঙ্কররূপে। করোন্ াপ্রতিরোধে আবারো শুরু হয়েছে লকডাউন।

রাজশাহী জেলায় করোনার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোট শনাক্ত রোগী ৭ হাজার ২২৯ জন। মারা গেছেন ৬০ জন। করোনার প্রথম দিকে মৃত্যু সংখ্যা বেশি হলেও মাঝে কয়েক মাস শনাক্ত ও মৃত্যু হার কম ছিলো। কিন্তু মার্চ থেকে আবারো করোনা তার রূপ বদলে জটিল আকার ধারণ করেছে। শনাক্ত ও মৃত্যু হচ্ছে মানুষের। এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৬ হাজার ৮১ জন। চিকিৎসাধীন এক হাজার ৮৮ জন। হোম কোয়ারেন্টিনের স্যংখা দুই হাজার ৪৪৩ জন, ছাড়পত্র পেয়েছেন দুই হাজার ৪৪৩ জন। এখন পর্যন্ত আইসোলেশনে এক হাজার ৮৮ জন, প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন ১৫৩ জন এবং চিকিৎসাধীন আছেন ৪৩ জন। রাজশাহী সির্ভিল সার্জন অফিসের সূত্র মতে এই সকল তথ্যা পাওয়া গেছে।
গত কয়েক সপ্তাহ থেকে করোনা আরো ভয়াবহ হতে শুরু করেছে। বেড়েছে শনাক্তের সংখ্যা, মারা যাচ্ছে মানুষ। ১৩ এপ্রিল মঙ্গলবার রামেক হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ৯৪ জন ভর্তি আছেন। এদের মধ্যে করোনা শনাক্ত রোগী সেবা নিচ্ছে ৫২ জন ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছেন ৪৬ জন। মারা গেছে তিনজন। করোনা সংক্রমণ বেশি হওয়ায় জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মানুষকে সচেতন করার জন্য মাঠে কাজ করছেন। তবে মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে তেমন সাড়া পড়েনি। তাই ৫ এপ্রিল সারাদেশের মত রাজশাহীতেও লকডাউন ঘোষণা করা হয়। তবে এই সাতদিন ঢিলেঢালাভাবে লকডাউন ছিলো রাজশাহীতে।
সংক্রমণ বাড়ায় আবারো ১৪ এপ্রিল বুধবার দ্বিতীয় বারের মত কড়ালকডাউনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে-তা কার্যকর করা হচ্ছে।
রামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া রোগী হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তির সাথে কথা হয় তিনি জানান, গত বছরের প্রথমে পরিস্থিতি অনেকটাই থমকে যাওয়ার মত ছিল। তবে জীবন তো চালাতে হবে। একদিকে জীবন আরেক দিকে করোনার ভয়। ডাক্তাররা বলছে সবাই যদি মাস্ক পরে স্বাস্থ্যবিধি মানে তাহলে করোনা কম ছড়াবে আমাদের তাই করা উচিত।
চিকিৎসা নেয়া এক রোগীর স্বজন সায়েম আকতার বলেন, গত বছর করোনার মধ্যে
বাড়তে থাকে আক্রান্তের সংখ্যা। লকডাউনে যায় বাংলাদেশ। গণপরিবহন থেকে শুরু করে অফিস আদালত সব বেঁধে যায় সীমিত পরিসরের বেড়াজালে। থমকে যায় সবকিছু, যেন বন্দি হয় প্রকৃতির কাছে। বছর ঘুরে এবারো তাই মনে হচ্ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয় কয়েকজন চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞের সাথে। তারা জানালেন, ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার দূরদর্শিতা দেখেছেন দেশ। তবে স্বাস্থ্যসেবায় যে ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে সে জায়গাগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ভ্যাকসিন নিতে এখন সবাই আশার আলো দেখছেন। তবে গত কয়েক মাস স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে সংক্রমণ খুব ত্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এই সময় সচেতন হলে সংকমণ এতো বেশি ছড়িয়ে পড়তো না। তাই এখনই জীবন বাঁচাতে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ