করোনায় আশা জাগাচ্ছে বাইপ্যাপ

আপডেট: জুলাই ৩১, ২০২১, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

মাহাবুল ইসলাম:


বর্তমানে করোনার ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ বিস্তৃতি লাভ করেছে। শক্তিশালী এ ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণের ফলে রাজশাহী মেডিকেলে কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগিদের প্রত্যেকের অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ছে। করোনা রোগিদের প্রায় ৪০ শতাংশের উপরে উচ্চ প্রবাহের অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ছে। আর এসব রোগিদের উচ্চ প্রবাহের অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে মহামারী পরিস্থিতিতে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার চেয়ে অধিক কার্যকরি বাইপ্যাপ। দাম ও অক্সিজেন সাশ্রয়ী, জরুরি মুহূর্তে নিজে থেকে অক্সিজেন উৎপাদনের ক্ষমতায় করোনা চিকিৎসায় আশা জাগাচ্ছে বাইপ্যাপ।
জানা যায়, ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণের পর রোগিদের মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক খুললেই ছটফটানি শুরু হয়। আবার এদের একটা বড় অংশের জন্য নিরবিচ্ছিন্নভাবে উচ্চ প্রবাহের অক্সিজেন নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। যাদের অক্সিজেন সিলিন্ডার কিংবা শুধু সেন্ট্রাল অক্সিজেনের দ্বারা স্যাচুরেশন ঠিক রাখা সম্ভব না।
হাসপাতাল সূত্র বলছে, হাসপাতালে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ করোনা রোগি গুরুতর অবস্থায় ভর্তি হচ্ছেন। এসব রোগির অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল প্রায় ৬৫ শতাংশের নিচে নামছে। তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র আশা হলো আইসিইউতে ভেন্টিলেটর ব্যবহার করে উচ্চপ্রবাহের অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা। যেখানে প্রতি মিনিটে ১০০ শতাংশ অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। অথবা তাদের প্রয়োজন হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, যা প্রতি মিনিটে ৭৫ শতাংশ অক্সিজেন সরবরাহ করে।
হাসপাতালে চাহিদার তুলনায় আইসিইউ শয্যা কম। প্রতিদিন প্রায় ৪০ জনের উপরে আইসিইউ শয্যার অপেক্ষায় থাকছে। এমন পরিস্থিতিতে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার মাধ্যমে রোগিদের অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার নেতিবাচক দিক হলো এটি সেন্ট্রাল অক্সিজেন কিংবা অক্সিজেন সিলিন্ডার অক্সিজেনের উপর নির্ভরশীল। এটি শুধুমাত্র অক্সিজেনের উচ্চ প্রবাহটা নিশ্চিত করতে পারে। নিজে থেকে অক্সিজেন উৎপন্ন করার সক্ষমতা নেই।
চিকিৎসকরা বলছেন, একটি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার ব্যবহারে প্রতিঘণ্টায় ৬০ লিটারের বেশি অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে। ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ৪৪০ লিটারের বেশি অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে। যেটা অক্সিজেন সিলিন্ডার কিংবা সেন্ট্রাল অক্সিজেনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। যা রামেক হাসপাতালের মোট অক্সিজেন চাহিদার প্রায় ১১ ভাগের এক ভাগ। রামেক হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেনের মাধ্যমেই হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলায় এটি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এতে একসঙ্গে বেশকিছু হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার ব্যবহারে সাধারণ অক্সিজেন লাইনের প্রবাহ ২০ এর নিচে নেমে যায়। আবার বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
জানা যায়, এরইমধ্যে একবার রামেক হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে বেশকিছু হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা একসঙ্গে ব্যবহারে ওয়ার্ডের পুরো অক্সিজেন লাইন বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোগান্তির মধ্যে পড়ে রোগীরা। এই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার ব্যবহারে এমন দূর্ঘটনার পুনরাবৃত্তির শঙ্কা আছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, মহামারী পরিস্থিতিতে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার চেয়ে বাইপ্যাপ অধিক কার্যকরি। কোনো সিলিন্ডার কিংবা সেন্ট্রাল অক্সিজেনের সংযোগ ছাড়াই বাইপ্যাপ ৫০ শতাংশের উপরে অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে। প্রাকৃতিক অক্সিজেনের সাহায্যে সে নিজে নিজে অক্সিজেন তৈরি করতে পারে। আর সেন্ট্রাল অক্সিজেনের সঙ্গে সংযুক্ত করলে ১০০ শতাংশই সরবরাহ করতে পারে বাইপ্যাপ। এক্ষেত্রে প্রতিঘণ্টায় মাত্র ৫ থেকে ৬ লিটার অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, মহামারী পরিস্থিতিতে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার চেয়ে বাইপ্যাপ অধিক কার্যকরি। কেননা এটাতে সেন্ট্রাল কিংবা সিলিন্ডার অক্সিজেনের সংযোগ ছাড়াও রোগিকে ৫০ শতাংশের উপরে অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব।
তিনি আরও জানান, রামেক হাসপাতালে বর্তমানে ১৮ টা বাইপ্যাপ আছে। এরমধ্যে ১৬ টা ব্যবহার হচ্ছে। আর হাসপাতালে মোট ৮১ হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা আছে। এরমধ্যে ৬৫ টা বিভিন্ন ওয়ার্ডে দেয়া আছে। তবে ৬৫ টা একসঙ্গে ব্যবহার হয় না। একটা ওয়ার্ডে ৭ থেকে ৮ টার উপরে একসঙ্গে এটা ব্যবহার করা যায় না।
তিনি জানান, একটি ওয়ার্ডে একসঙ্গে প্রায় ১২ টার মতো হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার ব্যবহারে সেখানে একটা সাময়িক দুর্ঘটনায় পড়তে হয়েছিলো। তাৎক্ষণিক সেটা ঠিক করা হয়েছিলো। তবে শতভাগ বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহসহ দূর্যোগকালীন বাইপ্যাপ বেশি কার্যকরি। এটার দামও হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার চেয়ে অনেক কম। একটা হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার পরিবর্তে তিনটা বাইপ্যাপ কেনা যায়।
রামেক পরিচালক জানান, প্রথম দিকে অনেকেই হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা কিনে অনুদান হিসেবে দিয়েছে। যার কারণে এর সংখ্যাটা বেশি। তবে এখন যারা দিতে চাচ্ছেন তাদেরকে বাইপ্যাপটা দিতেই আহ্বান জানানো হচ্ছে।