করোনা পঙ্গপালের পর নতুন চমক ‘সামুদ্রিক তেলাপোকা’

আপডেট: July 23, 2020, 2:57 pm

সোনার দেশ ডেস্ক :


বিজ্ঞানীদের জন্য এ বছরটা নাকি অন্যরকম। কারণ, বছরের শুরুতেই প্রাণঘাতী করোভাইরাসের আক্রমণ, এদিকে অনেক দেশে হানা দিয়েছে পঙ্গপালের ঝাঁক। এরই মধ্যে এবার গভীর সমুদ্রে খোলসযুক্ত জলজ প্রাণী প্রজাতির অতিকায় এক জীবের সন্ধান পেয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার বিজ্ঞানীরা। এই জীবকে তারা ‘দানবাকৃতির সামুদ্রিক তেলাপোকা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি ‘ক্রাসটেশিয়া ‘ শ্রেণিভুক্ত জীবিত অতিকায় প্রাণীগুলোর অন্যতম। নতুন এই জীবটি ব্যাথিনোমাস বর্গের অন্তর্ভুক্ত। ব্যাথিনোমাস হলো বিশাল আকৃতির আইসোপড প্রজাতির প্রাণী, যাদের পা থাকে ৭ জোড়া। বিশাল চেহারার এই জীবের দেহ চ্যাপ্টা, তাদের দেহের উপরের অংশ শক্ত আবরণে ঢাকা থাকে। এরা গভীর পানিতে থাকে।
প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম দেয়া হয়েছে ব্যাথিনোমাস রাকসাসা (ইন্দোনেশীয় ভাষায় রাকসাসা মানে রাক্ষস বা দানব)। এটি পাওয়া গেছে জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মাঝে সুন্দা প্রণালীতে এবং ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯৫৭ থেকে ১ হাজার ২৫৯ মিটার গভীরে। প্রাপ্তবয়স্ক এই জীবটি আয়তনে ৩৩ সেন্টিমিটার লম্বা এবং আকৃতির দিক দিয়ে এটিকে অতিদানব বলে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। ব্যাথিনোমাস শ্রেণিভুক্ত অন্য প্রজাতির প্রাণীর মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত লম্বায় ৫০ সেন্টিমিটারও হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সেসের (এলআইপিআই) শীর্ষ গবেষক কনি মার্গারেথা সিদাবালক বলেন, এই প্রাণীটি আসলেই অতিকায় এবং ব্যাথিনোমাস প্রজাতির মধ্যে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ জীব।
পৃথিবীতে অতিদানব আইসোপড প্রজাতির সাতটি প্রাণীর কথা জানা যায়। এই প্রথম ইন্দোনেশিয়ার গভীর সমুদ্রে অতি দানবাকৃতির সাত জোড়া পা বিশিষ্ট এই প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেল। ওই এলাকায় এ ধরনের প্রাণী নিয়ে গবেষণা হয়েছে খুবই কম বলে এক বিজ্ঞান সাময়িকীতে লিখেছেন বিজ্ঞানীদের দলটি।
এলআইপিআই সংস্থার জীববিজ্ঞান বিভাগের অস্থায়ী প্রধান ক্যাথিও রাহামাদি বলেন, এই প্রাণীর সন্ধান এটাই প্রমাণ করে, ইন্দোনেশিয়ায় জীববৈচিত্রের ব্যাপকতার খোঁজ মানুষ এখনও পায়নি। বিশাল সম্ভাবনাময় এই জগতটা সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই।
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ বলছে, গভীর সমুদ্রের আইসোপড কেন এত বিশালাকৃতির হয়, সে সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। একটা তত্ত্ব হলো, সমুদ্রের অত গভীরে বেঁচে থাকতে হলে প্রাণীকে প্রচুর অক্সিজেন শরীরে সঞ্চিত রাখতে হয়। ফলে তাদের দেহ বিশাল আকারের হতে হয় এবং তাদের লম্বা পা থাকার প্রয়োজন হয়। আরেকটি বিষয় হলো, গভীর সমুদ্রে তাদের কোনোরকম শিকারীর হাতে পড়ার ভয় থাকে না, কাজেই তারা নির্ভয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়। এছাড়া খোলসযুক্ত অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে ব্যাথিনোমাস প্রজাতির প্রাণীর শরীরে মাংসের পরিমাণ থাকে খুবই কম, যেমন কাঁকড়া। এ কারণে তাদের ধরে খাবার শখ অন্য প্রাণীদের তেমন থাকে না।
ব্যাথিনোমাস প্রজাতির প্রাণীর লম্বা শুঁড় ও প্রকা- চোখ থাকে। এ কারণে অন্ধকারের মধ্যেওনিজেদের আবাস এলাকায় স্বচ্ছন্দে ও নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারে তারা। চেহারা দানবীয় হলেও তারা আচরণে আসলে ততটা ভয়ঙ্কর নয়। তারা আসলে গভীর সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়, মহাসাগরের তলদেশ থেকে খাবার খুঁজে খায়। এছাড়া মরা জীবজন্তুর দেহাবশেষ থেকে তারা খাদ্য সংগ্রহ করে তারা।
লন্ডনের ইতিহাস বিষয়ক জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের পরিপাক যন্ত্র খুবই শ্লথ। তারা যা খায় তা হজম করতে অনেক সময় লাগে। জাপানে দেখা গেছে খাঁচায় রাখা এই অতিকায় দানব আইসোপড প্রাণী না খেয়ে পাঁচ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
যৌথ গবেষণায় অংশ নিচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার এলআইপিআই, সিঙ্গাপুরের ন্যাশানাল ইউনিভার্সিটি এবং লি কং চিয়ান ন্যাচারাল হিস্ট্রি জাদুঘর। এই গবেষক দল ২০১৮ সালে দুই সপ্তাহ ধরে চালানো এক অভিযানে ৬৩টি বিভিন্ন গবেষণার স্থল আবিষ্কার করে এবং সেসব জায়গা থেকে কয়েক হাজার প্রাণী নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করে। এর মধ্যে এক ডজনের মতো নতুন প্রাণী খুঁজে পান তারা।
গবেষকরা বলছেন, তারা ব্যাথিনোমাস প্রজাতির দুটি নমুনা পান। একটি পুরুষ যার দৈর্ঘ্য ৩৬.৩ সেন্টিমিটার এবং একটি নারী যেটি লম্বায় ২৯.৮ সেন্টিমিটার। সুন্দা প্রণালী এবং দক্ষিণ জাভার সমুদ্র থেকে ব্যাথিনোমাসের আরও চারটি নমুনা তারা সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু মিস সিদাবালক বলছেন, এই প্রজাতির মধ্যে যে বিশেষত্বগুলো থাকা দরকার সেগুলো এখনও তাদের দেহে সেভাবে গড়ে না উঠায় অন্য চারটিকে একই প্রজাতির মধ্যে ফেলা যাচ্ছে না।
সূত্র : বিবিসি বাংলা

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ