করোনা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি

আপডেট: জানুয়ারি ১৬, ২০২২, ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু


করোনা ভ্যাকসিন না নেওয়াদের বিরুদ্ধে দেশে দেশে কঠোর হুশিয়ারির ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট অমিক্রন এর সংক্রমণ ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে ।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দেশটির পারশিয়ান সংবাদ মাধ্যমকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যারা করোনার টিকা নেননি বা নিবেন না তাদের ভুগিয়ে ছাড়বো এবং শেষ পর্যন্ত দেখে নেবো। তিনি আরও বলেন, আমি তো জোর করে কাউকে টিকা নেওয়াতে পারি না। কিন্তু আশা করি মানুষ সামাজিক জীবন নিরবিচ্ছিন্ন রাখতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিকা নিবে। আমি টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের জেলে পাঠাবো না কিন্তু আগামী ১৫ জানুয়ারি থেকে তারা রেস্টুরেন্টে খেতে পারবে না, কফির আড্ডায় যেতে পারবে না কিংবা সিনেমা দেখতে পারবে না। অবশ্য ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক বিরোধিরা এর প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থাতেও এমন ভাষা ব্যবহার করা যেতে পারে না।

ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তে ঘোষণা করেছেন, যারা কোভিড এর টিকা নেননি তারা যদি ঘরে থাকার নির্দেশ অমান্য করে তাহলে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। এ ব্যাপারে টিকা না নেওয়াদের উপর নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বিভিন্ন জেলার নেতাদের। কোভিড টিকা না নিয়েও যারা ঘরের বাইরে ঘুরে বেড়ান তাদের আটকানো হবে এবং না মানলে গ্রেপ্তার করা হবে। গত বছরেও তিনি টিকা নিতে অস্বীকৃতি জানানোদের জেলে পাঠানোর বা শরীরে পশু চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ ঢুকিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। দেশটির করোনা সংক্রমণ ৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পরে তিনি এই ঘোষণা দেন। দুতের্তের বিরোধী রাজনীতিকরা অবশ্য এসব হুঁশিয়ারিকে দুতের্তের অতিকথন ও উল্টোপাল্টা কথা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

যুক্তরাজ্যে ও করোনার দৈনিক সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আগেকার রেকর্ড ভঙ্গ করেছে এবং সাম্প্রতিককালের অমক্রিন ভাইরাসকে করোনার চেয়ে ৭০ গুন বেশি সংক্রামক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এজন্য যুক্তরাজ্য সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে। তবে ইতোমধ্যে দেশটির ১৮ টি রাজ্যে ২৫ শতাংশ হাসপাতালে ডাক্তার-নার্স সহ লোকবল সংকটে ভুগছে। ভারতেও করোনা সংক্রমণ বেড়েছে আশংকাজনক হারে। শুধু তাই নয়, ভারতের পার্লামেন্টের ৪ শতাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এ কারণে ভারত সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ সহ লকডাউন কর্মসূচি গ্রহণ করতে যাচ্ছে। আবার এর মধ্যেই ৫ টি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন এর ঘোষণা দিয়েছে। এ সম্পর্কে বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. কাজল কৃষ্ণ বণিক বলেছেন, মানুষ না বাঁচলে ভোট দেবে কে। বাংলাদেশ সরকারও করোনা পরিস্থিতির অবনতির কথা ভেবে সর্বত্র মাস্ক ব্যাবহার নিশ্চিত, রেস্টুরেন্টে খেতে, আবাসিক হোটেলে থাকতে টিকা গ্রহণের সনদ দিতে, বাস ট্রে ন প্লেন স্টিমারে অর্ধেক যাত্রী বহন করতে, বিদেশগামীদের সাথে দর্শনার্থিদের প্রবেশ বন্ধ করতে এবং সামাজিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। প্রয়োজন হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বন্ধ করা হতে পারে।

এসব দেশের সরকার প্রধানগন দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন বিধায় এমন সব কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গত বছরে অভিজ্ঞতা সবারই জানা আছে ইতোমধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি অস্ট্রিয়া এবং ইতালিতে বিক্ষোভ করেছে শত শত টিকা বিরোধীরা। ফ্রান্সের পার্লামেন্টে কোভিড বিল অনুমোদিত হওয়াকে কেন্দ্র করে সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করেন ১ লাখের বেশি টিকাবিরোধী। বিক্ষোভকারীরা মাস্ক না পরা অবস্থায় তীব্র শীতের মধ্যে ‘সত্য, স্বাধীনতা’এবং টিকা পাশকে না বলুন প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে।

পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। অস্ট্রিয়ার রাজধানিতে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেছে। আগামী মাস থেকে টিকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বলে। জার্মানির কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। হামবুর্গে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ জড়ো হয়ে স্লোগান দিয়েছে, আমাদের শিশুদের ছেড়ে দাও। জার্মানিতে প্রাপ্ত বয়স্কদের টিকা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের কোভিড টিকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইতালির তুরিন শহরে ও শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেছে। সেখানে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের টিকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বলে।

করোনার প্রথম ঢেউ আসার পর এমন ভীতির সৃষ্টি হয়েছিল যে আক্রান্তদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি তার আত্মীয় স্বজন। বরং আক্রান্তকে হাঁসপাতালে ভর্তি করতে না পেরে পথে-ঘাটে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে এমনকি কবর দিতে যায়নি তার রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজন। দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল আত্মীয়দের মধ্যে। সেই ভীতি আর নেই। মানুষ এখন মনে করছে সিজিনাল ফ্লু নাম পরিবর্তন করে হয়েছে করোনা। লাল জ্বর, কালাজ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া প্রভৃতি জ্বরের মত এক ধরনের জ্বর। শুধু তাই নয়- করোনার জন্য তো পৃথক কোনো ওষুধ প্রয়োগ করা হয়না। উল্লিখিত জ্বরগুলোর জন্য যে ওষুধ আছে সেগুলোই প্রয়োগ করা হয়। আগেও জ্বর হতো, গলা ব্যথা হত্ োটনসিল ফুলতো আর এসব উপসর্গ নিয়ে টেস্ট করলেই করোনা পজিটিভ হচ্ছে। যা চিকিৎসা করলে ভাল হয়। ভারত, বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশে মোবাইল কোর্ট করে, জরিমানা করে, লাঠিপেটা করেও ৭৫% মানুষকে মাস্ক পরানো যায়নি। আর এখনতো ৫০% মানুষ মাস্ক পরেনা। ফ্রিস্টাইলে ঘুরে বেড়াচ্ছে শিক্ষিত অশিক্ষিত সব শ্রেণিপেশা ও স্তরের মানুষ। এখন করোনা আক্রান্তকে আইসোলেসনে রাখার কথা বলা হয়না। বিষয়টি খুব কঠিন এবং প্রমাণ হয়েছে যে করোনা ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর চেয়ে বাতাসেই বেশি ছড়ায়। যা প্রতিরোধের কোনো সহজ ব্যবস্থা নেই।

 

সেক্ষেত্রে মাস্কই একমাত্র ভরসা। আগে করোনা টিকার কার্যকারিতা ৬ মাস থেকে ১ বছর বলা হতো। ইদানিং এ বিষয়ে কিছু বলা হয়না। বলা হয় দুডোজ টিকা নিলে অন্ততপক্ষে মৃত্যুর ঝূঁকি থাকবে না। কিন্তু দুডোজ টিকা নেওয়ার পরেও পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা কম নয়। তখন বুস্টার ডোজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সে কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। কিন্তু তার কার্যকারিতা কতদিন তা টিকা উৎপাদনকারী কোম্পানীগুলো কিংবা তাদের মুরুব্বি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বিষয়টি স্পষ্ট করেনি। এছাড়া নতুন ভ্যারিয়েন্ট অমিক্রমের জন্যও কী করোনার ভ্যাকসিন কার্যকর সেটাও বলা হচ্ছেনা। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সিনোফার্মার টিকা গ্রহণকারীদের বিভিন্ন দেশে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছেনা।

 

বলা হচ্ছে সে দেশগুলো সিনোফার্মার টিকা অনুমোদন দেয়নি। ফলে সিনোফার্মা টিকা গ্রহণকারীরা বিদেশে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। অন্যদিকে যারা বিদেশে গমণেচ্ছু ব্যক্তি ইতোমধ্যে পাসপোর্ট করতে দিয়েছে তারা সিনোফার্মা টিকা নিচ্ছেনা। ফাইজার জনসন আস্ট্রেজেনেকা টিকা নেওয়ার অপেক্ষা করছে। কিন্তু তা সহজলভ্য নয় এবং তা বিশেষ শ্রেণির জন্য বরাদ্দ। আমাদের দেশে ৮০/৯০ ভাগ সিনোফার্মার টিকা আসে। ফলে বিদেশে গমণেচ্ছুদের কী করণীয় তা স্পষ্ট নয়। তাছাড়া যে কোনো টিকাই হোকনা কেন তা আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত হবেনা কেন ? এখানেও কি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ব্যবসা কাজ করছে ? বিশ্ব স্বাস্থ্যে এত অবনতির পরেও! এমন সব অস্পষ্ট ও অমিমাংশিত বিষয়গুলোর সুষ্ঠু সমাধান ছাড়া খুব বেশি কঠোর অবস্থানে যাওয়া কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয় ।
লেখক : সাংবাদিক