করোনা ভাইরাস : অদৃশ্য এক দানব

আপডেট: আগস্ট ১১, ২০২০, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
এরপরই ধরা যাক ইউরোপের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের পরই ইউরোপ মহাদেশের দেশগুলো বেশির ভাগই আক্রান্ত হয়েছে করোনা ভাইরাসে। চিনের পর প্রথমে আঘাত হানলো ইতালিতে। সেখানে হাজার হাজার মানুষ চলে গেছেন না ফেরার দেশে একেবারে অকালে এবং আকস্মিকভাবে। এরপর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্পেন এবং ফ্রান্সের হাজার হাজার মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে এই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। তাছাড়াও জার্মানি, বেলজিয়াম, ইরান, তুরস্ক, ব্রাজিল প্রভৃতি দেশগুলোও তাদের অনেক মূল্যবান জীবন হারিয়েছে এই মহামারির কবলে পড়ে। এই দেশগুলোতে মৃত্যুর দিক থেকে বর্তমানে মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করলেও মৃত্যুর হার একেবারে শূন্যের কোঠায় আসেনি। এখনও গড়ে দৈনিক পাঁচশত জন করে প্রাণ হারাচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে লাশের তালিকা দীর্ঘ হতে চলেছে। সেখানেও হাজার হাজার মানুষ বড় অকালে মৃত্যুবরণ করেছে এবং বর্তমানে মৃত্যু হার কমেনি। দৈনিক গড়ে আট থকে নয়শত লোক প্রাণ হারাচ্ছে। (এ পব্রন্ধটি লেখার সময়ের পরিসংখ্যান)। যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ সময় ধরে এই মহামারির আক্রমণ থেকে মুক্ত হতে পারছে না। তার মূল কারণ হলো নিউইয়র্ক যেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশের এধঃব ধিু, লন্ডনও তেমনি যুক্তরাজ্য এবং সমগ্র ইউরোপ মহাদেশের বিভিন্ন দেশে প্রবেশের এধঃব ধিু, প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশ থেকে আগত জাতি, ধর্ম বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ লন্ডন বিমান বন্দরে অবতরণ করেন। সেখান থেকে বিভিন্ন দেশে যাত্রা করেন। ফলে এই বিমান বন্দরে লোক সমাগম হয় অনেক বেশি এবং মানুষের মাধ্যমেই এই রোগটা বেশি ছড়াচ্ছে। বর্তমানে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য উভয় দেশই লকডাউনের আওতায় আসলেও কেন যেন দেশ দুটিতে লাশের সংখ্যা কোনোক্রমেই কমছে না। সম্ভবত ‘লকডাউনের’ পূর্বেই এই ভাইরাস সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, যার ফলে এই মৃত্যুর হার কমাতে দেশ দুটো সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য এখন পর্যন্ত এর কোনো সুরাহা হয়নি। মৃত্যুর দিক থেকে বর্তমানে যুক্তরাজ্য দ্বিতীয় স্থানে এসে গেছে আর ইতালি তৃতীয় স্থানে। তবে ব্রাজিলে মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে, ফলে এর অবস্থান আরও উপরে উঠে আসতেই পারে (বর্তমানে দ্বিতীয়)।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পৃথিবী নামের এই গ্রহটি বিস্ময়করভাবে এগিয়ে গেছে। যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অভুতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে, ফলে বিশ্বের কোথাও কোনো কিছু ঘটলে তা সে সুসংবাদই হোক বা দুঃসংবাদই হোক, দ্রুতগতিতে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। আফ্রিকার কোনো দেশে বাস দুর্ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে তা আমাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কি করে দুঃর্ঘটনা ঘটলো, কত মানুষের প্রাণহানি হলো, ইত্যাদি বিস্তারিত জানা যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ার ফলে, সমস্ত পৃথিবীটা ছোট হয়ে আমাদের হাতের মুঠোয় এসে গেছে এবং এটি যেন একটি মাত্র দেশে পরিণত হয়েছে। ফলে করোনা ভাইরাসের দোষ দিয়ে কী লাভ? এটি মানুষের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করছে। যেহেতু পৃথিবীর মানুষের সর্বত্রই বিচরণ যার ফলে দ্রুতগতিতে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। একদিকে থেকে সুবিধা নিতে গিয়ে, অন্য দিকে জীবন বিপদগ্রস্ত হতে চলেছে। এর সমাধান হবে কিভাবে? মানুষ যতো দ্রুত গতি খুঁজবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের জন্য, অন্যদিকে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য তা সহায়ক হবে।
ঢাকা বিমান বন্দরের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। অবশ্য চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরও আন্তর্জাতিক হওয়ার ফলে এই দুটো বিমানবন্দর দিয়ে কিছু যাত্রী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। যা হোক, ঢাকা জনবহুল শহর হওয়ায় এখানেই বেশির ভাগ মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের মফস্বল শহরগুলোতে ছিটেফোটা দু’চারটা রোগী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, সেগুলো নগণ্য। অন্যদিকে ২৩ শে এপ্রিল ২০২০ তারিখের খবরে বলা হলো, আক্রান্তদের ৪৫ শতাংশ ঢাকা শহরের এবং ৮৬ শতাংশ ঢাকা বিভাগের অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদীর কথায় বলা হচ্ছে। মানিকগঞ্জের খবর তেমন একটা পাওয়া যায় নি। অর্থাৎ ঢাকা শহরের আশেপাশেই আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। লকডাউন হওয়ার ফলে ঢাকার বাইরে এই ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ততো ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়নি (এপ্রিল মাসের পরিসংখ্যান)। বর্তমানে অবশ্য মফস্বল জেলাগুলোতেও আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
উল্লেখ্য যে, কয়েক শত বছর আগের কথা, ইউরোপ মহাদেশে প্লেগ রোগের প্রার্দুভাব হয়েছিল এবং এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। কিন্তু এই রোগের প্রাদুর্ভাব অন্য কোথায় দেখা যায়নি। তার মূল কারণ হলো তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেই ভাল ছিল না। ফলে মানুষের যাতায়াত বা চলাফেরাও তেমন ছিল না। যার জন্য এটি অন্যত্র বিস্তার লাভ করে নি। ১৯১৮ সালে স্পেনে, “স্প্যানিশ ফ্লুতে” আক্রান্ত হয়ে শত শত প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছিল। কিন্তু সে রোগটাও তেমন ছড়িয়ে পড়েনি। যেহেতু তখন মানুষের যাতায়াত ছিল একেবারে সীমিত। রোগ দুটি ছোঁয়াছে সন্দেহ নেই এবং মানুষই এর বাহক কিন্তু মানুষের চলাফেরা সীমিত থাকায় এটিও কোথাও ছড়িয়ে পড়ে নি। বর্তমানে ঘটেছে তার উল্টোটা। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হওয়ায় মানুষের যাতায়াত অনেক বেড়ে গেছে। এ কথা বললেও যথেষ্ট হবে না, বরং বলা যায় মানুষ এখন ছুটাছুটি করছে, এক দেশ থেকে অন্যদেশ এবং এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে, অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। ফলে করোনা ভাইরাসও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর সর্বত্রই-এই মানুষের সঙ্গে। বুলেট ট্রেন চড়ে মানুষই তো যাচ্ছে, কাজেই তার সঙ্গে ভাইরাসও তো যাবেই। সমগ্র পৃথিবীর দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ার এটাই মূল কারণ। ২০০২/২০০৩ সালে চিনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সার্স ভাইরাস রোগের প্রাদুর্ভাভ হয়েছিল। ২০০৯/২০১০ সালের সোয়াইন ফ্লুর রোগী দেখা যায়। দুটোই প্যান্ডেমিকের মর্যাদা প্রাপ্ত মহামারি ছিল। এ পর্যন্ত এ সব মহামারি পশ্চিমা বিশ্ব বাদে পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই ভয়ংকর রূপ নিয়ে সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু এবার কোভিড-১৯ সমগ্র ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হেনে সবকিছুই তচনচ করে ফেলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই প্রথম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি জাতীয় সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, এর ফলেই ইউরোপ ও আমিরিকান বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কেননা এ ধরনের রোগে তারা কোনো দিনই আক্রান্ত হয় নি। ফলে এ ব্যাপারে তাদের কোনো প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা কোনো কিছুই ছিল না। আমার তো মনে হয় এ দুটো মহাদেশ আক্রান্ত না হলে এতো হুলু¯ু’ল হতো না। (চলবে)
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান,জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।