করোনা ভাইরাস : অদৃশ্য এক দানব

আপডেট: আগস্ট ১২, ২০২০, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ঝড় একদিন নিশ্চয়ই থামবে। আমাদের জীবন যাত্রার প্রতিবন্ধকতা কেটে যাবে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার চিন্তা একটু ভিন্ন। লকডাউন হঠাৎ করে বন্ধ করা সমীচীন হবে না। লকডাউন ঢিলেঢালা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকাতে মানুষের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। অবশ্য যথা সময়ে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এই সমস্যার সমাধান সুচারুরূপে হতে চলেছে। তবে যে কোনো ভাবেই হোক, ঢাকায় জনস্রোতের সৃষ্টি না হয়Ñএ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে এবং তার জন্য একমাত্র পথ ঢাকার সবকিছুই কেন্দ্রীভুত না করে প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ করা।
করোনা ভাইরাসের জন্য মানুষ এতো আতঙ্কিত কেন?
আমি দীর্ঘ জীবন পেয়েছি, ফলে এই পৃথিবী, পৃথিবীর মানুষ, আপদ-বিপদ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ভালমন্দ সব কিছুরই আমি প্রত্যক্ষদর্শী। আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪৫ সালে জাপানে পর পর দুটা আণবিক বোমা বর্ষণের পর এই বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়। আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। এতো কম বয়সে আমরা যুদ্ধের ভাল-মন্দ তেমন কিছুই বুঝতাম না। তবে মাঝে মধ্যে দেখতাম রূপালি রঙের ছোট আকারের বিমানগুলো আকাশ পথে উড়ে যাচ্ছে। শব্দ শুনলেই আমরা আকাশের দিকে তাকাতাম আর তখনই প্লেন গুলো দেখতে পেতাম। সেগুলো যুদ্ধ জাহাজ ছিল না, তবে যাত্রী এবং মালামাল বহন করতো। উড়ো জাহাজগুলো ছিল প্রপেলার পরিচালিত। কেননা তখন জেট চালিত বিমান আবিস্কৃত হয়নি। আর প্রায়শঃ শুনতাম হিটলার, জার্মান, জাপান, ইংল্যান্ড, আমেরিকার কথা। সমগ্র ভারত তখন ছিল ব্রিটিশ শাসিত। ফলে এই যুদ্ধে যেহেতু গ্রেট ব্রিটেন জড়িয়ে পড়েছিল, ফলে ভারতেও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছিল। এই যুদ্ধে সমগ্র বিশ্ব দুটি জোট ভাগ হয়ে গিয়েছিল। আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও রাশিয়া ছিল এক জোটে, আর জার্মান, জাপান, ইটালি এরা ছিল অন্য জোটে। তখন অবশ্য আমাদের ভয়ের কিছুই ছিল না। তবে যুদ্ধের বাজারে কোনো কিছু পাওয়া যেতো না। রেশন কার্ডে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস, যেমন কেরোসিন তেল, চিনি, কাপড়চোপড়, ইত্যাদি পাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। তবে চট্টগ্রাম ও বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) সীমান্ত এলাকায় একাধিক বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল। যার নিদর্শন এখনও আছে।
এরপর যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬৫ সালে, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের। তখনও পূর্ব পাকিস্তান ছিল, পাকিস্তানের অংশ বিশেষ, কিন্তু আমাদের পূর্ব পাকিস্তানে খুব একটা প্রভাব পড়েনি। তাছাড়া আমরা ভালভাবেই জানতাম যে, ভারত পূর্ব পাকিস্তানের কোনো ক্ষতি করবে না। তখন অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিরক্ষার কোনো ব্যবস্থায় ছিল না। তবুও দু/একদিন সাইরেন বেজে উঠলে আমরা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতাম। আমি তখন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে সহকারী অধ্যাপকের পদে নিয়োজিত ছিলাম। ফলে, আমাদের “বাইরোটেশন” কলেজে ডিউটি করতে হয়েছিল। এ যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের কোনো ক্ষতি হয়নি এবং আমরাও কোনো ভয় পাইনি। এ যুদ্ধে মাত্র ১৭ দিন স্থায়ী হয়েছিল, সেপ্টেম্বর ৬, ১৯৬৫-থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫)।
তারপরই আরম্ভ হয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সনে ২৫ মার্চ থেকে এবং তা সমাপ্ত হয়েছিল ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর, অর্থাৎ প্রায় নয় মাস স্থায়ী হয়েছিল। এই নয়মাস আমাদের দুর্বিসহ জীবন কাটাতে হয়েছে। প্রতিমুহূর্তই ছিল মৃত্যুর ভয়। তখন মৃত্যু ছিল সেকেন্ডের ব্যাপার। তবুও কেন যেন এখনকার মতো বাংলাদেশের মানুষ ততো আতঙ্কিত হয়নি। সেই যুদ্ধে শহিদ হলেও সান্ত¦না ছিল। আমরা জোর গলায় বলতে পারতাম আমাদের মৃত্যুভয় নেই। আমি জীবন দিচ্ছি আমার মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য, মা-বোনের, মেয়ের সম্ভ্রম রক্ষার্থে, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য। এই যুদ্ধে প্রাণ হারালেও আমি হতাম শহিদ। এই ছিল তখনকার সান্ত্বনা বাক্য। তবে এখন মৃত্যু হলে কী বলবো। কোনো কিছু বলার কি আমাদের কিছু আছে? কে এই অদৃশ্য দানব? যার আক্রমণের ফলে সমগ্র বিশ্ববাসী আজ স্তম্ভিত, ভীত, সন্ত্রস্ত, আতঙ্কিত। সমস্ত পৃথিবীর কার্যক্রম একেবারে অচল এবং স্থবির, এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার। এটি আর কিছুই নয় অতি ক্ষুদ্র একটি ভাইরাস যার নামকরণ করা হয়েছে করোনা বা কোভিড-১৯। এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল, তবুও এর অস্তিত্ব আছে জীব কোষে। যার জন্য সমগ্র পৃথিবীতে তোলপাড় আরম্ভ হয়েছে এই ভাইরাসের উৎস খুঁজে বের করতে। এ ব্যাপারে সারা বিশ্বের বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসাবিদদের নিয়ে কিছু চিন্তা-ভাবনা চলছে, কিন্তু প্রথমে বাধ সেধেছিল চিন। তবে বর্তমানে মানব জাতিকে অপমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার জন্য পৃথিবীর সব দেশের সরকারই এগিয়ে এসেছে এবং এক যোগে কাজ করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ। বর্তমানে অবশ্য চিন নমনীয় মনোভাব প্রকাশ করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের আতঙ্কিত হওয়া, নানাবিধ কারণ আছে। বাংলাদেশে যখন এই করোনা ভাইরাসের প্রার্র্দুভাব ঘটে তার কয়েক দিনের মধ্যেই এক ভদ্রলোক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ছেলে, একজন ব্যাংকার। তাঁর বাবার মৃত্যু নিয়ে কিছু তথ্য ফেসবুকে আসে। সেখান থেকে প্রথম জানা যায় যে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তাঁর ভাগ্যে কী ধরনের বিড়ম্বনা ঘটেÑ তারই সংক্ষিপ্ত বিবরণ। তার ছেলের বক্তব্য ছিল নিম্নরূপ: “আমার বাবা অসুস্থ হওয়ার পর তাঁকে কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি করার চেষ্টা করেও সফল হতে পারিনি। তিনি যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সেটাও সেই মুহূর্তে জানা সম্ভব হয় নি। তবে চিনে প্রথম এই রোগটা ধরা পড়ে, আর আমরা চিনের প্রতিবেশী দেশ হয়ে ভবিষ্যতের চিন্তা করে অস্থির হয়ে পড়ি। যা হোক, কোনো এক প্রাইভেট হাসপাতালে তাঁর জায়গা হলো। আমার বাবাকে সেখানে নিয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ভর্তি করে ভেতরে নিয়ে গেলো। তারপরই সব শেষ। আমার বাবা অসুস্থ অবস্থায় দুর্বিসহ দিন কাটিয়েছেন। আমরা বাইরে থেকে কোনো কিছুই জানতে পারলাম না। শুনলাম, বাবাকে আই.সি.ইউতে রাখা হয়েছে, অবস্থা ভাল নয়। এই অসুখের কোনো চিকিৎসায় নেই। বেশি শ্বাসকষ্ট হলে ভেন্টিলেটর দিয়ে রাখা হয়। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বিশেষ নিরাপত্তা পোশাক পরিহিত ডাক্তার ও নার্সেরা মিলে বাবাকে কাফন পরিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো, তারপর কোনো এক অজ্ঞাত গোরস্থানে দাফন করা হলো। আমরা কোনো কিছুই দেখতে পারলাম না, বা জানতেও পারলাম না। কি মর্মান্তিক! কোনো ব্যক্তি প্রবাসী হলে, তাঁর বাবা, মা বা কাছের আত্মীয় স্বজন কেউ ইন্তেকাল করলে দূর-দূরান্ত অর্থাৎ আমেরিকা, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড থেকে বাবা মায়ের মরা মুখটা দেখার জন্য ছুটে আসে। লাশ হিমঘরে রেখে দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের এমনিই দুর্ভাগ্য যে, হাসপাতালের ভেতরে কি ঘটলো রোগী কি খেলেন, কি অবস্থায় তিনি মারা গেলেন ইত্যাদি কোনো কিছুই বুঝতে বা জানতে পারলাম না। এই দুঃখ আমাদের জীবন ভর বয়ে বেড়াতে হবে।” এই উচ্চ র্শিক্ষিত ব্যাংকার ভদ্রলোকের দুঃখ, কষ্ট, ব্যথা বেদনার সঙ্গে সহমর্মিতা ও সহানুভূতি প্রকাশ করা ছাড়া আমাদের কিই বা করার আছে। (চলবে)
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান,জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।