করোনা ভাইরাস : অদৃশ্য এক দানব

আপডেট: আগস্ট ১৫, ২০২০, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
রাস্তাা ঘাট ফাঁকা, গাড়ি চলাচল বন্ধ, তার মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটছে, মানুষ মারা যাচ্ছে (জুন মাসে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬১ জন), ইয়াবা চলাচলের ব্যবসা বন্ধ হয়নি। অস্বাভাবিক মুত্যু এখনও ঘটছে। মানুষের মধ্যে সব ভেদাভেদ ভুলে শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থানের বিষয়টি এখন দৃশ্যমান নয়। দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী যথাযথভাবে বিলি বন্টন হচ্ছেনা। ত্রাণের মাল চুরি থেকে রাহাই পাচ্ছে না। জনপ্রতিনিধিরা চরম পরীক্ষার সম্মুখীন। দেশ এবং দেশের মানুষের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখার এটি একটি মোক্ষম সময়। দুর্ভাগ্য তাদের মধ্যে এমন কোনো তৎপরতা দেখছিনা। তাঁদের উচিত হবে সবকিছু নিয়ে এবং সর্বশক্তি দিয়ে দুস্থ মানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখা। বরং ঘটছে তার উল্টোটা। বিনামূল্যে বিতরণের চালের বস্তা যেখান সেখানে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। এটা কি ধরনের আচরণ। জড়িতদের বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধি। কয়েক বস্তা চাল আত্মসাৎ করে তারা কতই বা লাভবান হবেন, আমাদের বোধগম্য নয়। এই চালের বস্তা আত্মসাতের দায়ে ইতোমধ্যে জনপ্রতিনিধির, অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন চেয়ারম্যান ও সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ধরনের নীতি বিগর্হিত কাজ এখনও চলতে আছে। তা কি কোনো দিনই বন্ধ করা যাবে না। আমি পূর্বেই বলেছি মানুষের খাসলত পরিবর্তন করা ততো সহজ ব্যাপার নয়। যেখানে সমগ্র পৃথিবী বিপদগ্রস্ত ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি, এর পরও কি মানুষকে নীতিবাক্য শেখাতে হবে? আমেরিকার মতো ধনী ও শক্তিধর দেশগুলো পর্যন্ত তাঁদের নিজ আচরণের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করছি না। সেখানে এ পর্যন্ত প্রায় সোয়া লক্ষেরও বেশি মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বড় অকালে প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের জন্য কোনো শোক, এমনকি উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখলাম না। পরবর্তীকালে অবশ্য তাঁরা দশদিনের শোক পালন করেছেন। এর মধ্যেই আবার পুলিশ কাস্টডিতে এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক করুণ মৃত্যুবরণ করেছেন, ফলে সমগ্র বিশ্বে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তা কিছুটা যেন মরার উপর খাড়ার ঘা এর মতোই অবস্থা মনে হচ্ছে। কেবলমাত্র টাকা দিয়েই সবকিছু করা যায় না এবং টাকা ও শক্তি থাকলেই সবকিছু হয় না। এবার নিশ্চয় পৃথিবীর জি-৭ দেশের নেতারা অনুধাবন করতে পেরেছেন, তারা কতইনা অসহায়, এই অদৃশ্য দানবের কাছে।
পরিশেষে বলতে চাই, সমগ্র বিশ্বে এতো বড় ধ্বংস যজ্ঞের পরও কি মানবজাতির হুঁশ হবে, তাদের আচর আচরণে কোনো পরিবর্তন আসবে, খাসলত বদলাবে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে মিলে মিশে বসবাস করার প্রবৃত্তি জাগবে, সকল ভেদাভেদ ভুলে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে, পৃথিবী নামের এই গ্রহে সকলেই কিছু না কিছু ত্যাগের বিনিময়ে হলেও সুখ শান্তিতে বাস করার প্রয়াসী হবে? এমন কোনো লক্ষণ তো চোখে পড়ছে না। এতো বড় ধ্বংসযজ্ঞ, আতঙ্ক, ভয়-ভীতি পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটেছে কিনা জানি না, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন যে এই দুর্যোগ, বিভীষিকাময় জীবন, এ যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পার্লহারবারে বোমা বর্ষণ, নাইন এলেভেন থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর। তাঁর মতো এ রকম লৌহমানবও ভীত সন্ত্রস্ত। ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর সমগ্র দক্ষিণ বাংলা জুড়ে যে নজির বিহীন ঘুর্ণীঝড় ও জলো”চ্ছ্বাস হয়েছিল, সেখানে প্রায় ১০ লক্ষ মানব সন্তান নিমিষেই প্রাণ হারিয়েছিল। গবাদি পশুর তো কোনো হিসাবই পাওয়া যায়নি। তখনও আমাদের স্বাভাবিক জীবনে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। বিশ্বব্যাপি কেবল শোকবাণী ও সহানুভূতি প্রকাশের তালিকা দীর্ঘ হয়েছিল। এর বেশি কিছু নয়। বর্তমানে পৃথিবীতে যা ঘটছে, তা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। বিশ্বে এক নজির বিহীন ঘটনা। এর থেকে মুক্তি পাওয়া ততো সহজ হবে বলে মনে হয় না। এই রহস্যময়ী রাক্ষসী করোনা ভাইরাসের আর্বিভাব হয়েছিল, সেই চীনে এবং তা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো দ্রুত গতিতে। আর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো পৃথিবীর যতসব বিত্তবান ও পরাক্রমশালী দেশগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ মহাদেশের বিত্তশালী দেশগুলো। জি-৭ অন্তর্ভ্ক্তু দেশগুলো কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে হাজার হাজার লাশের সারি আর হতভম্ব ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে লকডাউন ঘোষণা করে নিজেদের সব ঘরে আবদ্ধ রেখেছেন। এখন কোথায় তাঁদের দম্ভ, শক্তির বড়াই, বিত্তের অহঙ্কার, এই দানব সব কিছুকেই ম্লান করে দিয়েছে। কাজেই এই নশ্বর জীবনে এবং পৃথিবীতে বিত্তবান ও শক্তিধর দেশগুলোকে এই ধরাকে সরা জ্ঞান করা উচিত নয়। তাঁদের বর্তমান অসহায় অবস্থা সেটায় প্রামাণ করে। কাজেই তাদের বোঝা উচিত যে, দানবের উপরও দানব থাকতে পারে, যা বর্তমানে প্রমাণিত হলো। এই দৈত্য এতোই শক্তিশালী যে এর বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে পারছে না, চ্যালেঞ্জ করতে পারছেন না এবং পৃথিবীর যত শক্তিধর দেশ এই অদৃশ্য দৈত্যের কাছে মাথা নত করে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছে। মাথা তুলে দাঁড়াবার তাঁদের শক্তি, সামর্থ বা সাহস কোনটাই নেই। পৃথিবী ব্যাপি যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে, তা হয়তো বা ধনী দেশগুলো পুষিয়ে নিতে পারবে, কিন্তু সেই সব দেশের যে হাজার হাজার মূল্যবান প্রাণ অকালে এবং অসময়ে ঝরে গেলো, তার ক্ষতিপূরণ কি ভাবে দেবেন? এই বিষয়টি কি কেউ চিন্তা করে দেখেছেন? “অতি বড় হয়োনা ঝড়ে পড়ে যাবে, আর অতি ছোট হয়োনা ছাগলে মুড়ে খাবে”। এই প্রবাদ বাক্যটি প্রণিধানযোগ্য।
উপরের আলোচনা থেকেই এটাই প্রতীয়মান হয় যে, কোভিড-১৯ রোগের বাহক স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষ এবং মানুষের মাধ্যমেই এই রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে জনসমাগম বেশি, মানুষের যাতায়াত বেশি যেমন হাট-বাজার, ব্যবসা কেন্দ্র, পর্যটন স্পট এসব স্থানেই রোগী আক্রান্ত বেশি হয়েছে বলে পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়। এ নিয়ে গবেষণা করা হয়নি, তবে সামগ্রিকভাবে বলা যায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি, ঢাকা এবং এর আশে-পাশের জেলাগুলোতে অর্থাৎ ঢাকা বিভাগে। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এপর্যন্ত যত মানবসন্তানের মৃত্যু হয়েছে, তার অর্ধেকই ঢাকা বিভাগে থেকে। বাকী ২৫ শতাংশ চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে, আর বাকী ২৫ শতাংশ সমগ্র বাংলাদেশ থেকে। মৃত্যুর হার পুরুষ ৮০ শতাংশ মহিলা ২০ শতাংশ। ঢাকা বিভাগের মধ্যে ঢাকার আশেপাশের জেলা যেমন নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর থেকেই করোনা ভাইরাসের রোগী বেশি শনাক্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে নোয়াখালী, চাঁদপুর, এই দুটো জেলাতেই এই রোেেগর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। বরিশাল বিভাগ থেকে বরিশাল শহর ও আশেপাশের এলাকা থেকেই বেশি রোগী দেখা যাচ্ছে। রংপুর বিভাগে থেকে দিনাজপুর, ও রাজশাহী বিভাগ থেকে বগুড়ায় বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এই সব জেলাগুলোতে নাকি ব্যবসা বাণিজ্য খুব বেশি চলে, ফলে মানুষের যাতায়াতও বেশি। কাজেই ঢাকার মানুষের চাপ কমাতে না পারলে কোনো কিছুতেই সুফল বয়ে আনা সম্ভব হবে না। ফলে ঢাকায় প্রতিবার এসব দুর্যোগের কবলে পড়ে ক্ষতিগস্ত হবে অনেক বেশি।
দ্বিতীয়ত ঢাকাকে যানজট, মহামারী, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি থেকে মুক্ত করতে হলে ঢাকার জনসংখ্যা অবশ্য কমাতেই হবে এবং তার জন্য প্রয়োজন প্রশাসন ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ, অর্থাৎ বাংলাদেশকে অনতিবিলম্বে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করা ছাড়া কোনো বিকল্প দেখছি না। ১৯৮০ এর দশকে যখন মহকুমাগুলোকে জেলায় রূপান্তরিত করা হয়, তখনই আশা করা গিয়েছিলো যে, তৎকালীন চারটি বিভাগকে চারটি প্রদেশে উন্নীত করা হবে। দুর্ভাগ্য এখনও তা করা হয়নি। অথচ মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করার যে কনসেপ্ট এবং চিন্তা-ভাবনা তা কিন্তু বঙ্গবন্ধুরই সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফসল এবং তিনিই প্রথম সত্তরের দশকে ৬১ টি মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করে ৬১ জন জেলা গভর্নর নিয়োগ দিয়েছিলেন। কাজেই এই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই আমরা চারটি প্রদেশ দেখতে চাই। এতে করে ঢাকায় এই মানুষের জোয়ার আশা কিছুটা প্রশমিত হবে। প্রশাসনকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া সহজ হবে এবং সকল সুযোগ-সুবিধে তাঁরা ঘরে বসেই পাবেন। যত সুযোগ সুবিধা যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে, চিকিৎসা ব্যবস্থায়, কর্মসংস্থান, ভাল আয়-রোজগার, মেধা, সবকিছুই ঢাকায় কেন্দ্রিভূত, ফলে ঢাকার জনসমাগম কমানো সম্ভব হচ্ছেনা। চারটি প্রদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে গড়ে তুলতে পারলে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে। এতে করে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করা যাবে, ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। শ্রীলঙ্কা একটি ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে যদি এক ডজনের বেশি প্রদেশ থাকতে পারে, তা হলে বাংলাদেশের মতো একটি দেশকে চারটি প্রদেশে ভাগ করতে অসুবিধা কোথায়? আমাদের বোধগম্য নয়।
পুনশ্চ: পাঠকবৃন্দ এই প্রবন্ধে পরিসংখ্যান তেমন একটা ব্যবহার করা হয়নি। তার মূল কারণ হলো আমি লিখেই যাচ্ছি আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে শনাক্তের হার বেড়েই চলেছে। কাজেই কোথায় গিয়ে যে এর ইতি টানা সম্ভ হবে তাও বুঝে উঠতে পারছি না। আমিওতো আর অনন্তকাল ধরে লিখে যেতে পারি না। ফলে পরিসংখ্যান ব্যবহার না করেই এই লেখা শেষ করতে বাধ্য হলাম। [রচনাকাল মে, জুন, ২০২০]
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান,জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।