করোনা মহামারীতে চিকিৎসা ও অক্সিজেন সংকট দূরীকরণে পদক্ষেপ:

আপডেট: আগস্ট ১, ২০২১, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো সৈয়দ আলী (অব.):


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
উপজেলা হাসপাতালগুলোকে যে ভাবে সাজাতে হবে
জনবল : উপ-জেলা হাসপাতাল গুলোর জনবল ও বিছানা সংখা যেটা আছে সেটার ও সদ্ব্যবহার করতে হবে, আমি একটা সাধারণ প্রয়োজনীয়তা দেখাচ্ছি। যেটা প্রাধিকার বহির্ভূত হবে শুধু সে গুলি অ্যাডহক বিবেচনায় জনবল নিয়োগ এবং যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে হবে।
জনবল ও যন্ত্রপাতি নিম্নরূপ
১. একজন প্রশাসক / টিএইচএ, ২. একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ৩. একজন সার্জন, ৪. একজন অবেদন বিদ্যা বিশেষজ্ঞ, ৫. একজন গাইনোকোলজিসট, ৬. একজন দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ, ৭. চারজন মেডিকেল অফিসার, ৮. জনবলের প্রাধিকার /প্রশাসকের চাহিদামত নার্স / মেডিকেল অ্যাসিসট্যাঁন্ট / অপারেশন থিয়েটার অ্যাসিসট্যাঁন্ট ও অন্যান্ন পদের জনবল, ৯. নিচে আইসিইউ জন্য বিছানা, যন্ত্রপাতি , অ্যাম্বুলেন্স ও অক্সিজেন সরবরাহের চাহিদা দেখান হল। এর মধ্যে কিছু জমা থাকলে সেগুলি বাদ হয়ে যাবে।
• সাধারণ রোগিদের বিছানা ৩০টি ;
• এইচডিইউ বিছানা ৬ টি
• আই সি ইউ বিছানা ৪টি
• আই সি ইউ বিছানার সঙ্গে মনিটর ৪টি
• ভেনটিলেটর ৪টি
• ইন্ট্রাভেনাস ইনফিউসন পাম্প বড়দের ৪টি
• ইন্ট্রাভেনাস ইনফিউসন পাম্প শিশু দের ২টি
• ইটিটি (Endotracheal tube) বিভিন্ন আকার
• সিরিঞ্জ পাম্প
• সাকার মেশিন
• এনজি টিউব- নাজো-গাস্ত্রিক নল
• ইউরি নারি ক্যাথে টার- Indwelling Urinary Catheter (IDUC)
• অপারেশন থিয়েটারের জন্য একটি অ্যানেস্থেসিয়া মেশিন
• সর্বদা নিরবিছিন্ন অক্সিজেন সবরাহ করা
• দুটি অ্যাম্বুলেন্স
• পাওয়ার জেনারেটর
অক্সিজেন সরবরাহ : সিলিন্ডার অথবা অক্সিজেন প্ল্যান্ট হতে। অক্সিজেন প্ল্যান্ট হতে সরবরাহ করা উত্তম।
অথবা- মেডিকেল অক্সিজেন কনসেনট্রেটর চিনে তৈরি একটির দাম ৪৫০ মার্কিন ডলার।
উৎপাদন ক্ষমতা এক লক্ষ লিটার।
মেডিক্যাল পিএসএ অক্সিজেন জেনারেটর সিস্টেম।
২৪ ঘণ্টা নিরাপদ গ্যাস ব্যবহার, ১০০,০০০ (এক লক্ষ) ঘণ্টা কর্ম জীবন (সার্ভিস লাইফ)।
তবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠন করে উপজেলা হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা এবং কোনো ধরনের অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবরাহ, তাদের দাম এবং সব যাচাই বাছাই করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে হবে।
মার্চ ২০২০ বাংলাদেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হলেও শনাক্ত ও মৃত্যু অত্যন্ত কম ছিল। সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল ৬১, জানুয়ারি ২০২১ এ মৃত্যু নেমে আসে মাত্র ৫ এ। কিন্তু ফেব্রুয়ারি ২০২১ থেকে আবারো বাড়তে থাকে এবং ২৭ জুলাই ২০২১ এ সর্বোচ্চ মৃত্যু দাঁড়ায় ২৫১ এ। যা গত দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এখনই সুষ্ঠু ব্যবস্থা না নিলে অতি অল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ সংক্রমণ কমানোর সর্বোচ্চ পন্থা হল- সামাজিক দূরত্ব (একে অপরে ছয় ফুট দূরত্বে অবস্থান) বজায় রাখা, বাসায় অবস্থান করা, মুখমন্ডলে হাত দেয়া থেকে বিরত থাকা। ঘন ঘন সাবান পানি দিয়ে প্রতি বার অন্ততঃ ২০ সেকেন্ড যাবৎ হাত ধোয়া, কাপড়ের মাস্ক পরিধান করা।
জরুরি ভিত্তিতে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে কার্যক্ষম করতে হবে। বিশেষতঃ যে সব জেলার উপজেলাতে সংক্রমণ বেশি সে সব উপজেলাকে উপরে দেখানো যন্ত্রপাতি ও লোকবল নিয়োগ দিয়ে চালু করতে হবে।
২৬ জুলাই ২০২১ কোভিড-১৯ মহামারি ঠেকাতে চিকিৎসা ও অন্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে আরও চার হাজার ডাক্তার ও চার হাজার নার্স মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়োগ দানের প্রক্রিয়া শুরু করেছন, এতে স্বাস্থ্য সেবা আরও একধাপ এগিয়ে যাবে বলে সবার আস্থা বাড়ছে। এ ছাড়া ও যে সব হাসপাতালগুলিতে স্টাফের ঘাটতি আছে সেগুলিতে অ্যাডহক বা আপদকালিন নিয়োগ দেয়া ছাড়া ও মেডিকেল কলেজের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষের ছাত্র/ ছাত্রী এবং তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের নার্সিং কলেজ সমূহের ছাত্র-ছাত্রীদের দৈনিক কিছু ভাতা দিয়ে এবং তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করলে ভাল সাড়া পাওয়া যাবে। অনেকে কাজ করতে চায় কিন্তু তাদেরকে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নিতে হবে। যারা এই ভাবে কাজে যোগদান করতে চাইবে তাদের সকলকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইউনিয়ন এলাকাতেও আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ হতে ভ্যাকসিন প্রদান শুরু করতে এবং অতি শিগগিরই বাংলাদেশে করোনা ভ্যাকসিন উৎপাদনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সুতরাং ভ্যাকসিন প্রদান শুরু করলে আর ছেদ পড়বেনা এটাই আমাদের প্রত্যাশা। করোনা মহামারি ক্রান্তিলগ্নে যে সব জেলায় করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেছে সে সব জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোকে উল্লিখিত যন্ত্রপাতি সহ জনবল সরবরাহের ব্যবস্থা ও বিভিন্ন স্থানে করোনা ইউনিট চালু করলে বিভিন্ন শহরের উপর চাপ কমবে এবং চলচল সীমিত হওয়ায় সংক্রমণ ও ছড়াবে কম। আগামী দু’বছরের মধ্যে সব উপজেলা হাসপাতাল গুলোকে একই পর্যায়ে আনতে পারলে করোনা থাকবে কিন্তু মহামারি রূপধারণ করবে না এবং বাংলাদেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক নব যুগের সূচনা হবে।
যেহেতু সব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপজেলা হাসপাতালে থাকছে রোগিগণ কে শহরে আসতে হবে না। ৪/৫ জন মেডিকেল অফিসার ২৪ ঘণ্টা রুটিন মাফিক রোগী দেখবে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট রেফারড করবে। করোনা পরিস্থিতিতে দু’বছরের মধ্যে সব উপজেলা হাসপাতাল গুলো কর্মক্ষম করলে সব অপারেশন চলবে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন, আইসিইউ, এইচডিইউ ও অপারেশন থিয়েটার চালু থাকবে, আর প্রতি উপজেলাতে একটি সার্বক্ষণিক হাসপাতাল প্রয়োজন আছে। প্রতিটি উপজেলাতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ জনবসতি আছে। এ প্রসঙ্গে একটি উপজেলা উল্লেখ করা হল- যেমন রাজশাহী বিভাগের, রাজশাহী জেলা শহর হতে গোদাগাড়ী উপজেলার দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার। এর আয়তন ৭৬০ বর্গ কিলোমিটার, মোট জনসংখ্যা তিন লক্ষ তিরিশ হাজার নয় শত চব্বিশ জন। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বাস করে ৬৯৭ জন।
এই স্বাস্থ্য কেন্দ্র যদি সার্বক্ষণিক চালু থাকে তবে বত্রিশ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের রোগী বিশেষতঃ অন্তঃসত্তা রোগিদের গভীর রাতে শহরের হাসপাতালে আসতে হবে না। বাংলা দেশের ৪৯২ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অবস্থার চিত্র প্রায় এক। সুতরাং ৪৯২ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলি চালু করতে পারলে করোনা রোগির চিকিৎসা, সার্বক্ষণিক রোগি সেবা ছাড়াও যে কোনো ভবিস্য মহামারিতে কার্যকরি ভূমিকা পালন করবে এবং জাতি সংঘের Sustainable Devlopment Goal এ সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা Universal Health Coverage বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে।
লেখক: গবেষক, বি ইউ পি (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস) ঢাকা ১২১৬

sayedali1044@gmail.com