করোনা সংক্রমণের হটস্পটে পরিণত হওয়ার শঙ্কায় রামেক হাসপাতাল

আপডেট: এপ্রিল ২১, ২০২১, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

মাহাবুল ইসলাম:


করোনা সংক্রমণের হটস্পটে পরিণত হওয়ার শঙ্কায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। করোনা নিয়ে রোগি ও তার স্বজনের ভ্রান্ত ধারণা, স্বাস্থ্যবিধি মানতে অবহেলা, হাসপাতালের সার্বিক পরিষ্কার পরিছন্নতা ব্যবস্থায় ঘাটতি, করোনা ইউনিটে পরিচ্ছন্নতার বিশেষ ব্যবস্থা না থাকা, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অদক্ষতা ও আন্তরিকতার অভাব, দালাল ও রিপ্রেজেন্টেটিভদের দৌরাত্ম্য, সচেতনতামূলক কর্মসূচির অনুপস্থিতি, টিকা গ্রহণকারীদের ভিড়, জরুরি ওয়ার্ডগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড়সহ হাসপাতালের করোনা চিকিৎসার সার্বিক ব্যবস্থাপনার অভাবকেই এ জন্য দাযি করা হচ্ছে। চিকিৎসার সার্বিক দিক বিবেচনায় রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিট সদর হাসপাতাল (পুরান) স্থানান্তরের পরামর্শ দিয়েছেন হাসপাতাল পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম ইয়াজদানী।
ক্রমবর্ধমান করোনা পরিস্থিতির অবনতিতে রামেক হাসপাতালে প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে নতুন সংখ্যা। রাজশাহী জেলার একমাত্র করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হওয়ায় প্রতিদিন এখানে আসছেন করোনা রোগি। সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি করোনা রোগিদের বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রত্যাশায় জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগি আসছেন। আইসিইউ সুবিধা নেই এমন জেলাগুলো থেকেও রোগিদের রেফার্ড করা হচ্ছে বিভাগীয় শহরের এই হাসপাতালটিতে। কিন্তু ডেডিকেটেড এই হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি সংক্রমণ ঝুঁকিও বাড়ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নেই। উন্নত চিকিৎসার আশায় রোগিদের নেয়া হচ্ছে রাজশাহীতে। করোনা রোগি বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের তিন তলার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডটি করোনা ওয়ার্ড হিসেবে চালু করা হয়। তিনতলায় অবস্থিত এই ওয়ার্ডে রোগিদের যাতায়াতে লিফটসহ পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকায় ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। একারণে নতুন করে ২২ নম্বর ওয়ার্ডকে করোনা ওয়ার্ড ঘোষণা করা হয়। পর্যায়ক্রমে ১৬ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডকেও করোনা ওয়ার্ডের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানানো হয়।
অন্যদিকে, হাসপাতাল সংলগ্ন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ বুথে নেয়া হচ্ছে করোনার নমুনা। সুস্থ মানুষের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে নমুনা দিচ্ছেন অসুস্থরাও। শুধু নমুনা নয়- পৃথক বুথে দেয়া হচ্ছে করোনার টিকা। লাইনে দাঁড়াতে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা করছেন না অনেকেই। নমুনা দিতে আসা কিংবা করোনা চিকিৎসায় আসা রোগির স্বজনরা হাসপাতাল চত্বরেও অন্যদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। করোনা ওয়ার্ডের ভেতরে আক্রান্ত রোগির সঙ্গে খাওয়া দাওয়া সারছেন তার স্বজনরা। এদের কেউ কেউ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের ফুটপাতের খাবারের দোকানে বসে খাবারও খাচ্ছেন। রোগির স্বজনরা যাওয়া আসা করছেন রিকশা কিংবা অটোরিকশায়।
বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টার, ওষুধ কাউন্টার, প্যাথলজি টেস্টের কাউন্টারসহ ডাক্তারদের চেম্বারের বাইরে রোগিদের লম্বা লাইন। জরুরি বিভাগের অবস্থাও প্রায় একই। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড, বার্ন ওয়ার্ড, গাইনি ওয়ার্ড, নিউরোমেডিসিন ওয়ার্ডসহ আরো কয়েকটি ওয়ার্ডে রোগি ও স্বজনদের ঠেলাঠেলি। ওয়ার্ডগুলোতে বেড না পেয়ে বারান্দায় অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।
রামেক হাসপাতাল সূত্রমতে, দিনে অন্তত সাড়ে তিনশো থেকে চারশো রোগি হাসপতালে ভর্তি হন। তাদের সঙ্গে স্বজন আসেন আরো ৫ শতাধিক। হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন এক হাজার থেকে দেড় হাজার। সব মিলিয়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার লোকের আনাগোনা হয় হাসপাতালে। আর এসব রোগিদের অধিকাংশই এসেছেন এই অঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়েও তাদের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। কর্তৃপক্ষের টাঙানো নির্দেশনাও মানছেন না তারা। এতে হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক, নার্স এবং চিকিৎসা কর্মীদের সংক্রমণ শঙ্কা বাড়ছে। নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে সংক্রমণ ঝুঁকির শঙ্কা প্রকাশ করে রামেক হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম ইয়াজদানী জানান, তারা রোগি ও তাদের স্বজনদের স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। মাইকিং করে লোকজনকে সচেতন করছেন হাসপাতালের কর্মীরা। কিন্তু লোকজনকে এই নির্দেশনা মানানো যাচ্ছে না। করোনার সংক্রমণ নিয়ে তারা সচেতন হচ্ছেন না।
তিনি আরো জানান, রামেক হাসপাতালকে সেইভাবে সংক্রমণের হটস্পট বলা না গেলেও সংক্রমণ ঝুঁকি কম নয়। তবে হাসপাতালের আশেপাশের এলাকাগুলো থেকেই সংক্রমণের শঙ্কা বেশি। আর সম্ভবত করোনা একেবারে চলেও যাবে না। রূপ পাল্টিয়ে অন্যান্য রোগের মতো থেকেও যেতে পারে। রামেক হাসপাতালে করোনা রোগিদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে অন্যান্য চিকিৎসায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে। করোনা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে থাকলে হাসপাতালে জায়গাও পাওয়া যাবে না। তাই সার্বিক দিক বিবেচনায় সদর হাসপাতালে করোনার ইউনিট স্থানান্তর করার পরামর্শ দেন তিনি। যেখানে গিয়ে হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সরা চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন।
তিনি জানান, রামেক হাসপাতালে জনবলের সংকট আছে। ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের তারা নিয়োগ দিচ্ছেন। কিন্তু করোনা ইউনিটে ১৫ দিন কাজ করার পর- পরের ১৫ দিন কোয়ারেন্টিনে দিতে হয়। এতে করোনা ওয়ার্ডে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে সামনে এসব সমস্যা থাকবে না। আর অন্যান্য সময়ের চেয়ে হাসপাতালের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় জোর দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।