কর্তৃত্বের নয়, কর্তার অধিষ্ঠান হোক

আপডেট: এপ্রিল ৯, ২০১৭, ১১:৫২ অপরাহ্ণ

নরেশ মধু


অনার্য সমাজ ব্যবস্থার ক্রম পরির্বতন ও আর্য সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তনের সাথে সাথে ধর্ম ও সমাজপতিদের মধ্যে অন্তদ্বন্দ্ব, অন্তঃকলহ এবং মতবিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নেয়। সাধারণ মানুষ দলে দলে ভাগ হতে থাকে। এ মতবিরোধ বা অন্তঃকলহ মূলত ধর্ম ও সমাজপতিদের ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই। এরপর এর নানা কারণ জুড়ে এটাকে। এরা ভারি করে তোলে এবং এক পর্যায়ে সংর্ঘষে রূপ নেয়। এই বাংলার এবং  পাবনার ধর্মগুরু শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র বলেছেন, ভারতের অবনতি তখন থেকেই শুরু হয়েছে যখন থেকে ঋষিকে বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপসানা শুরু হয়েছে। আজকে মঠ, মন্দির, গির্জা যেখানেই একটু গভীরে প্রবেশ করুন সেখানেই দ্বন্দ্ব, সেখানেই আদর্শকে নিয়ে নয়, আদর্শের অন্তরালে ক্ষমতা বা ব্যক্তির প্রাধান্যকে ঘিরেই দ্বন্দ্ব আবর্তিত।
পাবনা জেলা শহরের কোল ঘেষে পদ্মা বিধৌত পলি মিশ্রিত পূণ্য মাটি হেমাইতপুরে জন্মগ্রহণ করেন অনুকূল চন্দ্র। পিতা নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মাণ শিবচন্দ্র এবং সতীসাধ্বী মা মনমোহিনী কোলে হেসে খেলে পদ্মার বালুকা বেলায় দিনে দিনে বড় হন। এবং সাথে সাথে তার আধ্যত্ম চেতনার উন্মেষ ঘটে। মায়ের কাছে দীক্ষা নেন। ক্রমে জীবন বোধের কোণে জমে উঠে মানবকল্যাণের মহামন্ত্র। প্রতিষ্ঠা করলেন সৎসঙ্ঘ। প্রতিষ্ঠানের নামের ব্যাখ্য করে তিনি বলেছিলেন ’সৎ ও সংযুক্তির সহিত তদগতিসম্পন্ন যারা তারাই সৎসঙ্গী। এবং তাদের মিলনক্ষেত্র হল সৎসঙ্গ।’ শুরু হল মানুষ তৈরির আবাদ।
আজকের লেখা দুটো বিষয়কেই ঘিরে। এক. ঋষিকে বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা, ২. সৎ ও সংযুক্তি। ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র বরাবরই যুদ্ধ করেছিলেন এই দুটোকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং এই দু’টোকে প্রতিষ্ঠার জন্য আনুসঙ্গিকতার আরো আরো উপকরণ জড়ো হয়। অর্থাৎ জীবন মানে- বাঁচা এবং বর্ধন। ইংরেজিতে তিনি বলেছেন-নবরহম ধহফ নবপড়সরহম.” এবং এর জন্য তিনি চারটি মৌলিক স্তম্ভ নির্মাণ করেন। তিনি শিক্ষা , কৃষি, শিল্প, ও সুবিবাহ এই চারটি স্তম্ভের মধ্য দিয়ে নবরহম ধহফ নবপড়সরহম.” এর লড়াইটা শুরু হয়। এবং সেটি সৎ-এর সাথে সংযুক্তির মধ্য দিয়ে। সেখানে কোন বাদের সাধনার কথা বলেনি। ঠাকুর গড়ে তুলেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প প্রতিষ্ঠান, বিশ্ব বিজ্ঞানাগার, মাঠের পর মাঠ কিনেছেন কৃষি সংস্কারের জন্য। আর সুবিবাহ আন্দোলন ছড়িয়ে দিলেন তার আর্দশের বার্তাবাহী ঋত্বিক পরিষদ দিয়ে। শুরু করলেন মানুষ গড়ার আন্দোলন এবং সেটা পরিবারকে কেন্দ্র করেই। আজকের উন্নয়ন গবেষকরা বলেছেন বিশ্ব শান্তির শেকড় হল পরিবার। এবং পরিবারে শান্তির মূল মন্ত্র হল সুবিবাহ। এই আন্দোলনে সামিল হলেন অবিভক্ত বাংলার তাবড় তাবড় রাজনিতীক ও ধর্মীয় চিন্তাবিদরা। পাবনার হিমাইতপুরকে ঘিরে শুরু হল এক মহাআন্দোলন। আন্দোলনের ঢেউ বাংলার গ-ি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়লো দেশ বিদেশে।
১৯৪৬ , ১ সেপ্টেম্বর  শারীরিক সুস্থতার জন্য ভারতের দেওঘরে অবস্থান করেন। এবং রাজনৈতিক মেরুকরণে অবিভক্ত বাংলা ভাগ হল। জন্ম হল পূর্ব পাকিস্তানের। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি তাঁর সাধের জন্মভূমিতে ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেও আসা সম্ভব হয়নি। তিনি ফিরে না আসায় তাঁর রেখে যাওয়া বসতবাটি, আশ্রমসহ ২ শতাধিক বিঘা জমি সরকার অধিগ্রহণ করে সেখানে ১৯৫২Ñ১৯৫৭ সালের মধ্যে মানসিক হাসপাতাল গড়ে তোলে। উল্লেখ্য যে, এই অধিগ্রহণকৃত বিপুল পরিমাণ জমির জন্য কোন ক্ষতিপূরণ, অর্থ শ্রীশ্রীঠাকুর বা তাঁর কোন উত্তরসুরি বা তার অনুসারিগণ গ্রহণ করেননি। যা আজও সরকারি কোষাগারে জমা আছে। ফিরে আসা হল না পদ্মার পাড়ে। তৎকালীন সরকার তার পার্থিব সম্পত্তি অধিভুক্ত করে নিলেন। গড়ে তুলে মানসিক হাসপাতাল। মানসিক হাসপাতলের বুকে এখনও বিদ্যমান বিশ্ব বিজ্ঞানের ভগ্ন ও জীর্ণশীর্ণ অবকাঠামো। তার স্মৃতি বিজিড়িত বাসস্থান এখন ছাত্রী নিবাস।
নতুন দেশ নতুন করে আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে আবার শুরু হল সৎসঙ্গ আন্দোলন। যেহেতু পাবনায় তখন ঠাকুরের কোন স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি নেই তখন এই আন্দোলন শুরু হয় নতুন করে এবং কোন রকম কিছু জমি কিনেন ঠাকুরের তার পিতৃ ও মাতৃ মন্দিরের কোল ঘেষে। অপরদিকে পাকুটিয়ায় একটি শাখা সৎসঙ্গের কাজ শুরু হয়। যদিও ঠাকুরের নির্দেশ হিমাইতপুরকে ঘিরে সব কিছু করার জন্য।
প্রথমদিকে হেমাইতপুর ও পাকুটিয়া যৌথভাবেই  তৎকালীন পাকিস্তানে সৎসঙ্গ আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে ঠাকুর পার্থিব জগতের অন্তরালে চলে গেলেন এবং শুরু হল উত্তারিধকার প্রশ্নে  বিরোধ। বিরোধের ঢেউ বঙ্গভুমিকেও ভাগ করল। পাবনা ও পাকুটিয়া আদর্শিক নয় লৌকিক আধিপত্যের প্রশ্নে মতবিরোধে জড়িয়ে। এবং এই বিভেদকে শক্ত করার জন্য বিভিন্ন আদর্শিক মতভিন্নতার সূত্রপাত করেন। যা আজকে ঋষিকে বাদ দিয়ে ঋষিবাদের লালন চলছে। চলছে আইনি লড়াই। এবং মতবাদকে প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন নতুন মতবাদের জন্ম দিচ্ছে। ধর্ম যেখানে বিশ্বাসের বিষয় সেখানে যুক্তির কোন স্থান নেই। অথচ সেই বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে যুক্তির আইনি লড়াই যা ঠাকুরের সেই অমোঘ বাণীরই সত্যতা প্রকটমান।
প্রতিটি মহামানব বা অবতার পুরুষ যখন যেখানে আবির্ভুত হন সে স্থানই পরমতীর্থ হিসেবে সমাদৃত। এই তীর্থভূমিকে ঘিরেই যা-কিছু সব গড়ে ওঠে ও প্রচারিত হয়। পবিত্র মক্কা, জেরুজালেম, নবদ্বীপ, মথুরা-বৃন্দাবন প্রভৃতি জলন্ত উদাহরণ। বিশ্বের অগণিত ভক্ত-সাধারণের কাছে হিমাইতপুর পরমতীর্থ। তাই ঠাকুরের পুণ্য জন্মস্থানটুকু পূর্ণ মর্যাদায় সংরক্ষণের নিমিত্তে হিমাইতপুর সৎসঙ্গকে প্রত্যর্পণের জন্য পাকিস্তান আমল থেকেই ‘হিমাইতপুর সৎসঙ্গ’ তৎকালীন সরকার প্রধানদের নিকট আবেদন-নিবেদন করে আসছেন।
বর্তমান সদাশয় সরকার ধর্মীয় বিবেচনায় শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকল চন্দ্র সৎসঙ্গের আবেদনের প্রেক্ষিতে ০.১৫ একর জমি প্রত্যার্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বাদ সাধলেন মতবাদের লড়াই। হিমাইতপুর বনাম পাকুটিয়া মতাদর্শ লড়াইয়ে পবিত্র জন্মস্থানটুকু যা সরকার প্রর্ত্যাপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা স্থগিত রয়েছে। দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্তের আবেগকে উপেক্ষা করে এবং ঠাকুরের সেই অমোঘ বাণী- ‘হিমাইতপুরকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমান মিলিতভাবে সবকিছু করগা’- অবজ্ঞা করে কর্তা নয় কর্তৃত্বের লড়াইয়ে যুদ্ধে নেমেছেন দুটি পক্ষ। পরমতীর্থ দুটি দলের কাছেই সমান গুরুত্ব। সুতারং কর্তৃত্বের নয় কর্তার অধিষ্ঠান হোক, জয় হোক বিশ্বভ্রাতৃত্বের।
লেখক: সাংবাদিক