কলিতেই ঝরে গেল যে ফুল, শিশু শেখ রাসেল

আপডেট: অক্টোবর ১৮, ২০২১, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ


এস এম তিতুমীর:


একটি কলি অপার সম্ভাবনা নিয়ে ফুলে পরিণত হয়, রঙ-রূপ সুরভি ছড়িয়ে শেষে নিজ প্রজন্ম টিকিয়ে রাখতে ফলে পরিণত হয়। কিন্ত সে কলি যদি অকালেই ঝরে যায় তাহলে তার যতো সম্ভাবনা তা সবই শেষ হয়ে যায়। যে পৃথিবীর স্বার্থ কী তা বোঝেনি, বোঝেনি সামান্যতম ষড়যন্ত্র। সে তো নিষ্পাপ। অথচ একাত্তর পরবর্তী এদেশীয় স্বাধীনতা বিরোধী দোষররা ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু-পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্য্য করা হয়। বাদ যায়নি ছোট্ট শিশু রাসেলও। যারা এই নিষ্ঠুর হত্যা ঘটালো তাদের হাত একটুও কাঁপেনি। তারা মানবিক বিবেকের বলি দিয়ে ঘৃণ্য স্বার্থকে চরিচার্থ করার হীন ক্রিয়াকে উদ্যত করেছিলো। কিন্তু অপরাধ কখনো অপরাধীকে নিরাপদ করে না। সে একসময় আইনের হাতে ধরা পড়েই পড়ে। আমরা হত্যাকারিকে ধিক্কার জানাই। একটা শিশু ফুলে মত। তার কোনো অপরাধ থাকতে পারেনা। কিন্তু তাকেও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে এ হীন হত্যযষ্ণ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক বছর পার হয়ে গেছে। শিশু সুরক্ষায় প্রণয়ন করা জাতীয় শিশু সুরক্ষা নীতি ২০১১ সালের পর ২০১৩ সালে করা হয় শিশু আইন। এই আইন মোতাবেক বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, অর্থাৎ ৭০ মিলিয়ন জনসংখ্যাই শিশু বলে অবিহিত করা হয়েছে। দন্ডবিধির ৮২ ধারা মোতাবেক ৯ বছর পর্যন্ত কোনো শিশু অপরাধ করলে সে ‘কোনো অপরাধ করেনি’ বলে ধরে নেয়া হবে এবং দন্ডবিধির ৮৩ ধারা মোতাবেক ৯ থেকে ১২ বছরের শিশু যদি অপরাধ করে, তার বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করে যদি অপরাধ জ্ঞানের পরিপক্বতা পাওয়া যায়, তবেই সে শিশু আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী বলে গণ্য হবে। আর শিশু আইন ২০১৩ এর ২৬। (১) বিচারকালীন শিশুকে নিরাপদ হেফাজতে রাখার বিষয়টি সর্বশেষ পন্থা হিসাবে বিবেচনা করিতে হইবে বলে মত দেয় হয়েছে। কিন্তু যে শিশু তখনো কোলে দোলে তাকে হত্যা করার মানসিকতা শুধু নারধমেরই হতে পারে। একটু পিছু ফিরে যেতে চায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ শীর্ষক স্মৃতিচারণে লিখেছেন -‘ একটানা ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি বন্দি ছিলেন। সেই সময় আমাদের দই ভাইবোনকে আমার মা দাদা-দাদির কাছেই থাকতেন। একবার একটা মাললা উপলক্ষ্যে আব্বাকে গোপালগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়। কামাল তখন অল্প অল্প কথা বলা শিখেছে। কিন্তু আব্বাকে ও কখনো দেখেনি, চেনেও না। আমি যখন বার বার আব্বার কাছে ছুটে যাচ্ছি ‘আব্বা আব্বা’ বলে ডাকছি ও শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। গোপালগঞ্জ থানায় একটি বড় পুকুর আছে, যার পাশে আছে বড় খোলা মাঠ। ঔ মাঠে আমরা দুই ভাইবোন খেলা করতাম ও ফড়িং ধরার জন্য ছুটে বেড়াত। আর মাঝে মাঝেই আব্বার কাছে ছুটে আসতাম। অনেক ফুল পাতা কুড়িয়ে এনে থানার বারন্দায় কামালকে নিয়ে খেলতে বসেছি। ও হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘হাসু আপা তোমার আব্বুকে আমি একটু আব্বু বলি’ বেগম মুজব তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, বিনা বিচারে বন্দি থাকতে হলে ছেলে তো বাবাকে ভুলবেই। বাবার আদর সোহাগ কী জিনিস ছেলেটি বুঝতেই পারলো না। প্রতি দুই সপ্তাহ পর একবার বেগম মুজি ছেলেমেয়েদের নিয়ে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন জেলে। সঙ্গে শিশু রাসেলও থাকত। রাসেল একবার বাবার কোলে আবার তার মায়ের কোলে, একবার টেবিলের ওপর উঠে বসে। বঙ্গবন্ধু রাসেল সস্পর্কে লিখেছেন-‘৮ই ফেব্রুয়ারি ২ বছরের ছেলেটা এসে আমকে বলে, আব্বা বাড়ি চলো’ কী উত্তর ওকে আমি দেব। ওকে বোঝাতে চেষ্ট করলাম। ওতো বোঝে না আমি কারবন্দি। ওকে বললাম, তোমার মায়ের বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো। এক সময় সে তার মাকে বাবা ডাকা শুরু করলো।’ ১৯৬৭ সালের ১৫ই জুন বেগম মুজিব ছেলেমেয়েদের নিয়ে জেলে এসেছেন দেখা করতে। তাঁকে খবর দেয়া হলো। তিনি আসতেই শিশু রাসেল তাঁকে গলা জুড়িয়ে ধরে হাসেন। রাসেল জেলকে বলে আব্বার বাড়ি।’ শিশুহত্যার ব্যপারে মাননীয় শেখ হাসিনা বলেন, – যারা শিশু হত্যা করে তারা সমাজের সবচেয়ে ঘৃণ্য জীব। যারা এমন কাজ করে তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিৎ। বাংলাদেশ ফৌজদারি দন্ডবিধিতে ইচ্ছাকৃত নরহত্যায় বলা আছে মৃত্যুদন্ড (৩০২ ধারা)। শিশুহত্যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য না। শিশুরাই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। শিশু মনোবিজ্ঞানী হ্যারল্ড এস হ্যালবার্ট বলেছেন, ভালোবাসা কী বিষয় তা শিশুরা বুঝে ওঠার আগেই শিশুদের ভালোবাসা দিতে হবে। কিন্তু শিশু রাসেল সে ভালোবাসা বুঝে ওঠার আগেই অকালে ঝরে গেল। আর সেই হত্যাকান্ড দেশ-জাতির কপালে কলঙ্ক তিলক এঁকে দিয়েছে। সে দিনের সে শোক যতোদিন বাংলাদেশ থাকবে ততোদিন বইতে থাকবে প্রবহমান স্রোতধারার মত। শেখ রাসেলের বিদেহী আত্মা অনন্ত শান্তিতে থাকুক পরপারে।