কাকলী সংগীত বিদ্যালয় ও বড় ভাইদের কথা

আপডেট: এপ্রিল ৩, ২০২১, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

খন্দকার মো. আব্দুস সামাদ:


১৯৬৮-৬৯ সালের কথা। আমার এক বিএসসি স্যার আব্দুর রাজ্জাকের কথামত তদানিন্তন রেডিও পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশ বেতার, রাজশাহীতে কন্ঠস্বর পরীক্ষা দিলাম। স্যার এখন আর বেঁচে নেই। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। স্যারই ইংরেজিতে দরখাস্তটি লিখে দিয়েছিলেন। যথাসময়ে অডিশন কার্ড আমার ঠিকানায় পেলাম এবং নির্দিষ্ট দিনে যথা সময়ে কন্ঠস্বর পরীক্ষা দিলাম। কিন্তু হায়। পাস জুটলোনা। বুথ থেকে যাঁরা কন্ঠস্বর পরীক্ষা নিচ্ছিলেন তাঁদের একজন ওস্তাদ আব্দুল জাব্বার এবং অন্যজন মানসুর আল ফারুকী (বর্তমানে উভয়েই মৃত)। ফারুকী সাহেব অনুষ্ঠান সংগঠক ছিলেন।
Audition এর প্রাক্কালে বুথে ডেকে নিলেন জনাব মানসুর আল ফারুকী। আমার গায়ে হাত দিয়ে আদর করে বললেন, ‘তোমার কন্ঠস্বর ভাল। ভাল গেয়েছো। তবে কিছু ভুল-ত্রুটি আছে, তালে ভুল করেছো। যাহোক, তুমি নিয়মিত সংগীতের ক্লাস করো। রেডিওতে সংগীত শিক্ষার আসর হয়। এই আসরে তুমি প্রতি সপ্তাহে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।’ আমি বললাম, ‘জি স্যার!’ তিনি বললেন ‘ওই যে দেখছো না! উনি ওস্তাদ আব্দুল জব্বার। উনি তোমাকে গান শেখাবেন। প্রতি সপ্তাহে তুমি এখানে এসে গান শিখবে কেমন?’ আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘জি স্যার।’ শুরু হলো আমার সঙ্গীতের পথচলা। এই মুহূর্তে দু’জনেরই কথা মনে পড়ছে। তাঁদের দু’জনকেই পাক রাববুল আলামিন জান্নাতবাসি করুন। এবার আসল কথায় আসা যাক। অর্থাৎ ‘কাকলী সংগীত বিদ্যালয়ের কথা: বড় ভাইদের কথা।
নিয়মিত সঙ্গীত শিক্ষার আসরে গান শিখতে আসতাম। প্রায় বছর খানেক পর স্বর্গীয় ওস্তাদ শীবনাথ দাস (বংশীবাদক) একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘তুমি এখানে সঙ্গীত শিক্ষার আসরে গান শিখছো, ক্লাস করছো কর। তবে, তুমি কোনো এক সঙ্গীত বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যাও। তাহলে তোমার শিক্ষার মানটা আরো উন্নত হবে।’
স্বর্গীয় শীবনাথ দাসের কথা মত, আমি কাকলী সংগীত বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। সঙ্গীত বিদ্যালয়টি ছিল ঘোড়ামারা পোস্ট অফিসের সম্মুখে পশ্চিম পাশের্^র দোতালায়। তখন ক্লাস নিতেন শেখ আব্দুল আলীম। শ্যামলা রঙের বেশ লম্বাচওড়া মানুষ। মুখে সব সময় হাসি লেগেই থাকতো। রাজশাহী বেতারের সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন।
আমি বড় কষ্ট করে সুদূর দামকুড়াহাট ফুলবাড়ী গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে- কোনোদিন ট্রেনে আবার কোনোদিন ঘোড়ার গাড়ি বা টমটমে চড়ে আসতাম এবং ক্লাস করতাম। গাড়ি ভাড়া না থাকায় প্রায়ই হেঁটে আসতে হতো। কিছুদিন ক্লাস করার পর তা বন্ধ হয়ে গেল। অভাব-অনটনের দরুন মাসিক বেতন দিতে পারতাম না।
আমার এই দুঃখের কথা শুনে আমার যাঁরা সিনিয়র ভাইয়েরা ছিলেন, তাঁরা বললেন ‘তুমি আসদে থাকো, ক্লাস করো। তোমাকে বেতন দিতে হবে না। বেতন মওকুফ করার ব্যবস্থা করে দেবো।’ যাহোক আশ্বস্ত হলাম। আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। বড় ভাইয়েরা ছিলেন নাট্যজন আব্দুর রউফ ভাই। চলচ্চিত্র তথা টেলিভিশনের শিল্পী অবসরপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক আবদুল আজিজের বড় ভাই ছিলেন রউফ ভাই। এম. সাদেকুর রহমান (সাদেক ভাই) আশফাকুল আশেকীন, খালিদ জামিল শেলু ভাই (তবলা বাদক)। স্কুলেও তিনি তবলাবাদক ছিলেন। বর্তমান তিনি বাংলাদেশ বেতারের আধুনিক গানের শিল্পী। এখানে উল্লেখ্য এই কাকলী সংগীত বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা কিন্তু পল্লীগীতির শিল্পী- আব্দুল আজীজ সরকার। রাজশাহী বেতারে পল্লীগীতি পরিবেশন করতেন। এই বিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্র ছিলেন জনাব আব্দুল খালেক ছানা এবং জনাব হাবিবুর রহমান লাবু। বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর আধুনিক গানের শিল্পী, সংগীত প্রযোজক ও গীতিকার।
১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধের বছর। বস্তুতঃ উল্লেখ করার মত কিছু কথা বলে রাখি। আমি তখন থেকেই গান লিখতাম। তালিকা ভুক্তি হইনি। তখন চুপি চুপি রেডিওতে গান শুনতাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের। আর দেশের গান লিখতাম, কবিতাও লিখতাম। মনে আছে কয়েকটি কবিতার চরণ-
“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উজ্জ্বল এক মুখ খান।
বাংলাদেশের স্থপতি। জাতির পিতা-তুমি
আবহমান বাংলার প্রাণ।
বঙ্গবন্ধু তুমি বঞ্চিত, শোষিত নিপীড়িত
মানুষের চোখের মণি
এখনো শুনতে পাই যেদিকে চাই
তোমার কন্ঠের বজ্রধ্বনি।
বঙ্গবন্ধু তুমি কৃষকের মুখের স্বর্ণালী সুন্দর হাসি।
তুমি সকলের মনে অবিনাশী বিশ্বাস
তল্লা বাঁশের বাঁশি।
অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা আর রক্ত ঝরার পর মহান মুক্তিযুদ্ধের অবসান ঘটল।
জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী আহ্বানে, আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম। দেশ পেলাম। লাল সবুজের গর্বিত পতাকা পেলাম। যাঁরা মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন তাঁদের সবার প্রতি আমার বিনম্র ভক্তি সালাম এবং আত্মার মাগফিরাত কামরা করছি।
স্বাধীনতার পর কাকলী সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থানান্তরিত হলো পাশেই বেলদারপাড়া মোড়ের দিকে। আবার নতুন করে সঙ্গীত চর্চা শুরু করলাম। সেখানে পেলাম আগের যারা ছিলেন। নতুন করে পেলাম একজন স্কুল শিক্ষক জনাব আনোয়ার হোসেনকে। তিনি হৃদয়বান মানুষ ছিলেন। তিনি আমাকে প্রেরণা দিতেন। এমনকি গানের খাতাও কিনে দিয়েছেন। সেখানে পেলাম বাধন ভাইকে। পেলাম স্বনামধন্য গীতিকার, অনুষ্ঠানে সংগঠক বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর জনাব আনোয়ারুল আবেদীনকে। পেলাম মেরাজউদ্দীন ভাইকে। মাঝে মাঝে ওস্তাদ শেখ মোজাম্মেল হোসেনের পুত্র ওস্তাদ রবিউল ইসলামকে পেয়েছি।
বাংলাদেশ ব্যাংক (রাজশাহীর) কর্মকর্তা জনাব শহীদুল ইসলাম ভাই খুব আন্তরিক মানুষ ছিলেন। খুব যতœ সহকারে গানের ক্লাস নিতেন। ওস্তাদ শেখ মোজাম্মেল হোসেন এর পরিবর্তে এসএম সাদেকুর রহমান সাদেক ভাই, শহীদুল ভাই, বাধন ভাই, মেরাজ ভাইও ক্লাস নিতেন। খালেদ জামিল শেলু ভাই তখন তবলা বাজাতেন। তাঁর হাত খুবই মিষ্টি ছিল। একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন আর তা হচ্ছে
মাঝে মধ্যে আমি বাড়িতে ফিরতে না পারলে বড় ভাই এ.এম সাদেকুর রহমান (সাদেক ভাই) এর হোসনীগঞ্জের বাসাতে রাত্রি যাপন করতে হতো। সাদেক ভাই বর্তমান তাঁর নিজবাসা শালবাগানের কাছাকাছি কোনো এক জায়গায় বাস করেন স্ত্রি কন্যা সন্তানদের নিয়ে। আমি কিছুদিন তাঁর মেয়েকে গান শিখিয়েিেছ। জনাব সাদেক ভাই আমাকে খুবই সহযোগিতা করেছেন। শেখ আব্দুল আলীম ও ব্যাংকার শহীদুল ভাইও। এখন এঁদের অনেকেই আর বেঁচে নেই।
স্মৃতি সত্যই বেদনাদায়ক। স্মৃতির অতলে কত কথা যে লুকানো থাকে। আহারে! বলতে বড় কষ্ট লাগে! স্মৃতির অতলে যখন প্রবেশ করা যায় তখন দু চোখ বেয়ে জল ঝরে। স্বনামধন্য গীতিকার এবং অনুষ্ঠান সংগঠক শ্রদ্ধেয় আনোয়ারুল আবেদন (সম্পর্কে মামা শ্বশুর) একদিন বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর ডিউটি রুমে বসে আছেন। তখন সংগীত শিক্ষার আসরে গান শিখাতেন আমার ওস্তাদ আব্দুল আজীজ বাচ্চু। তিনি অবসরে যাওয়ার প্রাক্কালে আমাকে এসে বললেন, ‘সামাদ তুমি এখন থেকে সংগীত শিক্ষার আসরে গান শিখাবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের PO.PP. ARD কে বলা হয়েছে। আমি ঢাকায় যাবো। আর আমার মেয়ে (সামাকে বাসায় গিয়ে গান শিখাবে)।’
আমি খুবই খুশি। এত বড় দায়িত্ব ওস্তাদজি আমাকে দিলেন। সেই মুহূর্তে ডিউটি রুমে জনাব আনোয়ারুল আবেদীন বসা ছিলেন। আমি বললাম, ‘সঙ্গীত শিক্ষা আসরের জন্য একটি গান লিখে দেন।’ সত্যি সত্যি- তাৎক্ষণিক একটি গান লিখে দিলেন। গানের কলি: ‘ঝিরিঝিরি বৃষ্টির পরাগ মেখে।’ যাহোক গানটি সুর করলাম। মাসব্যাপী সংগীত শিক্ষার আসরে গানটি ছাত্র/ছাত্রীদের শেখানো হলো।
একদিন আরোয়ারুল আবেদীন মামার স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠানে ডাক পড়লো। ডাকলেন, আশফাকুল আশেকীন মামা অর্থাৎ দু’ জন জমজ ভাই। পদ্মারঙ্গ মঞ্চে- সবাই স্মৃতিচারণ করলেন। আমিও সুযোগ পেলাম। স্মৃতি চারণ করলাম। তাঁকে স্মরণ করলাম কৃতজ্ঞতায়, শ্রদ্ধায়। সেই সংগীত শিক্ষার আসরে শেখানো তাঁর লেখা গানটিও গাইলাম। সঙ্গীতে সঙ্গীতে আবেগে আপ্লত হয়ে পড়েছিলাম। ধ্রুব টিভিেিত সার্চ দিলে গানটি পাওয়া যাবে। ‘ঝিরিঝিরি বৃষ্টির পরাগ মেখে’ (সামাদ)
যাদের কথা বললাম তাঁদের আজ অনেকেই নেই। স্রষ্টার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন চিরকালের মত। তাঁদের সবারই আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ পাক রাববুল আলামিন তাঁদের সবাইকে জান্নাতবাসী করুন।
লেখক: গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত প্রযোজক, স্ক্রিপ্ট রাইটার: বাংলাদেশ বেতার, রাজশাহী