কাজী মিতুলের ‘শ্রাবণের ধারার মত’

আপডেট: জানুয়ারি ২০, ২০২৩, ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ

সাজিদ রহমান:


কাজী মিতুল মানে ‘মিতুল ভাই’ আমার মত অনেকের কাছে এক আদর্শের নাম। এক ঈর্ষার নামও বটে। কেন, সেটাই আগে বলি। আজও মনে পড়ে প্রায় ১৬/১৭ বছর আগে, ভার্সিটিতে পড়ার সময় আমরা যখন টুকটাক টিউশনি করি আর অনাগত পরীক্ষায় ফেল ঠেকানোর জন্য লড়ে যাচ্ছি তখন দেখি মিতুল ভাই ও তার বন্ধুরা মিলে একটা টেলিফিল্ম বানিয়ে ফেলেছে (ঈধষষ সব ভৎর… বিষয়টা এখন যতটা পানি-ভাতের মত সহজ লাগছে, ১৬/১৭ বছর আগে তা মোটেও ছিলো না)।
তারপর হলের ল্যানকার্ডের বরাতে রুমে বসে ঈধষষ সব ভৎর দেখি। তাজ্জব না হয়ে পারি না। তিনি আমাদের ঈধষষ সব ভৎর এর বাদশা ভাই। দুর্দান্ত অভিনয়ের পাশাপাশি স্ক্রিপ্ট রাইটারও তিনি। আমরা শুধু ভাবি, একজন মানুষের পক্ষে কিভাবে সম্ভব!! সেই সময় থেকে তিনি আমাদের কাছে সেলেব্রিটিও বটে।
মানুষ হিসেবে কেমন সেটা হয়ত অন্য সময় বলা যেতে পারে। শুধু এটুকু বলবো, সেখানেও তিনি আমার মত হাজারো মানুষের জন্য আদর্শের জায়গা দখল করে আছেন।
এবার আসি শ্রাবণের ধারার মত নিয়ে। প্রকৃত কিছু ছোটগল্প, যেন শেষ হয়ে হলো না শেষ, নিয়ে এই গল্পগ্রন্থ। ছোট ছোট প্লটে অল্প কথায়, খুব সাধারণ ভাষায় অথচ কী দারুন মুন্সিয়ানায় প্রতিটি গল্প বলেছেন। পড়ে মনে হবে, আরে এটাতো আমারই গল্প। এটাতো আমার সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা। অথচ মিতুল ভাই সেটাকে সার্বজনীন করে তুলে ধরেছেন।
মিতুল ভাইয়ের বড় শক্তি গল্পের ছলে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে মনে করিয়ে দেয়া। ক্ষয়ে যাওয়া সমাজে মানবিকতার স্ফুরণকে জাগিয়ে তোলা। প্রতিটি গল্প যেন সেই সব বার্তার বাহক। সে গল্পগুলোতে আছে সমাজের জন্য অতি দরকারি টোটকা।
তিনি ও তার গল্পেরা স্বচ্ছ কাচের দেয়ালের মত। কোনো জড়তা নেই, কোনো ভনিতা করেন না। তিনি গল্পের ছলে শুধু সমাজের অবক্ষয়ের কারণগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। এছাড়াও একেকটি গল্পে একেকভাবে মানবিক মানুষের ছবি একে সমাজের মনুষত্বকে জাগিয়ে তোলার দায়ভার নিজেই কাঁধে নিয়েছেন।
উদাহরণ হিসেবে প্রতিজ্ঞা ৭১ এর সালাম, সহমর্মি’র ফয়সাল, বিপ্রতীপ এর শাবাব, প্রতিদান এর প্রধান চরিত্র, রানুর চিঠির জাহিদুলসহ আরও অনেক চরিত্র এঁকেছেন। এদের দিয়ে সমাজের সুন্দর মানুষদের কথা বলতে চেয়েছেন। হয়ত তিনি চেয়েছেন, “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?”
একেকবার মনে হয়, এরা সবাই আসলে মিতুল ভাইয়ের ভিন্ন সময়ের ভিন্ন রূপ। যাদের দিয়ে নিজের মনের কথাটি সমাজে বলতে চেয়েছেন। সমাজকে বদলে দিতে চেয়েছেন।
একই সাথে ঠিক বিপরীত চিত্রেরও দেখা পাওয়া যায়। এই যেমন ফেইসবুকের সুনীল কিংবা বাবা দিবসের সানি, অথবা অমানুষ এর রাজন বা মা দিবসের আকাশ। এরা সবাই আমাদের সমাজের বাস্তবিক জীবনের একেকটা চরিত্র। যারা সময়ের ফেরে পড়ে সত্যকে ভুলে মিথ্যার মায়াজালে আটকে রয়েছেন। এদের গল্প বলে হাজারও তরুণকে, প্রবীণকে প্রকৃত মেসেজটা দিতে চেয়েছেন।

আছে আরও গল্প, আছে ভিন্ন সব কাহিনী, হরেক রকম তার চরিত্র। এসব মিলিয়ে দুই মলাটে মিতুল ভাইয়ের ছোটগল্পের বই “শ্রাবণের ধারার মত” সামাজিক দায়বদ্ধতা মিটিয়ে সাহিত্যের খাতায় রেখে যাওয়া এক দারুণ ছাপচিত্র।
কালে কালে এমন ছাপচিত্রে ভরে যাক সাহিত্যের নানা ধারা। মিতুল ভাইয়ের লেখনি হোক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। তেতুলিয়ার আকাশ থেকে ঝরেপড়া শ্রাবণের ধারা গড়িয়ে গড়িয়ে একদিন বঙ্গোপসাগরে পৌঁছে যায়। মিতুল ভাইয়ের গল্পের সমাহার “শ্রাবণের ধারার মত” ও এর অন্তর্নিহিত মেসেজ যেন দেশের সকলের হৃদয়ের সাগরে পৌঁছে যায়।
লেখক : নির্বাহী প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, নওগাঁ।