কাব্যাকাশ থেকে খসে গেল নক্ষত্র এক

আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০২১, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

এস এম তিতুমীর:


‘হয়তো এসেছিল। কিন্তু আমি দেখিনি। / এখন কি সে অনেক দূরে চ’লে গেছে? / যাব। যাব। যাব।

সব তো ঠিক করাই আছে। এখন কেবল বিদায় নেওয়া,/ সবার দিকে চোখ, / যাবার বেলায় প্রণাম, প্রণাম!’

চরম সত্যকে আলিঙ্গন করবার অমিত সাহস নিয়ে যারা পথে নামে তারা কখনো থেমে থাকে না। আপন সাধনা বলে ঠিকই গন্তব্যে পৌঁছে যান। পিছনে রেখে যান হাজারো বাণী। যা হয়ে ওঠে অজরামর। সেই অনন্তকাব্য পিয়াসী, কবি শঙ্খ ঘোষ চলে গেলে না ফেরার দেশে। বাংলা সাহিত্যের একটা যুগ যেন হঠাৎই থেমে হয়ে গেল। করোনা কেড়ে নিল বাংলাসাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। কবি শঙ্খ ঘোষের রক্তে ছিলো বিপ্লব। যা লেখায় লেখায় ঝলকে উঠতো। কবির লেখা পড়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণিত হয়েছে তরুণ সমাজ। তিনি গভীর পর্যবেক্ষণ, সংবেদন এবং অন্তভেদি দৃষ্টি দিয়ে জীবন-সময়-সমাজ আর সংসারকে অন্বেষণ করেছেন। যে দৃষ্টিতে আশ্রয় ছিলো জীবনবাস্তবতা ও প্রবহমান সময়। অর্থাৎ কবিতায় বস্তুপৃথিবীর চিহ্ন ও সময়ের স্বাক্ষর বহনের মধ্য দিয়ে তাঁর সৃষ্টিজগত রচনা করেছেন। শঙ্খ ঘোষ তাঁর স্বীয় অভিজ্ঞতা ও অনুভবকে প্রকাশ করেছিলেন নানান আঙ্গিক আর কৌশলে। তাঁর কবিতার স্বতন্ত্র ভাষারীতি, শব্দচয়ন, চিত্রকল্প, প্রতীক, ছন্দ-অলঙ্কার প্রয়োগনৈপুণ্য, লোকচেতনা, মিথ-পুরাণ-রূপকথার ব্যবহার প্রভৃতি কবির শিল্পীসত্তার সঙ্গে তাঁর নির্মাণশৈলীর সৌকর্য এক হয়ে ধার দেয়। কবি জাগতিক সময়ের পুরাটাই ছিরো সুক্ষ্ম অকলোকন। চিরবিদায় নিবেন এ সত্যকে ধারণ করেই হেঁটেছেন সামনের দিকে। তাই দেখা যায় ‘ছুটি’তে তার অনুরণন ‘ সব তো ঠিক করাই আছে। এখন কেবল বিদায় নেওয়া’।

অবিভক্ত বাংলার চাঁদপুরে ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম হয় কবির। এই বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞের প্রকৃত নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ । প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক পাশ করেন। পরে অধ্যাপনাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। যাদবপুর, দিল্লি ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে অধ্যাপনা তিনি দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন। শিয়ালদহের বঙ্গবাসী কলেজ, সিটি কলেজ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন এই বিদগ্ধগুণিজন শঙ্খবাবু। দেশভাগের সময় গর্জে উঠেছিল কবির কলম। তারপর বাংলা যখন ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে তখনও থেমে থাকেনি তা। একটার পর একটা কালজয়ী কবিতা উপহার দিয়েছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। মধ্যবিত্ত বাঙালির মনন তাঁর মতো করে আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। সাধারণের নিজেকে নিয়ে দ্বন্দ্ব, আলো-অন্ধকারে ঘেরা জীবন, প্রবঞ্চনা-ভালোবাসার চেনা ছকই অচেনা হয়ে ধরা দিত তাঁর সৃষ্টিতে। বস্তুবিশ্বের নান্দনিক শিল্পভাষ্য শঙ্খ ঘোষের কবিতায় চিত্রিত হয় ভাষার সাবলীল বুননের মাধ্যমে। তাঁর কবিতার ভাষা সরল ও প্রাঞ্জল। বাকচাতুর্য ও বাকবৈদগ্ধ্য তাঁর কবিতায় সাধারণত অনুপস্থিত থাকে। এগুলোর পরিবর্তে কবিতার ভাষায় হালকা চালের সুর তথা ছড়ারীতিসহ ঠাট্টা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ বা শ্লেষাত্মক ভঙ্গি ব্যবহার করেন। তবে তা প্রায় সর্বাবস্থায় সরল; জটিল ও আড়ম্বরপূর্ণ নয়। কথ্যভাষারীতি তাঁর কবিতার অবলম্বন। সহজ ভাষায় উপস্থাপনের মাধ্যমে তাঁর কবিতা অনুভূতির জটিলতায় পৌঁছায়। অর্থাৎ কবিতার ভাষা সরল হলেও ভাবটা জটিল এবং বহুমাত্রিক। কবিতার ভাষা প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়… তখন যেটা বলতে চেয়েছিলাম তা হল নানা রকমের চমৎকৃতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা। শব্দের ভার, ছবির জৌলুস, ছন্দের দোল এসব থেকে নিজেকে যথাসম্ভব সরিয়ে নেওয়ার কথা। দৈনন্দিন কথাবার্তার চাল, তার শ্বাসপ্রশ্বাস, যথাসম্ভব তার কাছাকাছি থেকে বলা। এসবকে বলেছিলাম সহজ। কিন্তু তার থেকে যে অনুভূতিটা পৌঁছায় তাতে হয়তো অনেক জট-জটিলতা থাকতে পারে। আসলে, ভাষার বা কথার নানা রকমের তল তৈরি হতে থাকে তখন। একদিকে সহজ সীমায় সময়টাকে ধরে রাখতে পারে যে ভাষা, সে কিন্তু অন্যদিকে আবার গড়িয়ে যেতে পারে অনেক দূরে।’
সমকালে মহত্তম ও শুদ্ধতম কবি ও লেখকের নাম শঙ্খ ঘোষ। কারও কাছে তিনি অভিভাবকসম। আবার কারও কাছে অগ্রজ সমান। তবে বাংলা সাহিত্যের যে মহীরুহের পরিসমাপ্তি ঘটলো এ কথা সবাই বলবেন। রাশভারী কবি শঙ্খ ঘোষ ছিলেন অনেকের কাছেই সহজ-সরল, কাছের মানুষ। বিদ্রোহ থেকে শুরু করে প্রেমের অনুভূতি সবেতেই শব্দকে হাতিয়ার করে অনায়াস বিচরণ করেছেন শঙ্খ ঘোষ। প্রতিবাদকে ভাষায় ফোটাতে কলমকে সঙ্গী করে ছিলেন। আর সে ভাষায় কথা বলেছেন অগণিত মানুষ। ঊননব্বই বছর বয়সে কবি মায়াত্যাগ করলেন পৃথিবীর। তিনি বহু শব্দ উপস্থাপন করেছেন এক্কেবারে নিজস্বধারায়। তাই তাঁর প্রয়াণে শব্দের জগত হলো নীল, গভীর শূন্যতা বুকে নিলো সাহিত্যভুবন। তিনি নেই, তিনি থাকবেন অসংখ্য কালজয়ী শব্দের ভেতর, মননে মননে।