কামারুজ্জমান রাজনীতির এক অনন্য পথিকৃৎ

আপডেট: জুন ২৬, ২০২২, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


মহাকালের ধারাকে খর্ব করা একটা চিরাচরিত অভ্যাস। মানুষ এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। না পারাটা একেবারে অকারণ নয়। ‘ভালো মন্দ সকলি মিলায়ে’ গ্রহণ বর্জনের ভেতর দিয়ে আমরা কালাতিপাত করি। তবে কালে কালে শাসন পদ্ধতির হুজগে পরিবর্তন সর্বথা সুখকর যে হয়নি, তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে।

ব্রিটিশ আমলে ভিনদেশি রাজার অধীনে আমরা শাসিত হয়েছি। সুতরাং রাজনীতির মৌলিক স্তম্ভগুলো যথাযথ অনুসৃত হয়নি। তাদের শোষণের কৌশল প্রধান ছিলো। কৌটিল্যের অজনহিতকর নীতি অর্থাৎ রাজার নৈতিকতা বর্জন কর্মকাণ্ড আমাদের প্রভাবিত করেছে।

ব্রিটিশ শাসিত বাংলা তথা ভারতে শাসন পদ্ধতির স্থানীয় পরিকাঠামো চালু হবার পর ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনের আওতায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। দেখা গেছে, অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি সামন্ত আধামাসন্ত। উত্তরাধিকার সূত্রে অথবা ইতিহাসের ধারায় এঁরা প্রাচীন ভারতীয় শাসন পদ্ধতি, মুসলিম শাসন ব্যবস্থা, বেনিয়া শাসনের কৌশল ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। সেই আবহে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ২৬ শে জুন শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামন জগতে মানবভাগ্য পরিবর্তনের ব্রতে নাটোরের বাগাতিপাড়া থানার মালঞ্চি রেল স্টেশনের কাছে নূরপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস রাজশাহী শহরের কাদিরগঞ্জ মহল্লা। তাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে বনেদি।

মানব প্রেমিক হবার প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য হিসাবে কোনো ব্যক্তিকে অঢেল ধনাঢ্য হতে হবে তা নয়, তবে তাঁর চেতনায় সুকুমার সৌন্দর্যবোধ ও মানব প্রেমের রাজনীতির বীজ উপ্ত ছিলো বলে তিনি যেমন মানুষের ভালো বাসা পেয়েছেন তেমনি ভালো বেসেছিলেন অকৃপণভাবে। তিনি কদাচ সন্ত্রাস কিংবা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন নি।

কামারুজ্জামান সাহেবের শৈশব কৈশোর যৌবন কেটেছে রাজশাহী-চট্টগ্রাম-কলকাতার মতো শিক্ষা সংস্কৃতির সমৃদ্ধ পীঠস্থানে। উচ্চ শিক্ষার সাথে মননের অনুশীলন তাঁকে মানবপ্রেমী হতে সাহায্য করে। শহুরে জীবনের জলুস অপেক্ষা মাটির কাছাকাছি মানুষ তাঁর কাছে শ্রেয়তর ছিলো। তাই তিনি রাজশাহী সদর আসন ছেড়ে দিয়ে গোদাগাড়ী-তানোরের সংসদ সদস্য থাকাকে বাঞ্ছনীয় মনে করেন।

অথচ রাজশাহী সদরের বৃহৎ শিল্প, চিড়িয়াখানা, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার তাঁর হাতেই গড়ে উঠেছে। গোদাগাড়ীর রাজবাড়ীর ওই যে হাঁস- মুরগি-গবাদি পশুর বিশাল খামার তাঁর কর্মকা-ের ফল। আমাদের স্বাধীনতার বয়স ৫০ বছর উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। তারপর এতসব স্থানীয় উন্নয়নের কাজ আর হয়ে ওঠেনি। তাঁর ছেলে বর্তমান মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজশাহীর অবয়বকে উন্নততর নগরের সাদৃশ্য করে তোলার প্রয়াস পাচ্ছেন।

বলা হয়ে থাকে ক্ষমতা মানব চরিত্রের অন্যতম পরিমাপক। ক্ষমতা অর্পণ করে কোনো ব্যক্তির স্বার্থপরতা-পরার্থপরতার বিষয় নির্ধারণ করা সহজ। উত্তরাধিকার সূত্রে জমিদার তনয় হয়েও শোনা যায়নি কামারুজ্জামান জনগণের আমানত খেয়ানত করেছেন কিংবা কারো প্রতি দুর্বিনীত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি কিংবা প্রভাবশালী মন্ত্রী হয়েও তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেন নি।

মনুষ্যত্বে যে সব বৈশিষ্ট্য কোনো নেতাকে স্মরণীয় করে রাখে তাঁর কর্মধারার মাঝে বিদ্যমান ছিলো তাই তিনি কালের চন্দ্রের (কামারুজ্জামান শব্দের অর্থ) কোমল-স্নিগ্ধ রশ্মির সাথে হিনার (মেহেদির আরবি শব্দের প্রচলিত বাংলা শব্দ) সুবাস বিলিয়ে দিতে পেরেছেন। নেতৃত্ব অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু কিংবা দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন নি। আত্মসর্বস্বতা তাঁর অভিধানে ছিলো না। জীবন বিসর্জন দিয়ে শহিদ হয়েছেন কিন্তু প্রলুব্ধ হয়ে মিথ্যার কাছে নতিস্বীকার করেন নি। চারপাশের প্রতারণার রাজনীতি তাঁর ভাবনায় কখনো প্রশ্রয় পায়নি।

বিশেষ কোনো ধর্ম বা ধর্মমতের ভিন্নতা কোনোটিই তার মনুষ্যত্বকে পরাভূত করতে পারেনি। ধর্ম যার যার, তা নিয়ে পক্ষপাত দেখান নি। পক্ষপাতিত্ব দেখালে জনসমর্থন খণ্ডিত হয় তা তিনি বুঝতেন। মতবাদীদের এই অভিধা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। নতুবা মানবভাগ্য পরিবর্তনের সাধনা মরীচিকা হয়েই থাকে। তাই আজকের রাজনীতিকদের বিষয়টি বুঝে দেখার পথিকৃৎ হিসেবে তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে অনুসরণ করলে আপন মর্যাদায় বিভূষিত হবে।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী কলেজ