কারুকাজে সজ্জিত রাজশাহী নগরী

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২১, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


কারুকাজ, সবুজের নান্দনিকতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার এক শৈল্পিক রূপসহ অত্যাধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে উঠেছে রাজশাহী নগরী। উন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্প বদলে দিয়েছে রাজশাহী নগরীকে। দেশ জুড়ে রাজশাহী নগরীর খ্যাতি পুরাতন হলেও রাজশাহী শহরকে নতুনভাবে রাঙাতে কারুকাজের দেয়াল চিত্র আরও আকর্ষনীয় হয়ে উঠেছে। ধুলা-ময়লাময় দেয়ালকে সজ্জিত করতে বিভিন্ন দেয়ালে চিত্র অঙ্কন। প্রাকৃতিক নকশা অঙ্কন করে রাজশাহী শহর হয়ে উঠেছে আরও দৃষ্টিনন্দন।
রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় দেয়ালে দেয়ালে প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছোয়া। কোথাও পশু পাখি আবার কোথাও গাছ পালা। কোথাও কোথাও ইতিহাসের কথা বলা। সব মিলিয়ে শহরটিতে এসেছে নান্দনিকতার ছোয়া।
রাজশাহীর উপশহরে এক নকশার উপরে দেয়াল চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। শুধু বাইরেই নয়, ভেতরের দেয়ালেও যেন কারুকাজের ছাপ। প্রতিদিন অনেক মানুষ ভীড় করে চিত্রটি দেখতে। রাজশাহী চারুকলা অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থী আবুল বাশার। রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় স্বপ্রণোদিত হয়ে কারু কাজ করে চলেছেন তিনি। তবে তার কারুকাজ সবার পছন্দ হওয়ায় নিজেকে সামনের দিনে আরও ভালোভাবে মেলে ধরতে পারবেন তিনি।
আবুল বাশার জানান, শখের বসে রঙের কাজ করা। চারুকলা বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে বিভিন্ন জায়গায় রঙের কাজ শুরু করি। আমি যখন কাজে মজা খুঁজে পাই তখনই সেটাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করলাম। আমি পেশা হিসেবে এই কাজকেই অগ্রাধিকার দিতে চাই। আর চারুকলা অনুষদের সকল শিক্ষার্থীদের নিজেদের স্বপ্নকে নিয়ে কাজ করা উচিত। বিভিন্ন নকশা বা রঙ মানুষের জীবনে খুশির বার্তা নিয়ে আসে তাই রাজশাহী নগরকেই নয়- সম্পূর্ণ দেশকে রঙিন করে সাজাতে চাই। দেয়াল চিত্র দেখতে ভীড় জমাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। শিল্পের কারিগরি দক্ষতা পথচারীদেরকেও দেয়ালের কাছে নিয়ে আসছে।
রাজশাহী উপশহরের বাসিন্দা দিশা আহমেদ। বিকেলে ঘুরতে বের হওয়ায় চোখে পড়ে দেয়াল চিত্রের। নিজ এলাকায় এমন বড় চিত্র পেয়ে সবার মতো ছবি তুলতে ছুটে যান তিনি। দিশা জানান, নিজ এলাকায় এমন দেয়ালে চিত্র অঙ্কন করায় আমার কাছে অনেক ভালো লাগছে। এমন দেয়াল চিত্র দেখার পরে আমিও চলে আসলাম ছবি তুলে মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে রাখতে।
অন্য রঙ মিস্ত্রি বা শিল্পের জাদুকর মামুন। রাজশাহী শহরকে সুন্দর করে সাজাতে দেয়ালে দেয়ালে রঙিন নকশা অঙ্কন করতে ব্যস্ত তিনি। রাজশাহীর পদ্মা পাড়, শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজের হাতের কারু কাজ দিয়ে সাজাচ্ছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করেন তিনি।
মামুন জানান, রাজশাহী শহরে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলো সাজানোর দায়িত্ব তিনি পেয়েছেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন থেকে। শহরকে আরও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরতে এই আয়োজন। রাজশাহী সুন্দর নগরী, দেশ জুড়ে তার খ্যাতি সেই লক্ষ্যে রাসিক মেয়র শহরের প্রধান ফটকগুলোতে রঙের কাজ করানোর সিদ্ধান্ত নেন। রং তুলির কাজ কার না ভালো লাগে! নিজ শহরকে সাজাতে পেরে আমারও সেই ভালো লাগা কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, যখন থেকে শহরের বিভিন্ন জায়গা বিশেষ করে পদ্মার পাড়ে কারুকাজ করতে লাগলাম তখন থেকে তরুণ-তরুনীসহ অনেক মানুষের ভীড় লক্ষ্য করলাম। রাজশাহীবাসির কাছেও নিজ শহরকে সুন্দরভাবে সাজাতে পারা আমার কাছে সাফল্যর বিষয়। এখনও অনেক জায়গায় কাজ চলছে। কয়েকমাস থেকে আমরা কিছুজন মিলে এই কাজ করছি। আসা আছে খুব দ্রুত রাজশাহী শহরকে সুন্দরভাবে রঙ্গিন করে তুলতে পারব।
রাজশাহী শহরে এমন দেয়াল চিত্র হওয়ায় তরুণ-তরুণীরা প্রতিনিয়ত ছবি তুলছেন দেয়াল চিত্রগুলোর। দেয়াল চিত্রের সাথে নিজেদেরকে স্মরণীয় করতেই ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে তারা। পথে-ঘাটে যারাই যাচ্ছে দেয়াল দেখে যেন দাঁড়িয়ে পড়ছেন।
পদ্মা পাড়ে প্রতিনিয়ত কারুকাজ দেখতে ভীড় জমাচ্ছে সাধারণ মানুষ। কারুকাজের সাথে ছবি তোলায় ব্যস্ত অনেকে। রাজশাহী শহরের অনেক পরিত্যক্ত জায়গা আজ নান্দনিকতার ছোঁয়া পেয়ে সম্পূর্ণ বদলে গেছে। রাজশাহী শহরের পদ্মাপাড়ে বেড়াতে এসেছেন জেরিন তাসনীম। পদ্মা পাড়ে কারুকাজের দেয়াল ঘুরে দেখছে তারা। তিনি জানান, সম্পূর্ণ রাজশাহী নগরী আগের তুলনায় বদলে গেছে। এমনিতে তো রাজশাহী নগরী সুন্দর তবে এমন কারুকাজে আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে। আমাদের মতো শিক্ষার্থীরা ছাড়াও অনেকেই পরিবারসহ ঘুরতে আসছেন এখানে।
২০১০ সালেও রাজশাহী মহানগরী এতো উন্নত ও সুন্দর ছিল না। নগরপিতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন রাজশাহীকে পরিকল্পিতভাবে সাজাচ্ছেন, ব্যাপক উন্নয়ন করছেন।
এ ব্যাপারে সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, দীর্ঘদিন পর অনেকে রাজশাহীতে এসে দেখছেন, শহরটির পরিবর্তন। এই নগরীকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছি। প্রশস্ত সড়ক, ফুটপাত, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন করা হচ্ছে। শিক্ষানগরী রাজশাহীতে আরো নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। শিল্পায়ন, আন্তর্জাতিক নৌবন্দর প্রতিষ্ঠা সহ বহুমুখী উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশ উন্নয়নে জিরো সয়েল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এক সময় নগরীর বিভিন্ন দেয়ালে থুথু ফেলে পথচারীরা নষ্ট করে রাখতো। সেই দেয়ালগুলোকে বিভিন্ন রঙে-রাঙিয়ে সুন্দর করে গড়ে তোলা হচ্ছে। ফলে এখন পথচারীরাও সে দেয়ালের কাছে গিয়ে ছবি তুলে রাখে। শুধু তাই নয়, সেলফিসহ বিভিন্ন স্টাইলে ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড দিচ্ছে। এতে করে দেশের পাশাপাশি বিশে^র অন্য দেশে রাজশাহী নগরীকে তুলে ধরা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পরিচ্ছন্ন এ নগরীর সুনাম সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী এ নগরীকে পরিচ্ছন্ন, সুন্দর বসবাসযোগ্য হিসেবে দেশের মধ্যে উত্তম নগরী রূপে বিবেচনা করছে। দ্রুত নগরায়ণের ফলে এ নগরীতে হাইরাইজড বিল্ডিং নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। একই সাথে রাস্তা প্রশস্তকরণ ও নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণের ফলে এখনও এখানে ধুলাবালির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। আগামীতে এ সকল কাজ সম্পন্ন হলে পরিচ্ছন্ন নগরীর এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। নাগরিকদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস বৈদ্যুতিক পোলের নিকট ময়লা ফেলা, দোকান কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিস্কার করে ময়লা ফেলার অভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে না। এ বিষয়ে নগরবাসীকে আরও সচেতন হতে হবে। গৃহকর্মীরা গৃহস্থালি কাজের বর্জ্য উচ্ছিষ্ট ড্রেনের মধ্যে ফেলার এ অভ্যাস পরিবর্তনে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিচ্ছন্ন এ শহরটিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ