কিংবদন্তী সাধক ফকির লালন শাহ

আপডেট: অক্টোবর ১৯, ২০১৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

হাবিবুর রহমান স্বপন
সাধক লালন শাহ-এর জন্ম তারিখ জানা না গেলেও তাঁকে ফাল্গুনের এই সময়ে অর্ধমৃত অবস্থায় কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে কালিগঙ্গা নদী তীরে পাওয়া যায় (লালন ভক্ত-শিষ্যগণ মনে করেন এই ফাল্গুনের দোল পূর্ণিমার দিনেই ফকির লালনের জন্ম হয়েছিল)। দীর্ঘ জীবনের পর মহান এই সাধক মৃত্যুবরণ করেন ১২৬ বছর আগে ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক (১৭ অক্টোবর ১৮৯০)। প্রতিবছর দোল পূর্ণিমায় লালনের স্মৃতিবিজড়িত ছেউড়িয়ায় লালনের সমাধিপাশের্^ ভক্তদের উৎসব হয় (৪ মার্চ থেকে ৮মার্চ পর্যন্ত উৎসব চলবে)। এছাড়াও ১ কার্তিক তার মৃত্যু দিবস উপলক্ষে ভক্তদের মহাসমাবেশ হয় কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়িতে।


যারা লালনের দর্শন জানেন না বা বোঝেন নাÑ তাদের কাছে সবই ব্যবসা বা ব্যক্তি স্বার্থের ব্যাপার। দেশ-বিদেশের বহু ভক্ত এখন গবেষণা করছেন কী করে একজন অক্ষরজ্ঞানহীন ব্যক্তি কালজয়ী গান লিখে গেলেন। স্ব-শিক্ষিত লালন আজ আমাদের কাছে এক বিস্ময় এবং কিংবদন্তী। যিনি রচনা করেছেন,
‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি/ সবই দেখি তা না না না…।’
অসাম্প্রদায়িক চেতানার লালন ফকির তার গানে মানবতাকে সবচেয়ে বড় করে তুলে ধরেছেন।
ছেঁউড়িয়া একটি ছায়াঘেরা নিবিড় গ্রাম।  এখন সেটি কুষ্টিয়া শহরের একটা মহল্লা। একপাশে গড়াই অন্য পাশে কালিগঙ্গা দু’টি বহমান নদী। আজ থেকে প্রায় দুইশত পঁচিশ বছর আগের একদিন ভোরবেলা ষোল-সতের বছর বয়সের অচেতন লালন ভাসতে ভাসতে কালিগঙ্গা নদীর তীরে এসে ভিড়ল। ছেঁউড়িয়া গ্রামের মওলানা মলম কারিকর নামাজি লোক। সেদিন ভোরবেলা মওলানা মলম ফজরের নামাজ পরে কালিগঙ্গা নদীর দিকে হাওয়া খেতে আসলেন, হঠাৎই দেখতে পেলেন এক অচেনা সংজ্ঞাহীন যুবক অর্ধজলমগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে, ছেলেটির মুখে ও শরীরে বসন্ত রোগের দাগ বিদ্যমান। তিনি কাছে গিয়ে দেখলেন ছেলেটি বেঁচে আছে, খুব ধীরলয়ে চলছে শ্বাস-প্রশ্বাস। নিঃসন্তান হাফেজ মলমের বুকের ভেতর হু হু করে উঠল, এ কোনো অচেনা যুবক নয়; খোদা যেন তাঁর সন্তানকেই ভাসিয়ে এনেছেন তাঁর কাছে। মলম তৎক্ষণাৎ বাড়ি ফিরলেন এবং তাঁর অপর তিন ভাইকে সাথে নিয়ে আসলেন। এবার চার ভাইয়ে ধরাধরি করে অচেনা যুবককে নিজের বাড়িতে আনলেন। মলম ও তার স্ত্রী মতিজান দিনরাত সেবা-যতœ করতে লাগলেন। দিনে দিনে অচেনা যুবকটির মুখে জীবনের আলো ফিরে এলো। মতিজান জিজ্ঞাসা করল বাবা তোমার নাম কী? …ফকির লালন।
আমৃত্যু ফকির লালন ছেঁউড়িয়াতেই ছিলেন, মৃত্যুর পর ছেঁউড়িয়ার আঁখড়াবাড়িতেই তার সমাধি নির্মিত হয়। ছেঁউড়িয়া ভিত্তিক লালনের জীবন বৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে খুঁজে পাওয়া যায় ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহের সম্পাদিত ‘লালন সংগীত’ নামক গ্রন্থে। লালন কোথায় ছিলেন, কীভাবে কালিগঙ্গা দিয়ে ভেসে আসলো এসব বিষয়ে যে তথ্য পাওয়া যায় তা সর্বজনগ্রাহ্য নয়। কথিত আছে গঙ্গা স্নান সেরে ফেরার পথে লালন বসন্ত রোগে গুরুতরভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। রোগের প্রকোপে অচেতন হয়ে পড়লে সঙ্গীসাথীরা তাঁকে মৃত মনে করে রোগ সংক্রমণের ভয়ে তাড়াতাড়ি মুখাগ্নি করে নদীতে ফেলে দেয়।
লালনের জন্ম আসলে কোথায় তা আজো নিশ্চিত করে বলা যায় না। কোন কোন লালন গবেষক মনে করেন, লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ভাড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন। এই মতের সাথে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেন এই বলে যে, ছেঁউড়িয়া থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের ভাড়ারা গ্রামের ষোল-সতের বছরের একটি যুবক নিখোঁজ হলো অথচ তার দীর্ঘ জীবদ্দশায় তাঁকে তার কোন আত্মীয়-স্বজন কিংবা পরিচিত জন কেউ চিহ্নিত করতে পারলো না-তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত মাসিক মোহম্মদী পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ী গ্রামের মুসলিম পরিবারে বলে উল্লে¬খ করা হয়। কারও কারও ধারণা লালন শাহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদী তীরের কোন এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বসন্তে আক্রান্ত লালনকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়া হয় (তখন বসন্ত রোগকে মারাত্মক ছোঁয়াচে এবং মরণ ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা হতো)। গঙ্গার ¯্রােতে পদ্মা নদী হয়ে কালিগঙ্গা নদী তীরে অসুস্থ লালন ভেসে এসেছিলেন ছেউড়িয়াতে কিন্তু তাঁর জাতিত্ব পরিচয় রহস্যময়। আসলে লালন নিজেও তাঁর জন্ম পরিচয় প্রদান করতে উৎসাহবোধ করেননি, তা তাঁর গানেই স্পষ্টমান-
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।
লালন কয় জাতের কিরূপ
দেখলাম না এই নজরে।
সত্যিই তাই, জাতপাতের উর্দ্ধে উঠে লালন নিজেকে শুধুই মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়ে গেছেন।
লালন হিন্দু কী মুসলমান এ নিয়েও বিস্তর মতামত পাওয়া যায়। কারো মতে লালন কায়স্থ পরিবারের সন্তান যার পিতা মাধব এবং মাতা পদ্মাবতী; পরে লালন ধর্মান্তরিত হন। গবেষকদের মতে বেশির ভাগই মনে করেন লালন মুসলিম তন্তুবায়ী পরিবারের সন্তান। লালন ফকির নিজের জাত পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেনÑ
‘সব লোকে বলে লালন ফকির কোন জাতের ছেলে
কারে বা কী বলি আমি/দিশে না মেলে।’
এই আঁখড়াবাড়িটিই ক্রমে সাধন ভজনের পূন্যধামে পরিণত হয়। ফজরের নামাজের পর মওলানা মলম কোরআন তেলাওয়াত করতেন, ফকির লালন মনোযোগ দিয়ে তেলাওয়াত শুনতেন. মানে জিজ্ঞাসা করতেন। লালন কোরআনের কিছু কিছু আয়াতের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা করতেন, ব্যাখ্যা শুনে মওলানা মলম অভিভুত হয়ে যেতেন।
লালনের মুখে বসন্তের দাগ ছিলো, তাঁর হাত দুটো এতো লম্বা ছিলো যে দাঁড়ালে আঙ্গুলগুলো হাঁটুর নিচে পড়তো। উঁচু নাক, উন্নত কপাল আর গৌরবর্ণের লালনের ছিলো গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন চোখ। কাঁধ বরাবর চুল, লম্বা দাড়ি, হাতে ছড়ি, পায়ে খড়ম, গায়ে খেলকা, পাগড়ি, আঁচলা, তহবন-সব মিলিয়ে লালন যেন বকে সিদ্ধপুরুষ, পরিপূর্ণ সাধক।
লালন মুখে মুখেই গানের পদ রচনা করতেন। তাঁর মনে নতুন গান উদয় হলে তিনি শিষ্যদের ডেকে বলতেন, ‘পোনা মাছের ঝাঁক এসেছে’। লালন গেয়ে শোনাতেন, ফকির মানিক ও মনিরুদ্দিন শাহ সেই বাঁধা গান লিখে নিতেন। লালনের জীবদ্দশাতেই তাঁর গান বহুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। ফকির মানিক শাহ সেই সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ গায়ক ছিলেন। লালনের শিষ্যদের ধারণা তার গানের সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এতো বিপুল সংখ্যক গান পাওয়া যায় না। শোনা যায় লালনের কোন কোন শিষ্যের মৃত্যুর পর গানের খাতা তাদের কবরে পুঁতে দেয়া হয়। এছাড়াও অনেক ভক্ত গানের খাতা নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেননি।
লালন রাতের বেলায় দুধ দিয়ে খই ভিন্ন অন্য কোন খাদ্য খেতেন না। প্রায় সারারাত জেকের আসকার ও এবাদত করতেন, একটু পর পর পান খেতেন। তখন আঁখড়াবাড়িতে পানের বরজ এবং অনেক ঝোপজংগল ছিলো। ভক্তরা ভারতের গয়া থেকে ফকির লালনের জন্য চুন নিয়ে আসতো, সেই চুনে তিনি পান খেতেন। লালন ভক্তরা বিশ^াস করেন, দোল পূর্ণিমার তিথিতে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বলেই লালন তাঁর জীবদ্দশায় ফাগুন মাসের দোল পূর্ণিমার রাতে খোলা মাঠে শিষ্যদের নিয়ে সারারাত ধরে গান বাজনা করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় এখনো লালন একাডেমি প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমার রাতে তিনদিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসবের আয়োজন করে থাকে। লালন চত্বর ছাড়াও আঁখড়ার অভ্যন্তরভাগসহ সর্বত্র দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা হাজার হাজার বাউলরা ছোট ছোট দলে সারারাত ধরে গান করে। এছাড়াও প্রতি বছর ১ কার্তিকে লালনের মৃত্যু দিবস উপলক্ষে অনুরূপ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। দেশ বিদেশের হাজার হাজার বাউল যোগ দেয় সেই উৎসবে, দোল পূর্ণিমার জোসনায় বাউলরা আকাশের দিকে হাত তুলে গান ধরে…
এলাহি আল আমিনগো আল্ল¬াহ বাদশা আলমপানা তুমি।
ডুবাইয়ে ভাসাইতে পারো, ভাসাইয়ে কিনার দাও কারোও
রাখো মারো হাত তোমার, তাইতো তোমায় ডাকি আমি। ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে লালনের দেখা হয়েছিল কি না এ নিয়ে মতভেদ আছে। জমিদারির তাগিদেই রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে থাকতেন, পদ্মার পাড়ের নির্জনতায় বসে কাব্য রচনা করতেন। ফকির লালনের সাথে রবীন্দ্রনাথের দেখা হয় তখন তিনি বয়সে কিশোর। তিনি একবার লালনের মৃত্যুর পর আঁখড়ায় এসেছিলেন, গভীর অথচ সহজ ভাষায় রচিত লালনের গান তাঁকে মুগ্ধ করেছিলো। লালন ফকিরের প্রায় আড়াইশ গান রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেন, যা ধারাবাহিকভাবে তৎকালীন সময়ে কলকাতা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের সেজ দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই বোটে বসা ভ্রমণরত ফকির লালনের একটি স্কেচ এঁকে ফেলেন যার একটি কপি এখনো লালন একাডেমির মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। গভীর জ্ঞানের অধিকারী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গভীরভাবেই উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন ফকির লালন এবং তাঁর গানকে। তাই তো অঁজো পাড়াগাঁর সমাজ বঞ্চিত ফকির লালন এবং তাঁর গরীব শিষ্যরা উঠে এসেছে তাঁর গানে, কবিতায়-উপন্যাসে।
লালন দর্শনের একটি অন্যতম দিক হলো গুরুবাদ। গুরুর প্রতি ভক্তি নিষ্ঠাই হলো তাদের শ্রেষ্ঠ সাধনা। ধ্যান ছাড়া যেমন গুরকে ধারণ করা যায় না তেমন গুরুর প্রতি অসামান্য ভক্তি ছাড়া অন্তরাত্মা পরিশুদ্ধ হয় না। মানুষের প্রতি ভালবাসা, জীবে দয়া, সত্য কথা, সৎ কর্ম, সৎ উদ্দেশ্য- এই হলো গুরুবাদী মানব ধর্মের মূল কথা। মূলত ভক্তিই মুক্তিÑ
ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।
সর্ব সাধন সিদ্ধ  হয় তার।।
যারা হাওয়ার সাধনা করে তারাই মূলত বাউল, তাদের মতে সাধনার চারটি স্তর আছেÑ স্থুল, প্রবর্ত, সাধক ও সিদ্ধ। প্রথম পর্যায়ের শিক্ষা হলো স্থূল, দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবর্ত, তৃতীয় পর্যায়ে সাধক এবং চতুর্থ বা চূড়ান্ত পর্যায়ের শিক্ষা হলো সিদ্ধ। লালনের গানেও দেখা যায় সেই ভাবদর্শনÑ
ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে
সেকি সামান্য চোরা/
ধরবি কোণা কানচীতে।।
লালন তাঁর অসংখ্য গানের মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধ আত্মার অনুসন্ধান করেছেন, তার গানে ও ভাবাদর্শে সুফিবাদের ভাবধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠেÑ
আপনার আপনি চেনা যদি যায়।
তবে তারে চিনতে পারি/সেই পরিচয়।।
লালনের ভাবশিষ্যরা বিশ্বাস করেন যে, শারীরিক প্রেম ভালবাসার মধ্যে প্রকৃত শান্তি নেই; প্রকৃত শান্তি আছে স্বর্গীয় ভালোবাসায়। গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণের পর সাধনার বিশেষ স্তরে পৌঁছুলেই কেবল শিষ্যকে খেলাফত প্রদান করা যায়। লালনের অনুসারীরা বিবাহ এবং স্ত্রী সম্ভোগ করতে পারে কিন্তু তাদের বিশ্বাস সন্তান উৎপাদনের ফলে আত্মা খ-িত হয়, আর খ-িত আত্মা নিয়ে খোদার নৈকট্য লাভ করা যায় না। সেই কারণেই তারা সন্তান উৎপাদন থেকে বিরত থাকেন। তাছাড়া সন্তান উৎপাদনকে তারা বেদনাদায়ক বোঝা হিসেবেও বিবেচিত করে। খেলাফতের ধারণাটি ইসলামী সুফিজম থেকে এসেছে-যার মূলকথা আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে খোদার নৈকট্য লাভ করা যায়। সুফিবাদে সাধনার দু’টি পর্যায় হলো বাকাবিল্লাহ এবং ফানাফিল্ল¬াহ। বাকাবিল্ল¬াহ মানে খোদার অপার ভালোবাসা, অন্যদিকে ফানাফিল্লাহ হলো আত্মার ভিতর খোদাকে ধারণ করা। বাকাবিল্লাহ ও ফানাফিল্লাহ অর্জন করার জন্য প্রয়োজন আত্মার পরিশুদ্ধ। খেলাফত অর্জনের পর একজন সাধক সকল পার্থিব বিষয় থেকে নির্মোহ হয়ে উঠেন। পুরুষেরা সাদা আলখেল্ল¬া এবং সাদা লুঙ্গি পরে, অন্যদিকে মেয়েরা সাদা শাড়ি পরে, যাকে তারা বলে খিলকা। খিলকা হলো কাফন সদৃশ পোষাক-তাদের ভাষায় জিন্দাদেহে মুর্দার পোষাক। খেলাফত প্রদানের সময় খেলাফত গ্রহণকারীকে চোখে সাদা কাপড় বেঁধে খিলকা গায়ে লালনের সামাধিকে কেন্দ্র করে সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হয়। এ সময় তাঁরা লালনের একটি বিশেষ গান গাইতে থাকেÑ
কে তোমারে এ বেশ-ভূষণ পরাইল বল শুনি।
জিন্দাদেহে মুর্দার বেশ,
খিলকা তাজ আর ডোর কোপনী।।
লালন ফকিরের বয়স তখন ১১৬ বছর, একদিন তিনি শিষ্যদের ডেকে বললেন, এই আশ্বিন মাসের শেষের দিকে তোমরা কোথাও যেওনা কারণ পহেলা কার্তিকে গজব হবে। গজবের বিষয়টি শিষ্যরা কেউ সঠিকভাবে অনুমান করতে না পারলেও আসন্ন বিপদের আশংকা করতে লাগলো। মৃত্যুর প্রায় একমাস আগে তার পেটের অসুখ হয়, হাত পায়ের গ্রন্থিতে পানি জমে। শিষ্যদের বললেন, আমি চললাম। লালন চাদর মুড়ি দিয়ে বিশ্রাম নিলেন, শিষ্যরা মেঝেতে বসে থাকলেন। এক সময় লালন কপালের চাদর সরিয়ে বললেন, তোমাদের আমি শেষ গান শোনাবো। লালন গান ধরলেন, গভীর অপরূপ সুন্দর গানÑ
পার কর হে দয়াল চাঁদ আমারে।
ক্ষম হে অপরাধ আমার
এই ভবকারাগারে।
গান শেষ হলো, চাদর মুড়ি দিয়ে চিরদিনের জন্য নিরব হয়ে গেলেন ফকির লালন। ফকির লালনের জন্ম সাল জানা যায়নি, তিনি ১ কার্তিক ১২৯৭ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ১৭ অক্টোবর ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে মারা যান এবং তিনি বেঁচে ছিলেন ১১৬ বছর। সেই হিসেবে তিনি জন্মে ছিলেন ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে।
(সাংবাদিক, কলামিস্ট)
যৎধযসধহ.ংধিঢ়ড়হ@মসধরষ.পড়স