কিশোর অপরাধ ও গ্যাঙ কালচার পারিবারিক শাসন ও নজরদারিও জরুরি

আপডেট: আগস্ট ১২, ২০২২, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

সম্প্রতি কিশোর অপরাধ ও গ্যাঙ কালচারের আলোচনার মধ্যেই রাজশাহীর প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল’ এর ছয় শিক্ষার্থীকে ধূমপান, মারামারি, অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজসহ বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। শৈশব-কিশোরের নিজেকে বিকাশিত করার মূখ্য সময়ে অপরাধ প্রবণতা নেতিবাচক ভবিষ্যতের বার্তা দেয়। সুতরাং এবিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পলিসিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি পারিবারিক শাসনও জোরদার করতে হবে। অন্যথায় এটা পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। টেকনোলজি আর আধুনিকতায় প্রতিনিয়ত পাল্টে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। বলা হয়ে থাকে এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা শৈশব থেকেই ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে দ্রুতই নিজেদের পরিপক্ব করে গড়ে তুলছে। এই পরিপক্বতা সব সময় শুভ ফল বয়ে আনে না। আর সে কারণেই বিশ^জুড়ে এখন একটি ভয়ঙ্কর সমস্যা হয়ে ধরা দিয়েছে কিশোর অপরাধ বা কিশোর গ্যাং কালচার। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের মতো একটি সামাজিক ব্যাধি ভয়ঙ্করভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এনিয়ে অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক দুশ্চিতায় থাকেন। কিশোর গ্যাঙ কালচার কিংবা অপরাধ বেড়ে যাওয়ার এই বিষয়টি একদিনে ঘটেনি। বরং দিনের পর দিন নানা কারণে এসব বেড়েছে। প্রকৃত শিক্ষার অভাব থেকে শুরু করে পারিবারিক শিক্ষা ও বন্ধন কমে যাওয়া, সুস্থ বিনোদনের অভাব, আকাশ সংস্কৃতির কুপ্রভাবসহ নানা বিষয় এসব কোমলমতিকে ঠেলে দিচ্ছে বিপথে। বর্তমান সমাজে পাঠাগার, বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কার্যক্রম কমে গিয়েছে এবং সেটিকে দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন ও আধুনিক প্রযুক্তি। অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, অর্থনৈতিক দৈন্যদশা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যৌথ পরিবার প্রথার বিলুপ্ত, যথাযথ অভিভাবকত্ব না থাকা এবং সামাজিক অস্থিরতা ও অবক্ষয় এসব অপরাধ এবং বখাটেপনার সৃষ্টি করছে। কিশোর অপরাধের পেছনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো- পারিবারিক শিক্ষা ও ভূমিকা। উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে তাদের মধ্যে বখাটেপনা এবং নিত্যনতুন অপরাধপ্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ক্রমেই। মনোবিজ্ঞানীরা জানান, কিশোর-কিশোরীরা ইন্টারনেট সংযোগসহ মুঠোফোন ব্যবহার করছে। সেক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচিত সন্তানের প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে সজাগ ভূমিকা পালন করা। সন্তানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ই-মেইল আইডি ও পাসওয়ার্ড সব সময় নজরদারিতে রাখা। সে কাজটি হচ্ছে না। এ ছাড়া অভিভাবকদের উচিত সন্তান কোথায় যায়, কী করে, সময়মতো ক্লাসে গেল কিনা, ক্লাস শেষে সময়মতো বাসায় ফিরল কিনা এসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখা। তা ছাড়া রাজনৈতিকভাবেও এসব কিশোর অপরাধীকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এলাকার কথিত বড় ভাই বা রাজনৈতিক দলের পাতিনেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব কিশোর ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কিশোররা দল বাঁধছে এবং একদল অন্যদলের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছে। খুনের মতো সহিংসতায় মেতে উঠতে তাদের বাধছে না। ফলে তাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন এবং পরিবারের শান্তি-স্বস্তি বিনষ্ট হওয়া ছাড়াও সমাজে নৈরাজ্য ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। প্রাসঙ্গিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি এবং সে অনুযায়ী যদি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে পারে, তা হলে অচিরেই এ ধরনের অপরাধ দমন করা সম্ভব। সর্বোপরি কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার, সমাজের মুরব্বি, শিক্ষক-শিক্ষিকা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মিডিয়াসহ প্রত্যেকের সচেতনতা ও সক্রিয় ভূমিকা খুবই প্রয়োজন। এক্ষেত্রে পারিবারিক, সামাজিক ও প্রতিষ্ঠানিক সংশোধনমূলক পলিসি নির্ধারণ জরুরি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ