কিশোর গ্যাং : একটি সামাজিক সমস্যা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১, ১২:৩৩ অপরাহ্ণ

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম


কোনো শিশুই অপরাধী হিসেবে জন্মায় না। বরং সে নিষ্পাপ হয়ে জন্মায়। পরিবেশ, পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিকতা, সামাজিক ব্যবস্থা, পিতা-মাতার আচরণ, অপসংস্কৃতি, সন্তানদের প্রতি পিতা-মাতার স্নেহ ও তদারকির অভাব, অপূরণীয় আাকাক্সক্ষা, দুঃখ-দারিদ্র, অবিচার, খারাপ ব্যবহার ইত্যাদি অনেক কারণে শিশুর মধ্যে অপরাধ প্রবণতা দেখা দেয়। কিশোরদের অপরাধী হওয়ার মূল কারণ তার মধ্যেই নিহিত থাকে। অর্থাৎ অপরাধী হওয়ার প্রাথমিক কারণগুলি শৈশবেই সৃষ্টি হয়। অজ্ঞানতার কারণে কিংবা সজ্ঞানে এই অপরাধ প্রবণতা শিশু ও কিশোরদের মধ্যে বেড়েই চলে। একপর্যায়ে সে অপরাধী হয়ে ওঠে। শিশু ও কিশোর অপরাধীরা সাধারণতঃ প্রাথমিক অপরাধী।
স্কুল পলাতক শিশু ও কিশোরদের অপরাধী হতে দেখা গেছে। বারে বারে ঘটলে বুঝতে হবে ওই শিশু ও কিশোরই শিগগিরই অপরাধী হবে। অনেক ক্ষেত্রে শুধু রোমান্স ও তামাশা উপভোগ করার জন্য কিশোররা অপরাধ করে থাকে। অনেক সময় নৈরাশ্য থেকে আক্রমণী স্বভাবের উদ্ভব হয় যা কিশোর অপরাধী হওয়ায় ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নিগৃহ, নিপীড়ন, অবজ্ঞা, অবহেলা কিশোর অপরাধী হওয়ার অন্যতম কারণ। কিশোর অপরাধী সৃষ্টির জন্য অনেক সময় অভিভাবক ও পিতা-মাতাকে দায়ী করা হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশ সময় কিশোর বয়সে উপনীত হওয়ার পর বালকরা কিশোর অপরাধী হয়।

শিশু-কিশোররা ছোট বেলায় যা দেখবে তাই শিখবে। সন্তান যদি পিতা-মাতাকে সবসময় খিঁটখিটে মেজাজে দেখে তবে তার মধ্যেও বড় হলে এধরনের আচরণ গড়ে উঠবে। সন্তানেরা এই খিঁটখিটে মেজাজের জন্য অপরাধবোধে ভোগে। অবহেলিত উদ্বাস্তু সমাজ এবং ভাঙা সংসার কিশোর অপরাধী সৃষ্টির সহায়ক। বিবাহবিচ্ছেদ, মাতা-পিতার পৃথক অবস্থান, পরিত্যক্ত স্বামী- স্ত্রী, মাতা- পিতার পৃথক সংসার ও বসবাস কিশোর অপরাধী সৃষ্টির অন্যতম কারণ। মাতা-পিতার পুনর্বিববাহ বেশিরভাগ শিশু ও কিশোর পছন্দ করে না। ঘরভাঙা সংসারে শিশু ও কিশোরদের ভালো থাকা কঠিন। কিশোররা সাধারণতঃ অপরাধী পিতার অনুগামী হয়ে থাকে। অবৈধ সন্তানেরা বা পিতৃনামহীন সন্তানরা প্রায়ই নিজেদেরকে ঘৃণিত মনে করে অপরাধী হয়ে ওঠে। শিশু ও কিশোরদের বিস্ময়, ক্রোধ, উত্তেজনা, আগ্রহ বা নির্লিপ্ততা, ভাবুকতা, প্রতিকার স্পৃহা ইত্যাদি লক্ষ্য রাখতে হবে। দারিদ্র্যের মতো প্রাচুর্যও ক্ষতিকর। প্রাচুর্য মানুষকে অলস করে। এই অবস্থায় তারা অপরাধমুখি হয়।

কিশোর গ্যাং বর্তমান সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। শিশু ও কিশোরদের একটি বড় অংশ এখন গ্যাং কালচারের সাথে যুক্ত। রাজধানী ঢাকা শহর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা শহর পর্যন্ত এর পরিধি ও বিস্তৃতি ঘটেছে। ক্রমেই বেপরোয়া গয়ে উঠছে কিশোর গ্যাঙের সদস্যরা। সামাজিক অবক্ষয়, সমাজ পরিবর্তন, সমাজের নানাবিধ অসঙ্গতি এবং অস্বাভাবিকতায় কিশোর গ্যাং কালচারের সাথে জড়িয়ে পড়ছে শিশু ও কিশোররা।

২০১৭ সালে রাজধানী ঢাকার উত্তরায় ডিসকো বয়েজ ও নাইন স্টার গ্রুপের মধ্যে বিরোধের জেরে খুন হয় ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির। এই মামালার তদন্তকালে বেরিয়ে আসে কিশোর গ্যাং কালচার এবং তাদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের ভয়ঙ্কর সব ঘটনার কথা। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে।

গোয়েন্দা তথ্যমতে, দেশজুড়ে কিশোর গ্যাঙের দুই শতাধিক গ্রুপ সক্রিয়। এদের মধ্যে ছোটবড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক গ্যাঙের তৎপরতা দৃশ্যমান। পুলিশের ক্রাইম অ্যানালাইসিস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী রাজধানী ঢাকাতেই গত কয়েকবছরে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সন্ধান মিলেছে অন্তত ৫০ টি। এগুলোর মধ্যে ১. কাকড়া গ্রুপ, ২. জি ইউনিট গ্রুপ, ৩. ব্লাক রোজ গ্রুপ, ৪.রনো গ্রুপ, ৫. কে নাইট গ্রুপ , ৬. ফিফটিন গ্রুপ, ৭. ডিসকো বয়েজ গ্রুপ, ৮. নাইট স্টার গ্রুপ, ৯. নাইন এম.এম বয়েজ গ্রুপ,১০. পোটলা বাবু , ১১. সুজন গ্রুপ, ১২. আলতাফ গ্রুপ, ১৩. ক্যাসল গ্রুপ, ১৪. ভাইপার গ্রুপ , ১৫. পাটোয়ারী গ্রুপ, ১৬.আতঙ্ক গ্রুপ, ১৭. চাপায় দে গ্রুপ , ১৮. ফিল্ম ঝিরঝির গ্রুপ, ১৯. এফএইচবি গ্রুপ, ২০. কেনাইন গ্রুপ, ২১. তুফান থ্রি গ্রুপ, ২২. স্টার বন্ড গ্রুপ, ২৩. জুম্মন গ্রুপ, ২৪. চান্দ-যাদু জমজ ভাই গ্রুপ, ২৫. গ্রুপ টোয়েন্টি ফাইভ থেকে লেবেল হাট, ২৬. দেখে- ল চিনে- ল গ্রুপ, ২৭. কোপাইয়া দে গ্রুপ, ২৮. ডেভিল কিং ফুল পার্টি, ২৯. ভলিয়ম টু ভান্ডারি, ৩০. বয়েজ উত্তরা, ৩১. পাওয়ার বয়েজ উত্তরা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে অভিজাত এলাকাগুলোতে এদের তৎপরতা বেশি। ঢাকার বাইরেও কিশোর গ্যাঙের একাধিক গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। ১৫- ২০ বছর বয়সি কিশোর গ্যাঙের প্রতিটি গ্রুপে ১০ থেকে ২০ জন সদস্য থাকে। কিশোর গ্যাঙের সদস্যদের চলাফেরা, পোশাক-পরিচ্ছদ, চুলের স্টাইল সব আলাদা ধরনের। কখনও স্পাইক করা আবার কখনও পেছনে ঝুঁটি বাঁধা। হাতে ব্যান্ড, গলায় চেইন। এরা বড়ভাইদের হাতের পুতুল। বড়ভাইদের ইশারায় ভালমন্দ বিবেচনা না করে এরা কাজ করে থাকে।

গ্যাং তৈরি হওয়ার পর খুব দ্রুতই অন্য এলাকার গ্রুপগুলোর সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে পাড়া বা মহল্লা এবং এলাকাভিত্তিক নানারকম অপরাধকা-ে। এই কিশোরেরা সমাজের মধ্যে আলাদাভাবে নিজেদের মতো করে এক ভিন্ন সমাজ গড়ে তুলেছে।
দ্রুত হিরো হওয়ার মোহ, ক্ষমতা, বয়সের অপরিপক্কতা, অর্থলোভ, বিনাকষ্টে প্রতিষ্ঠা, মোটর সাইকেল চালানো, সালাম পাওয়া, গার্লফ্রেন্ডদের কাছে হিরো হওয়া, ত্রুটিপূর্ণ পরিবার, অপরাধপ্রবণ এলাকায় বসবাস, অসৎসঙ্গ, বিনোদনের অভাব, অশ্লীল ছবি দেখা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, স্থানচ্যুতি, পিতা-মাতার খারাপ আচরণ, মোবাইল ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার, পারিবারিক নেতিবাচক ঘটনা, সামাজিক প্রতিকুল পরিস্থিতি কিশোরদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। যার ফলশ্রুতিতে কিশোররা সমাজের বিভিন্ন গ্যাং কালচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাঙের সদস্যরা চুরি, ছিনতাই, পাড়া বা মহল্লার রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে মোটর সাইকেল চালিয়ে মহড়া, মাদক সেবন ও বিক্রি, মাদক ব্যবসা ও পাচার, চাঁদাবাজি, মেয়েদের উত্ত্যক্ত ও ইভটিজিং, রাস্তায় জটলা করা, দলবেঁধে অশালীন মন্তব্য করা, মেয়েদের স্কুল-কলেজের সামনে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা, প্রকাশ্য অস্ত্র উঁচিয়ে হুমকি-ধমকি, বড়দের অসম্মান করে কথা বলা, মেয়েলি বিষয় নিয়ে সিনিয়র- জুনিয়র দ্বন্দ্ব, কাউকে গালি দিলে, যথাযথ সন্মান না দেখালে, এমনকি বাঁকা চোখে তাকানোর কারণেও মারামারির ঘটনা ঘটে। এলাকা ও খেলার মাঠে আধিপত্য বিস্তার, ধর্ষণ, অপহরণ, মারামারি, খুন ইত্যাদি কর্মকা-ের সাথে জড়িয়ে পড়ে কিশোর গ্যাঙের সদস্যরা। অনেক সময় তুচ্ছ কারণেও মারামারি এবং কখনও খুনের ঘটনা পর্যন্ত ঘটে থাকে। মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হওয়ায় পাশাপাশি কিশোর গ্যাঙের সদস্যরা গ্রুপকে কাজে লাগিয়ে টাকা আদায় করে। ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত হয়।

কিশোর গ্যাং সমস্যা নিরসনে দরকার সর্বসম্মতিক্রমে সামাজিক আন্দোলন। কিশোরদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিয়ে তাদের নিয়মিত কাউন্সিলিং করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে সহনশীল হয়ে গঠনমূলক কাজ করতে হবে। পরিবারে পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। পারিবারিক বন্ধন জোরদার করে পারিবারিক আড্ডার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মানসিক ও বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশে অভিভাবকদের যতœবান হতে হবে।ছেলে- মেয়েরা কার সাথে মিশছে, স্কুল-কলেজে ঠিকমতো যায় কিনা, কিভাবে বড় হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। আচরণের ক্ষেত্রে শিশু-কিশোর দের ওপর খুবই কঠোর আবার একেবারেই শিথিল হওয়া যাবেনা। প্রয়োজনে ক্ষেত্র বিশেষে তাদেরকে শাসন এবং সোহাগ করতে হবে। পরিবারের সাথে সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে কিশোরদের গড়ে তুলতে হবে। কিশোর গ্যাং এলাকাগুলো চিহ্নিত করে জড়িতদের এবং বড়ভাইদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে কিশোর গ্যাং সদস্যদের শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনই লক্ষ্য হওয়া উচিত হবে।

সমাজে যাতে কিশোর গ্যাং সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কারণ আজকের শিশু-কিশোররাই আগামি দিনের ভবিষ্যত। তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার নৈতিক দায়িত্ব আপনার, আমার, সবার ওপর বর্তায়।
লেখক ও কলামিস্ট