কুমার-বউ

আপডেট: জানুয়ারি ২৮, ২০২২, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

আরিফুল হাসান


হালকা ছিপছিপে গড়ন। সকালের আলোয় বাঁশঝাড় ঝাড়– দিচ্ছে কুমার-বউ। বছর দেড়েকের শিশুকন্যা তার কোলে প্রায় বাঁদরের মতো ঝুলে আছে। গায়ের রং কুচকুচে কালো। দেখলে মনে হয় না এ বউটির পেটে ধরা এ শিশু। বউটি যখন মাড় দেয়া তাতের শাড়ি পরে, বিশেষ করে পূজাপার্বণে, -তখন আর তার দিকে তাকানো যায় না। এমন আগুন রূপ। লোকে বলে, কুমারের ঘরে স্বর্গের অপ্সরী এসেছে। হাতের ঝাড়–টাকে একদ- বিরাম দেয় না শিউলি। গলার কাছে আঁচলটা একটু ঝুলে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়েছে। বক্ষসন্ধির নুন-পূর্ণিমা এই সকালেও ঝলক দিয়ে উঠলো।

কুমার বউ হাতের ঝাড়–টা রাখে। বুকের আঁচলটা ঠিকঠাক টেনে কোমরের পিছে গুঁজে নেয়। আবার ঝাড়–টা হাতে নিয়ে শনশন করে পাতা কুড়াতে থাকে। মেয়েটা ক্যাঁ-ক্যাঁ করে কেঁদে উঠলে কাজ থেকেই চুমু দেয় মাথায়। রাস্তার ওপাশে নিতাই মাটি তুলছে। সরকারি খালের কাঁখ থেকে খুঁড়ে খুঁড়ে বের করছে এঁটেল মাটির ঢেলা। রাস্তা দিয়ে যেতে কেউ কেউ খিস্তি ঝাড়ে, -শালা কুমারের বাচ্চা রাস্তাটাকে শেষ করে ফেললে। কিন্তু নিতাই বড়ই কুঁড়ে।

কুমার পাড়ার অন্যান্য মরদদের মতো দূর বিলের শ্মশান ডোবা থেকে মাটি আনে না। কিংবা একটু নিচে নেমে খালের তলা থেকেও তো মাটি আনতে পারতো। তা না করে রোজ রোজ রাস্তাটার কাঁখ থেকেই মাটি কাটে। লোকে গালমন্দ করবে নাতো কী করবে? রাস্তাটার অপর পাড়ে বাঁশতলা ঝাড়– দিতে দিতে নিতাইয়ের বউ ঝাড়–টা রেখে স্বামীর দিকে তাকায়। তার ড্যাপডেপে দু’চোখে লজ্জা ও অসহায়ত্ব ফুটে উঠে।

শিউলির বিয়ে হয়েছে আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে। ঘরে ঘরে তখন আঘুনের ধান, উৎসবের আমেজ চারদিকে। উৎসবের ভিড়ে আরেকটা উৎসব শিউলির চোখের জলে ভেসে যায়। শুভক্ষণ দেখে তার বাবা বিয়ে ঠিক করে। পাত্র তেমন পছন্দসই নয়। বয়সটাও একটু বেশি। কিন্তু কী করবে নিঃস্ব-দরিদ্র বাবা? বয়েসের ভারে ন্যুব্জ। ছেলেরা বিয়ে করে যার-যার মতো সংসার
পেতেছে। মা মরা মেযেটাকে পেটের খাবার দিতেই তো বুড়ো হিমসিম খায়।

ভালো পাত্র পাবে কোথায়? বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে এসে ভাঙা ঘর, আর অগোছালো সংসারটাকে বুকে আগলে গড়ে তুলতে চেয়েছে শিউলি। লোকে বলে, নিতাই মদ খায়। শিউলিও জানে। হাতে দু’চার ’শ টাকা হলেই নিতাই দৌঁড় দেয় মেথরপট্টির দিকে। ঘুমের ওষুধ দেয়া সেসব পঁচা ভাতের পানি খেয়ে দু-চারদিন ঘুম থেকে উঠতে পারে না। থেমে যায় কুমারের চাকা। চলে না জীবিকা। শিউলি পেটে পাথর বেঁধে পড়ে থাকে। পুকুরপাড়ের শাকপাতা, কিংবা কচি বাঁশের একটা কড়ুল এনে সিদ্ধ করে খায়।

Ñঅ্যা¤েœ মানুষটা ভালো। শিউলি নিজের মনে মনে বলে। তাকে জানপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। তার সব সাধ আহ্লাদ হয়তো পূরণ করতে পারে না, কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু পুষিয়ে দিতে চেষ্টা করে। ভালোবাসাও কি সম্পূর্ণভাবে দিতে পারে? বয়স হয়েছে। চৌত্রিশ-ছত্রিশ তো হবেই। চল্লিশও হতে পারে। তার সেই কিশোরী-ভেলার দেহ। নদী সাঁতড়াতে গিয়ে পাক খেয়ে ডুবে যায় ক্ষীণদেহী কুমার নিতাই। তবু শিউলি সন্ত্যষ্ট। শয্যার সুখই কি সবকিছু? ভাবতে গিয়ে তার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠে।

বিয়ের প্রথম বছরেই শিউলির পেটে বাচ্চা আসে। নিতাইয়ের আনন্দের সীমা থাকে না। বাজার থেকে টাকা বাঁচিয়ে বউয়ের জন্য এটাওটা নিয়ে আসে। শিউলি রাগ করে। টানাটানির সংসার, Ñআমার জন্য বিশেষ কিছু নিয়ে আসার কী দরকার? নিতাই বউকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। Ñশাক-লতা-পাতা খেয়ে তো শরীর শেষ। একটু ভালোমন্দ খাইতে হয়। শিউলি নিতাইয়ের চুলে বিলি কেটে কেটে বলে, Ñএইবার অভ্যাসটা একটু পাল্টান। কথাটা ভালো লাগে না নিতাইয়ের। অভ্যাস বলতে যে তার মদ খাওয়ার কথা বুঝানো হয়েছে সে তা বুঝে। মুখ ভার করে চলে যায়।

তিন মাসের মাথায় শিউলির পেট খসে। ঘরময় মৃত্যুর মতো মনখারাপ করা আবহ নেমে আসে। শিউলি সারাদিন কাঁদে। নিতাইও তাকে সান্ত¡না দিতে সায় পায় না। তার মনটাও কেমন ভেঙে গেছে। তারপর আর দুই বছর কোনো সন্তানাদি আসে না শিউলির পেটে। অনেকে নিতাইকে বুদ্ধি দিয়েছে, Ñজরুর দোষ পড়ছে। পাল্টাও।

নিতাই পরকথা শোনেনি। এমনকি এ ব্যাপারে শিউলির সাথে কোনো বাতচিৎও করেনি কখনো। এ ব্যাপারটাই শিউলির ভক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে স্বামীর প্রতি। শত দোষ থাকলেও নিতাইকে সে মনে মনে শ্রদ্ধাই করে। চার বছরের মাথায় আবার শিউলি মা হয়। নিতাইয়ের অন্ধকার ঘর আবার আলোয় ভরে উঠে।

কিন্তু ততোদিনে নিতাই কাজকর্মের উদ্যম অনেকাংশেই হারিয়েছে। বাড়ির বাইরে যায় না তেমন। কুমার পাড়ার অন্য অনেকেরা যখন দু পয়সা উপার্জনের তৃষ্ণায় সারাদিন চাকা ঘুরায়, নিতাই তখন শুয়ে বসে দিন পার করে। মাঝে মাঝে বেফানা লাগে শিউলির কাছে। হাতের কলসটা শব্দ করে রাখতে গিয়ে ভেঙে জল গড়িয়ে পড়ে। নিতাইয়ের এই অলস যাপন দিন দিন বাড়তে থাকে।

এরই মধ্যে কোলে আসে শিশুটি। -বাচ্চার মুখের দিকে চেয়ে হয়তো স্বামীর পরিবর্তন হবে। মনে মনে ভাবে শিউলি। কিন্তু পরিবর্তন যা হয় তাও তেমন উল্লেখ করার মতো না। সামান্য দু’চার ঘণ্টা কাজ করেই নিতাই হাঁপিয়ে উঠে। চাকা ফেলে ঘরে এসে শুয়ে পড়ে। শিউলি নিজে কাজ করতে চায়। নিতাই বাঁধা দেয়। Ñওসব মেয়াছেলের কাজ নয়। -কেনো কাজ নয় মেয়াছেলের? শিউলির মনে প্রশ্নের ঝড় বয়ে যায়। -পেটে যখন দানা থাকে না তখন মেয়াছেলেই কী আর মরদপুরুষই বা কী? তার দাদির কাছে গল্প শুনেছে। তখনকার যুগে

নারীপুরুষ একসাথে কাজ করতো। পুরুষেরা দূরের বিল থেকে মাটি এনে উঠোনের কোণে ঢিবি বানিয়ে রাখতো। মেয়েরা ছোট্ট ছোট্ট শাবল দিয়ে সেখান থেকে মাটি কেটে-ছেনে তারপর লেগে যেতো দলা করতে। একটা জায়গায় গর্ত করে তাতে মাটি ও জল দিয়ে সমান তালে দু’পায়ে দলতে হত। শীতের সকালেও মহিলাদের দেহ দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝড়তো। কথা বলার সময়ও পাওয়া যেতো না। এমনকি বাপের বাড়ির লোক আসলেও কাজের ফাঁকেই সেরে নিতে হতো টুকিটাকি কথা। শ্বাস-প্রশ্বাসে তখন একটা ধিমি ছন্দ তৈরি হতো।
-বাবায় আইছো? হুঁ
-বও না বাবা। হুঁ
মায়’ ক্যামুন, বইনে? হুঁ
ভাইরে কইয়ো, হুঁ
দেখতে আইতে। হুঁ
তো কাজ করলে সমস্যা কী? কিন্তু নিতাইয়ের এক কথা, সে বেঁচে থাকতে শিউলিকে দিয়ে কোনো কাজ করাবে না। এটি তার ভালোবাসা। কিন্তু পেট তো আর ভালোবাসায় ভরে না। তার উপর আছে দেড় বছরের মেয়েটা। বুকের দুধে এখন আর পেট ভরে না। বুকেও দুধ আসবে কোত্থেকে? বাচ্চায় দুধ খেলে মায়েদের অতিরিক্ত খাদ্য দরকার হয়। কিন্তু শিউলি তো প্রয়োজনীয়টুকুই পাচ্ছে না। নিতাইকে কত করে বলে, -একটু গা ছাইড়া কাম করেন। কিন্তু কে শুনে কার কথা? ঝাড়– দিয়ে বাঁশপাতাগুলো এক জায়গায় জড়ো করে শিউলি। হাতের ঝাড়–টা ফেলে কোমর থেকে আঁচলটা সরিয়ে মুখ মুছে। মেয়েটার মুখ মুছে দেয়। রাস্তার ওপাড়ে নিতাই উবু হয়ে মাটি খুঁড়ছে। তার দিকে তাকিয়ে শিউলির ছলছল করা চোখ দুটো এবার আর থামে না, বয়ে যায় জীবিকার বিপরীতে।