কুমিল্লা বিভাগ সম্পর্কে চিন্তা ও কল্পরূপ

আপডেট: মার্চ ১৩, ২০১৭, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

ড. এ.এইচ.এম. জেহাদুল করিম


সাবেক ত্রিপুরা জেলার অংশ হিসাবে বর্তমান প্রশাসনিক কুমিল্লার আবির্ভাব যদিও অল্প দিনের, কিন্তু অতীত ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে অতি প্রাচীনকাল থেকে এই জেলার একটি বিশেষ সুনাম রয়েছে। ১৭৮১ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময়কালে, এই জেলাটি তার সুনির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখা ও প্রশাসনিক অঞ্চল হিসাবে প্রাথমিকভাবে আবির্ভুত হয়। এর পূর্বে, ১৭৬৫ খ্রীস্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি প্রাপ্তির পর, মূল ত্রিপুরাকে দুইটি অংশে ভাগ করা হয়। চাকলা-রৌশনাবাদের দায়িত্বে থাকে, ত্রিপুরা রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত ইংরেজ প্রেসিডেন্ট, এবং চাকলা-রৌশনাবাদ ব্যতিত কুমিল্লার অন্যান্য এলাকা ‘জালালাপুর-ইহতিমাম’ এর অন্তভূুক্ত ছিল। মূলতঃ, রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য তখন নোয়াখালী জেলারও অনেক অংশই রৌশনাবাদ-ত্রিপুরা হিসাবে কুমিল্লা জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ১৮৩০ সালে, ছাগলনাইয়া ব্যতিত, নোয়াখালী জেলার বাকি অংশ ত্রিপুরা থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ১৮৩৬ খ্রীস্টাব্দে, ছাগলনাইয়া থানাও ত্রিপুরা জেলা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়।
১৯৬০ সাল পর্যন্ত, বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসাবে কুমিল্লা মূলতঃ ত্রিপুরা হিসাবেই পরিচিত ছিল। তবে ১৯৬০ সালে এক প্রশাসনিক আদেশে, এটিকে কুমিল্লা জেলা হিসাবে নতুনভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। প্রশাসনিকভাবে, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচটি বৃহত্তর জেলার মধ্যে, কুমিল্লা জেলা মূলতঃ একটি মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পরবর্তীতে, দেশের বিভিন্ন মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করবার কারণে, বৃহত্তর কুমিল্লা জেলাটিকে ভেঙ্গে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, এবং চাঁদপুর জেলা সৃষ্টি করা হয়। নৈস্বর্গিক পরিবেশের দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে ‘ময়নামতি-লালমাই’ প্রাচীন ‘সমতট’ রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র কুমিল্লা ঐতিহাসিকভাবে সকলের নিকট অতিপরিচিত। হাজার বছরের ঐতিহ্যেকে লালনকারী এই সমৃদ্ধ জনপদ, বাংলার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ছিল। সপ্তম শতকের মধ্যভাগে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের বর্ণনা অনুসারে, এই রাজ্যের পরিধি ছিল প্রায় ৫০০ মাইল। রাজনৈতিক বিবর্তন, প্রকৃত পৃষ্টপোষকতার অভাব এবং ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে, বঙ্গীয় সভ্যতার স্মারক এই সমতট রাজ্যটি কালান্তরে হারিয়ে যায়। অত্যন্ত নির্মম যে এই রাজ্য ও সভ্যতার সকল নিদর্শনই শেষ পর্যন্ত, শতাব্দীর পর শতাব্দী মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে এবং এর ধ্বংসস্তুপসমূহ মূলতঃ পরিণত হয় ঝোঁপ-জঙ্গলে। অতি সম্প্রতি, নৃবিজ্ঞানী ও প্রত্বতত্ববিদেরা ময়নামতি-লালমাইয়ের লালমাটির নিচে এর ধ্বংসাবশেষ আবিস্কার করেন। এতেই প্রমাণিত হয় যে, প্রাচীন কুমিল্লায় একটি সমৃদ্ধ রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। এটি আরও প্রমাণ করে যে, কুমিল্লায় অতি প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষা ও সভ্যতার নিদর্শন ছিল। মধ্যযুগের বাঙালি প-িত তৎকালীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বা নালন্দা মহাবিহারের আচার্য শীলভদ্র (মৃত্যু: ৬৫৪খৃ:) এবং আধুনিককালের সাংবাদিকতার পথিকৃৎ সওগাত সম্পাদক নাছির উদ্দিন বৃহত্তর কুমিল্লার অধিবাসী। শিক্ষা ও প্রতœসম্পদে সমৃদ্ধ কুমিল্লা জেলার এই গৌরবোজ্জ্বল অবদান থাকা স্বত্বেও এই এলাকাটি বিভিন্ন সময়ে ভীষণভাবে বঞ্চিত ও অবহেলিত হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই যে, ১৯৬০ এর দশকে, কুমিল্লায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করবার পরও শেষ পর্যন্ত একটি বিশেষ গোষ্ঠির কৌশলী প্রচেষ্টায় সেটি অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালে (২০০৮-২০০৯), আমি সেখানে নৃবিজ্ঞান ও প্রতœতত্ত্ব বিষয়গুলো সংযোজনের জন্য বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে চিঠি প্রেরণ করি এবং তারই ফলশ্রুতিতে এই বিভাগ দুইটি বর্তমানে সেখানে তাদের একাডেমিক যাত্রা শুরু করেছে।
এর পরেও, কুমিল্লাকে বাংলাদেশের ছোট একটি শিক্ষানগরী হিসাবে গণ্য করা হয়। এখানকার প্রাচীনতম বিদ্যাপিঠ ঈশ্বর পাঠশালা বৃটিশ সময়ের একটি বিখ্যাত স্কুল। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ অনেক কাল আগে থেকেই অত্যন্ত সুপরিচিত। ১৯৬০ এর দশকে স্থাপিত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠান। এর কর্মকা-, পল্লী গবেষণা এবং কুমিল্লা অ্যাপ্রোচ হিসাবে পরিচিত গ্রাম-উন্নয়ন মডেল সমগ্র পৃথিবীতে অতি সুপরিচিত।
প্রাকৃতিক সম্পদ, গ্যাস-ফিল্ড এবং অর্থকরি ফসল উৎপাদন এবং সেই সাথে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের অবস্থানের কারণে, দেশের অর্থনীতিতে কুমিল্লার রাজস্ব আয়ও বেশ ভাল। দেশের সবচাইতে বেশি শিক্ষিত জনগোষ্ঠির বাস এবং বিপুল সংখ্যক আমলা, সামরিক বাহিনীর অফিসার, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং অন্যান্য প্রফেশনাল লোকের সংখ্যাধিক্যের কারণে, এই জেলার মানুষ দেশের শিক্ষা, প্রশাসন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক বিশেষ অবদান রেখে আসছে। ঢাকা নগরীতে প্রচ- জনচাপের কারণে, কুমিল্লা অচিরেই ঢাকার বীঃবহফবফ ঢ়ধৎঃ  হিসাবে আবির্ভুত হবার সম্ভাবনাও রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এবং সার্বিক বিবেচনায়, কুমিল্লা যদি একটি বিভাগ হিসাবে আবির্ভুত হতে পারে তাহলে, অত্র এলাকার অনেক মানুষের ঢাকামূখি প্রবণতা কমে যাবে। এমন কি ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করার উদ্দেশ্যে আসা অনেক লোক অপেক্ষাকৃত কম জনসংখ্যা-অধ্যুষিত কুমিল্লা অঞ্চলে স্থানান্তরিত হবে এবং এতে করে অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই ঢাকা নগরী জনসংখ্যার চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত হতে পারবে।
প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিবেচনায়, বৃহত্তর কুমিল্লা ও বৃহত্তর নোয়াখালী জেলাগুলো মূলতঃ একই ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিম-লে অবস্থিত। এই লেখার পূর্বাংশে আমি পরিস্কারভাবে একটি ইঙ্গিত দিয়েছি যে, বৃটিশ শাসনামল থেকেই কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চল দুইটিকে একই রাজস্ব এলাকাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, অতি প্রাচীনকালেও, কুমিল্লাকেই কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে গণ্য করে তার আশে-পাশের এলাকাগুলোকে শাসন করা হতো।
এৎরবৎংড়হ তাঁর ৬টি ভলিউমে প্রকাশিত খরহমঁরংঃরপ ঝঁৎাবু ড়ভ ওহফরধ নামক গ্রন্থে ংড়ঁঃযবধংঃবৎহ ইবহমধষর ফরধষবপঃ এর ভাষাভাষি এলাকা হিসাবে কুমিল্লা ও নোয়াখালীর ভাষাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আমরাও আপাতঃ দৃষ্টিতে এটি লক্ষ্য করি যে, লাকসাম থেকে শুরু করে চাঁদপুর জেলার বৃহৎ অংশ এবং ফরিদগঞ্জ এলাকায় বসবাসকারীদের ভাষা মূলতঃ নোয়াখালী জেলারই ভাষা। কুমিল্লার ফরিদগঞ্জ এবং নোয়াখালীর রামগঞ্জ এলাকার মানুষের ভাষা সম্পূর্ণভাবে এক। শুধু তাই নয়, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি-কালচারের দিক থেকেও এই এলাকার মানুষের সাথে একটি সার্বিক-মিল রয়েছে। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং চাঁদপুরের কিছু অংশের মানুষের ভাষায় অন্য একটি ধরণ লক্ষ্য করা যায়। সাংস্কৃতিক, আচার-ব্যবহার, ভাষা ও সামাজিকতার এই সার্বিক মিলের কারণেই সম্ভবতঃ এই দুটো এলাকার মানুষকে আঞ্চলিকভাবে ‘নোয়াখালী-কুমিল্লা’ বলে অভিহিত করা হয়। চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ আঞ্চলিকভাবে বাইরের জেলা থেকে আগত সকলকেই নোয়াখালী বলে অভিহিত করার একটা প্রবণতা রয়েছে। মূলতঃ চট্টগ্রামের ভাষার সাথে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষায় কিছুটা মিল রয়েছে, কিন্তু নোয়াখালী এবং কুমিল্লার সাথে চট্টগ্রামের ভাষার কোন মিল নেই। কুমিল্লা ও নোয়াখালীর অনেক মানুষই চট্টগ্রামের ভাষায় কথা বলতে পারে না এবং চট্টগ্রামের ভাষা বুঝতেও তাদের বেশ অসুবিধা হয়। সুতরাং অত্যন্ত যৌক্তিক কারণেই, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর বৃহত্তর জেলাগুলোকে চট্টগ্রাম বিভাগের সাথে অন্তর্ভুক্ত না রেখে, এই দুটো বৃহত্তর জেলার সমন্বয়ে, প্রশাসনিক সুবিধার জন্য, কুমিল্লা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
আমাদের দেশে অতীতে শুধুমাত্র একটি বৃহত্তর জেলাকে পৃথক করে বিভাগ স্থাপন করবার নজির রয়েছে। কুমিল্লা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে, ঢাকা-চট্টগ্রামের অনেক বিভাগীয় অফিস ও কার্যালয়কে কুমিল্লায় স্থানান্তর করা যাবে। এতে করে, ধফসরহরংঃৎধঃরাব-ফবপবহঃৎধষরুধঃরড়হ এর সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন করা যাবে। কুমিল্লা বিভাগ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে, রাজশাহীস্থ বৃহত্তর কুমিল্লা জনকল্যাণ সমিতির উদ্যোগে প্রকাশিত একটি প্রকাশনা-সংকলনে, আমি এর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে ছোট একটি লেখা প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ এর পরবর্তী পর্যায়ে, এই বিষয়টিকে ভড়ষষড়-িঁঢ় করে আর কেউ কোন লেখা উপস্থাপন করেননি। তবে, অনেকেই বিষয়টি নিয়ে সাধারণভাবে চিন্তা-ভাবনা করেন এবং নিঃসন্দেহে, এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যুক্তি প্রদান করে থাকেন। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়েই, অতি দ্রুত কুমিল্লা বিভাগ স্থাপন প্রকল্প সম্পন্ন করা বাঞ্ছনীয়। বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ডিজিটাল মডেলের অংশ হিসেবে, কমিল্লাকে ঢাকার বীঃবহফবফ পরঃু হিসেবে তৈরি করা যায়, যাতে করে ঢাকাকে ফবপবহঃৎধষরুবফ করা যাবে।
লেখক: প্রাক্তন সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি); বর্তমানে ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ওংষধসরপ টহরাবৎংরঃু গধষধুংরধ এর সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের প্রফেসর।
ধযসুশধৎরস@ুধযড়ড়.পড়স