কুষ্টিয়া থেকে এসে পাবনার পদ্মায় অবৈধ বালু উত্তোলন ফসলি জমি নদীগর্ভে, হুমকির মুখে চরবাসী

আপডেট: আগস্ট ৬, ২০২২, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

শাহীন রহমান, পাবনা:


পাবনা শহর থেকে অন্তত দশ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর এপারে বাংলাবাজার ঘাট। ওপারে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ ঘাট। পদ্মা যেন ভাগ করেছে দুটি জেলার মানচিত্র। নদী ডান পাশ ধরে এক কিলোমিটার সামনে এগুলেই চোখে পড়ে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন। বিঘার পর বিঘা কলার বাগান বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে। আর শত শত বিঘা জমি ও চরের মানুষ রয়েছে হুমকির মুখে। এর অন্যতম কারণ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন।

কুষ্টিয়া থেকে এসে পাবনা অংশের পদ্মা নদীর মাঝে এই অবৈধ বালু উত্তোলন করছেন আতিকুজ্জামান বিটু নামের এক প্রভাবশালী। যিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফের ভাগ্নে হিসেবে পরিচিত সবার কাছে। বালু তোলার কারণে পাবনা সদর উপজেলার চরভবানীপুর, জয়েনপুর, খাস জয়েনপুর ও চরকুরুলিয়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের সহ¯্রাধিক বিঘা ফসলি জমি নদী গর্ভে চলে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে নদীপাড়সহ চরাঞ্চলের মানুষ।

সম্প্রতি পদ্মা নদীতে পাবনা-কুষ্টিয়া সীমানার বাংলাবাজার, চরকোষাখালী ও শিলাইদহ ঘাট থেকে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রীজ পয়েন্ট পর্যন্ত সরেজমিনে নৌপথে ঘুরে দেখা যায় প্রায় অর্ধশত ছোট-মাঝারী ও বড় ড্রেজার মেশিন দিয়ে মাঝ নদী ও তীরের কাছাকাছি স্থান থেকে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলনের পর সেখান থেকে বালি বড় বড় বলগেড দিয়ে অন্যত্র স্থানান্তর ও বিক্রির উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছে।

মাঝ নদীতে ৫ হাজার ফুট, ৪ হাজার ফুট, ৩ হাজার ফুট ও আড়াই হাজার ফুট বালু বোঝাই বলগেডে থাকা বলগেড মালিক ও শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাবনা সদরের হেমায়েতপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর পদ্মা নদীর পয়েন্ট থেকে বালু বোঝাই করে তারা কুষ্টিয়ার বিভিন্ন ডাইকে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ নৌপথে এই বালি পৌঁছে দিচ্ছেন বিক্রেতার কাছে। কে বালু কাটছেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, মূলত এই বালু বিক্রির মুল হোতা হানিফ সাহেবের ভাগ্নে আতিকুজ্জামান বিটু।

ভবানীপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে কথা হয় কলাচাষী ইসমাইল মন্ডল ও আসলাম প্রামানিকের সাথে। তারা বলেন, নদীপাড়ের মানুষ আমরা। কলা হচ্ছে এই চরের প্রধান ফসল। বালু দস্যুদের অব্যাহত বালু কাটার কারণে প্রতিদিন কলার বাগান ও ফসলী জমি চলে যাচ্ছে নদীগর্ভে।
বাদাম চাষী আব্দুল কুদ্দুস ও শাকিল মালিথা বলেন, প্রতিবছর কষ্ট করে ফসল ফলাই। ঘরে তোলার আগেই বালু দস্যুদের ছোবলে সর্বশান্ত হয়ে যাই। ফসল আর ঘরে তুলতে পারিনা। এদের বিরুদ্ধে কোন কথাই বলা যায় না। মারধর করে বাড়িঘর তছনচ করে শাসিয়ে চলে যায় যায়। বালু উত্তোলন বন্ধে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

এমন অভিযোগের কথা ধরেই নৌপথ ধরে সরেজমিনে যাওয়া হয় কুষ্টিয়া সীমানায়। নদীর পাড়ে দেখা মেলে অসংখ্য বালুর ডাইক। সেখান থেকে এসকেভেটর দিয়ে ড্রাম ট্রাকসহ বালি সরবরাহের বিভিন্ন গাড়ীতে বালু তুলে দেয়া হচ্ছে। বালু ডাইকের কয়েকজনের সাথে আলাপ করার চেষ্টা হলেও তারা কথা বলতে চাননি। উল্টো সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধভাবে এই বালু উত্তোলন ও বিক্রির সাথে সরাসরি নৌ পুলিশের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তাদের হাত রয়েছে। এ ব্যাপারে নৌ পুলিশের ঈশ^রদীস্থ পদ্মা নদীর দেখভালে নিয়োজিত কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা জানান, পাকশীস্থ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকার ৭ কিলোমিটারের মধ্যে কোন বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। অবৈধভাবে যেখানেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে সেখানেই অভিযান পরিচালনা করে বন্ধ করা হচ্ছে। নৌ পুলিশের সাথে এই অবৈধ বালু দস্যুদের যোগসূত্র কথার কোনো ভিত্তি নেই।

হেমায়েতপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মালিথা বলেন, কুষ্টিয়ার প্রভাবশালীদের কাছে তারা অসহায় হয়ে পড়েছেন। তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালে অনেকবার চেষ্টা করেও বন্ধ করতে পারেননি। তিনি শুনেছেন, আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী এক নেতার ভাগ্নে পরিচয় দিয়ে এই অপকর্ম করছে বিটু নামের এক ব্যক্তি। এলাকার স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে বালু উত্তোলন বন্ধের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

অভিযোগের ব্যাপারে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও অবৈধভাবে বালি উত্তোলনকারী আতিকুজ্জামান বিটু ফোন রিসিভ করেননি। এ কারণে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এসএমএস পাঠিয়েও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

পাবনা সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাওছার হাবীব বলেন, কয়েকদিন আগেই সেখানে খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। জরিমানা করা হয় এক লাখ টাকা। নৌপথে অভিযান চালানোর কারণে প্রশাসন যাওয়ার আগেই বালু দস্যুরা সটকে পড়ে। ফলে আমাদের অভিযান সফল করতে পারিনা।

পাবনার জেলা প্রশাসক বিশ^াস রাসেল হোসেন বলেন, মাঝেমধ্যেই সেখানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হচ্ছে। বালি দস্যুদের আটক করে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে অর্থদন্ড করা হচ্ছে। ড্রেজার বা বলগেড জব্দ করা হচ্ছে না এমন প্রশ্নে তিনি কোন বক্তব্য না দিয়ে অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে বক্তব্যের জন্য গণমাধ্যমকর্মিরা তার কার্যালয়ে গেলেও তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

আত্মীয় পরিচয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, সেটা বৈধ, কি অবৈধ প্রশাসনকে জিজ্ঞেস করুন। আমার পরিচয়ে যদি দিয়ে কেউ কোনো সুযোগ নেয়, আমার কি করার আছে। আমি বা আমার পক্ষ থেকে কখনও কি প্রশাসনকে তদবির করেছি? মাঠের লোকের অভিযোগের ভিত্তিতে আমাকে ফোন দেয়া ঠিক হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।