কৃষকবন্ধু ডাক সেবা শুরু হলো || পরিবহন খরচ ছাড়াই পুঠিয়ার তিন প্রান্তিক কৃষকের পাঁচ টন আম ঢাকা

আপডেট: June 3, 2020, 12:04 am

নিজস্ব প্রতিবেদক:


কৃষকবন্ধু ডাক সেবার উদ্বোধন করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার। রাজশাহী থেকে সঞ্চলনা করেন জেলা প্রশাসক হামিদুল হক-সোনার দেশ

করোনাভাইরাস প্রতিরোধের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক গতি সচল রাখার জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগে গ্রহণ করে চলেছে। এরই অংশ হিসাবে এবার দেশব্যাপী ডাকঘরের বিশাল পরিবহন নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে বিনা ভাড়ায় প্রান্তিক কৃষকের উৎপাদিত আম ঢাকার পাইকারি বাজারে পৌঁছে দিচ্ছে ডাক অধিদফতর। মঙ্গলবার (২ জুন) থেকে এ কর্মসূচির আওতায় রাজশাহী অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকের উৎপাদিত আম পরিবহন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিক্রয়লব্ধ টাকা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কৃষকের হাতে পৌঁছে যাবে। যাতে করে রাজশাহী অঞ্চলে এই দুর্যোগে মুহূর্তে আম নিয়ে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
মঙ্গলবার (২ জুন) সকালে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ঢাকার বেইলি রোডস্থ তার সরকারি বাসভবন থেকে কনফারেন্সের মাধ্যমে এ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। এরপর পুঠিয়া উপজেলা থেকে ডাকবিভাগের একটি কাভার্ড ভ্যানে করে তিন প্রান্তিক কৃষককের ঢাকায় পাঁচ টন আম নিয়ে গেছে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ভিডিও কনফারেন্সে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঢাকা থেকে যুক্ত হয়েছিলেন ডাক মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, তার মন্ত্রণালয়ের সচিব নূর-উর-রহমান ও ডাক অধিদফতরের মহাপরিচালক এসএস ভদ্র। এসময় রাজশাহী জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক শামসুল হক, রাজশাহী ডাকবিভাগের পরিচালক রশিদ কুমার শীল, উত্তরাঞ্চলের পোষ্টমাস্টার জেনারেল শফিকুল আলম, পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ওলিউজ্জামানসহ কৃষি ও ডাকবিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং আমচাষিরা উপস্থিত ছিলেন। সেই সাথে তারাও ঢাকা থেকে যুক্ত মন্ত্রী ও সচিবদের সাথে কথা বলেন।
মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানান, ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে এসব মৌসুমি ফল রাজধানীর বিভিন্ন মেগা শপ ও পাইকারি বাজারে বিপণন করা হবে। বিক্রয়লব্ধ টাকা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কৃষকের হাতে পৌঁছে যাবে। দেশব্যাপী ডাক পরিবহনে নিয়োজিত ঢাকা ফেরত গাড়িগুলো বিনা মাশুলে প্রান্তিক কৃষকের পণ্য পরিবহনে সরকারের বাড়তি কোনো খরচেরও প্রয়োজন হবে না।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী আরও বলেন, পর্যায়ক্রমে মধুপুর থেকে আনারস পরিবহনসহ চাহিদা ও গুরুত্ব বিবেচনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই কার্যক্রম চালু করা হবে। করোনা সংকটকালে জনগণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সেবা সহজ করতে সরকার গত ৯ মে থেকে কৃষকবন্ধু ডাক সেবা চালু করেছে। এছাড়াও বিনা মাশুলে করোনা চিকিৎসা উপকরণ পিপিই ও কিট দেশব্যাপী সিভিল সার্জন কার্যালয়ে পৌঁছানোসহ জনগণের দোরগোড়ায় নিরবিচ্ছিন্ন ডাক সেবা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ ডাক সেবা চালু করা হয়।
অনুষ্ঠানে ডাক অধিদফতরের মহাপরিচালক এসএস ভদ্র বলেন, কৃষকের স্বার্থরক্ষায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত এই উদ্যোগ সফল করতে ডাক বিভাগ বদ্ধপরিকর।
এব্যাপারে বাংলাদেশ ডাকবিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল মোহাম্মদ ওয়াহিদ উজ-জামান জানান, ডাকবিভাগের মাধ্যমে বিনাখরচে ঢাকায় আম পাঠাতে হলে প্রান্তিক চাষিরা নিজ নিজ এলাকার কৃষি কর্মকর্তাকে অবহিত করবেন। কৃষি কর্মকর্তা তালিকা করে জেলা প্রশাসককে দেবেন। জেলা প্রশাসক তালিকা চূড়ান্ত করে দেবেন। তারপর বিনাখরচেই পর্যায়ক্রমে সবার আম ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হক জানান, এই সুবিধা এলাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি আমচাষিদের জন্য। মধ্যস্বত্বভোগীরা এই সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না। এখানে কৃষকদের চাহিদা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপর পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা হবে।
তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ডাক বিভাগের কাভার্ড ভ্যানে বিনামূল্যে ঢাকায় আম পরিবহন করা হবে। রাজশাহীর ক্ষুদ্র মাঝারি আমচাষিরা এই সুবিধা পাবেন। এখন থেকে নিজ নিজ উপজেলার ইউএনও ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে রাজশাহী থেকে বিনামূল্যে আম পাঠাতে পারবে চাষিরা। প্রতিটি এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা এই কাজের তদারকি করবে।
ডাকবিভাগ জানিয়েছে, বুধবার (০৩ জুন) চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আরেকটি কাভার্ড ভ্যান ঢাকায় আম নিয়ে যাবে। তারপর যদি প্রয়োজন হয় তাহলে কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা হবে। মূলত রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিদের সুবিধা দিতেই এভাবে কোনো খরচ ছাড়াই তাদের আম ঢাকায় নেয়া হবে।
জানা গেছে, করোনাভাইরাস মহামারির এই দুর্যোগকালে ডাক বিভাগের ‘কৃষকবন্ধু ডাক সেবা’ এর আওতায় এ কার্যক্রম শুরু হলো। শুধু রাজশাহীর আম নয়, এ কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মৌসুমি ফল ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। এ জন্য চাষিকে কোনো খরচ দিতে হবে না। তবে কোনো ব্যবসায়ী বা মধ্যস্বত্ত্বভোগী ডাকবিভাগের মাধ্যমে ফল পরিবহন করতে পারবেন না। সুবিধা নিতে হলে তাকে চাষিই হতে হবে।
রাজশাহী জেলায় আমবাগান রয়েছে ১৭ হাজার ৬৮৬ হেক্টর জমিতে। এবার আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। অপরিপক্ক আম নামানো ঠেকাতে গেল চার বছরের মতো এবারও আম নামানোর সময় নির্ধারণ করে দেয় জেলা প্রশাসন। সে অনুযায়ী গত ১৫ মে থেকে গুটি আম, ২০ মে থেকে গোপালভোগ, ২৫ মে থেকে রানীপছন্দ ও লক্ষণভোগ বা লখনা এবং ২৮ মে থেকে হিমসাগর বা খিরসাপাত নামানোর সময় শুরু হয়েছে। ল্যাংড়া ৬ জুন, আম্রপালি ১৫ জুন এবং ফজলি ১৫ জুন থেকে নামানো যাবে। সবার শেষে ১০ জুলাই থেকে নামবে আশ্বিনা এবং বারী আম-৪ জাতের আম।
গাছে গাছে ঝুলে থাকা আম দেখে চাষির স্বপ্ন যখন দুলছিল তখন গত ২২ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে রাজশাহীতে ঝড়-বৃষ্টিতে প্রচুর আম ঝরে যায়। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সেদিন গাছের ১২ থেকে ১৫ শতাংশ আম ঝরে পড়েছে। এতে চাষিদের প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আম্পান যেতে না যেতেই ২৬ মে দিবাগত রাতে কালবৈশাখীতে ঝরে আরও অনেক আম। এখন হাটে উঠতে শুরু করেছে আম।
করোনাকালে বাজারজাত নিয়ে যেন সমস্যা না হয় সে জন্য এবারই প্রথম শুধু আমের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রেন চলবে। ট্রেনে দেড় টাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এবং এক টাকা ৩০ পয়সা কেজি ভাড়ায় আম ঢাকায় নেয়া যাবে। ঢাকায় গিয়ে ব্যবসায়ীদের সুবিধামতো স্টেশনে আম নামানো হবে। কুরিয়ার সার্ভিসগুলোও আম পাঠাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে। সবশেষে যুক্ত হলো ডাকবিভাগ।
উল্লেখ্য, এই কর্মসূচির আওতায় গত ৩১ মে থেকে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি থেকে বিনা ভাড়ায় লিচু পরিবহন চালু করা হয়। করোনার বৈশ্বিক ক্রান্তিকালে প্রান্তিক কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর নির্দেশে গত ৯ মে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের ঝিটকা থেকে কৃষকবন্ধু নামে এই কর্মসূচি চালু করা হয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ