বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

কৃষি অর্থনীতির গতিশীলতা রাবি ধান-১

আপডেট: December 8, 2019, 1:01 am

প্রাচ্য পলাশ


আটষট্টি হাজার গ্রামের সবুজ দেশ বাংলাদেশ। স্বর্ণের চেয়েও খাঁটি মাটির এ দেশের অর্থনীতি মূলতঃ কৃষিনির্ভর। দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ভূ-খণ্ড ব-দ্বীপের অন্তর্ভুক্ত ষড়ঋতুর এ দেশে দেখা দিয়েছে জলবায়ুর বিচিত্র পরিবর্তন। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে বাংলাদেশের বায়ুমণ্ডল, শহর-বন্দর, নদী-বন, কৃষি জমি, জনপদ তথা সর্বত্রই। এ পরিবর্তনের প্রভাবকে মানব জাতির অনুকূলে জয় করা সন্দেহাতীতভাবে সময়ের দাবি।
নতুন জাত উদ্ভাবনের ইতিকথা
কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এদেশের কৃষিখাতের প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হলেও ভূমিহীন হয়ে এদেশের কৃষক পরবর্তিতে কৃষি শ্রমিকে পরিণত হওয়ার যে নিদারুণ বাস্তবতা তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কৃষক পরিবারের উত্তর প্রজন্মের এমন করুণ পরিণতির চিত্র গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো. আমিনুল হককে। কৃষির সঙ্গে সম্পর্কিত তৃণমূল জনগোষ্ঠীর জীবনের দৈনন্দিন চালচিত্রে অভাব-অনটন, অনাহার-অর্ধাহার, চিকিৎসাহীনতা, সর্বোপরি জীবনের প্রতি তাঁদের অনীহার দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানীকে গভীরভাবে মর্মাহত করে।
প্রস্তুতিপর্ব
বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো. আমিনুল হক এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কাজ করার জন্য মনস্থির করেন। দেশবাসীর খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী ও জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে তিনি আরো নিবিড়ভাবে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কৃষির প্রধান অপরিহার্য উপাদান হলো বীজ এবং বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য হলো ধান। খরিপ বা আমন ও রবি বা বোরো এ দু’মৌসুমে ব্রি ধান-৩৯, বিআর-১১, পাইজামসহ উচ্চ ফলনশীল ও অঞ্চল ভেদে জনপ্রিয় দশের অধিক জাতের ধান দেশের অধিকাংশ কৃষি জমিতে আবাদ হয়ে থাকে। দেশের কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতির এ চিত্র পর্যালোচনা করে তিনি ধানের ভালো জাত না থাকাকে প্রধান সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করেন। ২০১৪ সালে উন্নত জাতের ধান উদ্ভাবনে গবেষণা শুরু করেন। বাংলাদেশের বিদ্যমান ধানের জাতগুলো পরীক্ষা করার পর গবেষণার প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরু-চিকন ও আগাম জাতের ধান উদ্ভাবন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
জাত অবমুক্তায়ন পদ্ধতি
ধান হলো বাংলাদেশের কৃষি জমিতে চাষাবাদে সরকারিভাবে বিজ্ঞাপিত শস্য বা নোটিফাইড ক্রপ। ধানের জাত অবমুক্তায়নের জন্য সিড সার্টিফিকেশন এজেন্সি (এসসিএ) বা বীজ প্রত্যয়ণ এজেন্সিকে প্রস্তাবিত জাতের এক কেজি বীজ ও পরীক্ষণ ফি জমা দিতে হয়। পরবর্তিতে এসসিএ’র নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পরপর দুই আবাদ মৌসুমে ডিসটিন্কনেস (Distincness) বা বৈশিষ্ট্য, ইউনিফর্মিটি (Uniformity) বা অভিন্নতা ও স্ট্যাবিলিটি (Stability) বা স্থিতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। প্রথম ধাপের পরীক্ষণে পাতার রঙ, পুষ্পায়নের সময়, পুং কেশর, গর্ভ কেশর, কাণ্ড দৈর্ঘ্য, শীষ সহ চল্লিশটি বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা হয়। আবাদ মূল্যায়নে উদ্ভিদ প্রজননতত্ত্ববিদের উদ্যোগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রস্তাবিত জাতটির পরীক্ষামূলক আবাদ করতে হয়। বীজ প্রত্যয়ণ এজেন্সি (এসসিএ)’র সাত সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল পুষ্পায়ন ও ধান সংগ্রহের সময় দু’বার সরেজমিন মূল্যায়ন করেন। মূল্যায়ন প্রতিবেদন এসসিএ’র পরিচালক দপ্তরে প্রেরণ করা হয়। মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে তা ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কমিটিতে উত্থাপনের পর জাতীয় বীজ বোর্ডকে জাতটি অবমুক্তায়নের জন্য সুপারিশ করে। জাতীয় বীজ বোর্ড পরবর্তিতে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদে জাতটিকে অনুমোদন দেয়।
কৌলিক সারি সংগ্রহ ও নির্বাচন
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি ত্বরান্বিত করার জন্য ধানের উন্নত জাত উদ্ভাবনে বিজ্ঞানী ড. আমিনুল ফিলিপাইন থেকে ২০১৪ সালে ১৬০৭, ১৬২১, ১৫৭৮, এনএসআইসি ২২২ সহ ধানের ৫৩টি লাইন সংগ্রহ করেন। বিজ্ঞান গবেষণায় দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের এগ্রোনোমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের গবেষণা মাঠে পরীক্ষামূলকভাবে আবাদ করেন। কৌলিক সারিটি ২০১৪ সালে রোপা আমন মৌসুমে ৪টি স্থানে ও ২০১৫ সালে ৩টি কৃষকের জমিতে ফলন উপযোগিতা যাচাই করা হয়। পরপর দু’বছরই দেখা যায়- প্রচলিত জাত ব্রি ধান-৩৯ জাতের চেয়ে ফলন ভাল ও চাষাবাদ উপযোগী। পরীক্ষণে পেডিগ্রি-আইআর ৭৮৫৮১-১২-৩-২-২ ও প্যারেন্টেজ নম্বর- আই আর ৭৩০১২-১৩৭-২-২-২ / পিএসবিআরসি-১০ এর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাদৃশ্য দেখতে পান। ধানের নতুন জাত হিসাবে অবমুক্তায়নের জন্য তিনি পরীক্ষামূলকভাবে আবাদের জন্য তা চূড়ান্ত করেন।

পরীক্ষামূলক আবাদ ও ফল নিরূপণ
শুরু হলো ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনে পরীক্ষামূলক আবাদ। ২০১৭ সালে রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগে দু’টি করে চারটি কৃষি মাঠসহ রংপুর, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগের ছয় রেপ্লিকেশন সংবলিত মোট সাতটি কৃষি মাঠে বিয়াল্লিশটি প্লটে ক্যান্ডিডেড ভ্যারাইটি বা প্রার্থী জাত এনএসআইসিআরসি ২২২ ও চেক ভ্যারাইটি বা যাচাইকরণ জাত ব্রি ধান ৩৯ জুলাই মাসের তৃতীয় দশকে রোপন করা হয়। সাত সদস্যের বিভাগীয় পর্যায়ের কৃষি বিশেষজ্ঞ দল সাতটি মাঠ প্রথমবার পুষ্পায়নের সময় ও দ্বিতীয়বার ধান সংগ্রহের সময় সরেজমিন পরিদর্শন ও মূল্যায়ন করেন। প্রতিটি বিভাগের পৃথক কৃষি বিশেষজ্ঞ দলগুলোর নেতৃত্ব দেন সভাপতি হিসাবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ও সদস্য সচিব হিসাবে আঞ্চলিক বীজ প্রত্যয়ণ কর্মকর্তা। মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ক্যান্ডিডেড ভ্যারাইটি বা প্রার্থী জাত এনএসআইসিআরসি ২২২ এর ধানের ওজন, মেশিনে ভাঙানোর পর দানার ফলন, আমিষের পরিমাণ, চালের দৈর্ঘ্য ও ঘের চেক ভ্যারাইটি বা যাচাইকরণ জাত ব্রি ধান ৩৯ এর চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি। ক্যান্ডিডেড ভ্যারাইটির ফলন এক টন বেশি ও সম্পূর্ণ রোগবালাইমুক্ত। অ্যামিলেজ (Amylase) এর পরিমাণ চেক ভ্যারাইটি ব্রি ধান ৩৯ এর চেয়ে কম হওয়ায় রান্নার পর ভাত আঠালো ভাবমুক্ত ও অত্যন্ত ঝরঝরে হয়। কিন্তু খুলনায় অতিবৃষ্টির কারণে চেক ভ্যারাইটি ব্রি ধান ৩৯ নষ্ট ও ঢাকা গাজীপুরে ধান সংগ্রহের দু’দিন আগে অতিবৃষ্টির কারণে মাঠ ডুবে ধানের রং ঘোলাটে হয়ে যায়। তাই কৃষি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মূল্যায়ন দল ২০১৮ সালে আরো একবার পরীক্ষামূলক আবাদের জন্য জানায়। ২০১৮ সালে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে পুনরায় পরীক্ষামূলক আবাদ করা হয় এবং পরীক্ষণ মাঠ কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে না পড়ায় মূল্যায়ন কমিটি পরিপূর্ণ প্রতিবেদন প্রেরণ করে।
রাবি ধান-১ অবমুক্তায়ন
পরিচালক (বীজ প্রত্যয়ণ এজেন্সি), জাতীয় বীজ বোর্ড, গাজীপুর ইতিবাচক প্রতিবেদন পেয়ে বোর্ডের টেকনিক্যাল কমিটিতে উত্থাপনে সম্মত হন। ২০১৯ সালের ১৯ এপ্রিল সকালে বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ কাউন্সিলে ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কমিটির সামনে মূল্যায়ন প্রতিবেদন উত্থাপন করেন বিজ্ঞানী ড. মো. আমিনুল হক। দেশের ছয় বিভাগের মাঠ পর্যায়ের মূল্যায়নের সবগুলোর ফলাফল ইতিবাচক হওয়ায় ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কমিটি ক্যান্ডিডেড ভ্যারাইটি বা প্রার্থী জাত এনএসআইসিআরসি ২২২ কে নতুন জাত রাবি ধান-১ হিসাবে অবমুক্তায়ন ও বাংলাদেশে চাষাবাদে অনুমোদন দানে জাতীয় বীজ বোর্ডকে সুপারিশ করে। জাতীয় বীজ বোর্ড ২০১৯ সালের ১৯ জুন ক্যান্ডিডেড ভ্যারাইটি বা প্রার্থিত জাত এনএসআইসিআরসি ২২২ কে নতুন জাত রাবি ধান-১ হিসাবে অবমুক্তায়ন ও বাংলাদেশে চাষাবাদে অনুমোদন দেয়।
রাবি ধান-১ এর বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ
রাবি ধান-১ এর পাতা গাঢ় সবুজ। রাবি ধান-১ এ আধুনিক উচ্চ ফলনশীল ধানের সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। বিশেষ করে, এ জাতটি ইনব্রিড লাইন হওয়ায় কৃষক নিজের প্রয়োজনীয় বীজ সংরক্ষণ করতে পারে। যা হাইব্রিড লাইনের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এ জাতের গাছের আকার ব্রি ধান-৩৯ এর চেয়ে ৫ সে.মি ল¤¦া। পূর্ণবয়স্ক গাছের উচ্চতা ১১০-১১৫ সে.মি। এ জাতের জীবনকাল ১২৬ থেকে ১৩০দিন। ধানের দানা অনেকটা ব্রি ধান-৩৯ এর মতো, তবে সামান্য ল¤¦া। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২৪ গ্রাম। পাকা ধানের রং সোনালী বর্ণের। চালের আকার-আকৃতি ব্রি ধান-৩৯ এর চালের চেয়ে ল¤¦া। রাবি ধান-১ ঢলে পড়া প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। এ জাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল শীষ থেকে ধান ঝরে পড়ে না। পরিপক্ক শীষগুলি ফ্লাগ লিফ বা ডিগপাতার ওপরে অবস্থান করে, বিধায় দেখতে খুব আকর্ষনীয় হয়। ব্রি ধান-৩৯ এর চেয়ে ফলন ১.৫ থেকে ২ টন বেশি। ব্লাস্টরোধক এক্সএ-৫ ও ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট রোধক পিটা-১, ২ জিন বিদ্যমান।
নতুন জাত রাবি ধান-১ দেশের উচ্চ ফলনশীল জাতগুলোর তুলনায় হেক্টর প্রতি ফলন দেড় থেকে দুই টন বেশি। প্রতি মণ ধানের পাইকারি দর একশ’ টাকা বেশি, আমিষের পরিমাণ বেশি; সর্বোপরি অ্যামিলেজ (অসুষধংব) এর পরিমাণ কম হওয়ায় রান্নার পর আঠালো ভাবমুক্ত ও ঝরঝরে হয়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক চাল বাজারের সব গুণাগুণ বিদ্যমান উদ্ভাবিত নতুন জাত রাবি ধান-১- এ।
রাবি ধান-১ চাষাবাদ পদ্ধতি
বাংলাদেশে আবাদের জন্য জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের খরিপ বা আমন মৌসুম ও ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত রবি বা বোরো মৌসুম প্রচলিত রয়েছে। উদ্ভাবিত নতুন জাত রাবি ধান-১ উভয় মৌসুমে উৎপাদনযোগ্য হলেও খরিপ বা আমন মৌসুম চাষাবাদের জন্য আদর্শ মৌসুম। এ মৌসুমে চাষাবাদের জন্য ২০ থেকে ২৫ জুনের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপণ করতে হবে। রোপনের জন্য জমি প্রস্তুত করে নাইট্রোজেন ফসফেট পটাশ বা এনপিকে সার প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া জমিতে চাহিদা থাকলে জিপসাম ও বোরন প্রয়োগ করতে হবে। বীজতলা থেকে চারা সংগ্রহ করে ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে প্রস্তুতকৃত জমিতে চারা গোছা প্রতি ২/৩ টি করে লাইন প্রতি ২০ সেমি ও সারি প্রতি ১৫ সেমি স্পেসিং দিয়ে রোপন করতে হবে। মাঝারি উঁচু থেকে উঁচু জমি এ ধান চাষের জন্য উপযুক্ত। সারের মাত্রা উফসি জাতের মতই (১২০ : ১১০: ১১০ কেজি ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি/ হেক্টর এবং ১০০ ও ১০ কেজি করে জিপসাম ও জিংক সালফেট/ হেক্টর)। সর্বশেষ জমি চাষের সময় সবটুকু টিএসপি, জিপসাম ও এমপি সার একসাথে প্রয়োগ করা হয়। ইউরিয়া সার সমান তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হয়। রোপনের ২০ দিন পর ১ম কিস্তি, ৩৫-৪০ দিন পর ২য় কিস্তি ও ৫০-৬০ দিন পর ৩য় কিস্তি। জিংকের অভাব পরিলক্ষিত হলে চাষের সময় জিংক সালফেট প্রয়োগ করতে হবে। ভাল ফলনের জন্য নিয়মিত আগাছা পরিস্কার, জমিতে রসের অভাব দেখা দেয়া সাপেক্ষে সেচ দিতে হবে। রাবি ধান-১ এ সাধারণত পোকার আক্রমণ দেখা যায় না। তবে যদি পোকার আক্রমণ দেখা দেয় সেক্ষেত্রে পোকা দমনে প্রয়োজনীয় বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে। অক্টোবরের ২৫ থেকে নভেম্বর ১০ এর মধ্যে ধান সংগ্রহ করা যাবে। রাবি ধান-১ এর চাষাবাদের মেয়াদ ১২৬ থেকে ১৩০দিন। উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে হেক্টর প্রতি রাবি ধান-১ ছয় টন পর্যন্ত ফলন দেয়।
বিজ্ঞানীর অন্যান্য সাফল্য
রাবি ধান-১ কৃষি বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো. আমিনুল হকের প্রথম বা একমাত্র উদ্ভাবন নয়। ইতোপূর্বে তাঁর উদ্ভাবিত কাঁকরোল ১৯৯৭ সালে, আলু ও স্ট্রবেরি ২০০৪ সালে অবমুক্তায়িত হয়। এছাড়া তিনি ২০০৩ সালে জাপানের সাগা ইউনিভার্সিটিতে পানি ফলের ডিএনএ সিক্যোয়েন্সিং, মোলিকুলার গবেষণা ও ডেন্ডোগ্রাম এবং ২০০৭ সালে ইংল্যান্ডের নটিংহাম ইউনিভার্সিটিতে পানি ফলের ‘পোলেন টিউব পাথওয়ে’তে জেনেটিক ট্র্যান্সফর্মেশনের মাধ্যমে লবণাক্ত সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে কাজ করেন।
অপার সম্ভাবনা মণ্ডিত পথ রাবি ধান-১
উদ্ভাবিত নতুন জাত রাবি ধান-১ এর গুণাগুণ অন্য যে কোনো উচ্চ ফলনশীল জাতের তুলনায় উন্নত। অথচ উৎপাদন খরচ অপেক্ষাকৃত কম। বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাতের উৎপাদনকাল হলো- রাবি ধান-১ ১২৬ থেকে ১৩০ দিন, পাইজাম ১৪২ দিন, ব্রি ধান-৩৯ ১২৬দিন ও বিআর-১১ ১৪৫ দিন। হেক্টর প্রতি এ জাতগুলোর ফলন হলো- রাবি ধান-১ সাড়ে ৫ থেকে ৬ টন, পাইজাম সাড়ে ৪ থেকে ৫ টন, ব্রি ধান-৩৯ চার থেকে সাড়ে চার টন, বিআর-১১ সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ টন। অর্থাৎ রাবি ধান-১ এর ফলন অন্যান্য ধানের তুলনায় হেক্টর প্রতি দেড় থেকে দুই টন বেশি। এ জাতগুলোর মণ প্রতি পাইকারি দর হলো- রাবি ধান-১ ও পাইজাম ৬শ’ টাকা, ব্রি ধান-৩৯ ও বিআর-১১ পাঁচশ’ টাকা। প্রতি হেক্টরে উৎপাদিত ছয় টন রাবি ধান-১ এর পাইকারি মূল্য ৯৯ হাজার টাকা ও পাঁচ টন পাইজাম এর পাইকারি মূল্য বিরাশি হাজার পাঁচ শ’ টাকা। রাবি ধান-১ এর উৎপাদনকাল সর্বোচ্চ ১৩০ দিন হওয়ায় ধান সংগ্রহের পর আলু, সরিষা, শীতকালীন সবজি ইত্যাদি চাষাবাদ করাও যায়। অন্যদিকে, পাইজাম এর উৎপাদনকাল ১৪২ দিন হওয়ায় পরবর্তিতে অন্য ফসল চাষাবাদে সুফল পাওয়া যায় না। অর্থাৎ প্রতি হেক্টর জমিতে রাবি ধান-১ এর ফলন ছয় টনের পাইকারি দাম নিরানব্বই হাজার টাকা ও আলুর ফলন ৭ টনের পাইকারি দাম দুই লাখ আশি হাজার টাকা হিসাবে তিন লাখ ঊনআশি হাজার টাকার ফসল এক আমন মৌসুমে উৎপাদিত হচ্ছে। যেখানে প্রতি হেক্টরে পাইজাম ধান ৫ টনের পাইকারি দাম বিরাশি হাজার পাঁচ শ’ টাকার ফসল এক আমন মৌসুমে উৎপাদিত হচ্ছে। অর্থাৎ রাবি ধান-১ আবাদকৃত প্রতি হেক্টর জমি থেকে আর্থিক মানদণ্ডে অধিক ফলনের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৫শ’ টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০১৬-১৭-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৮৫ লাখ ৮৫ হাজার ২০৭ দশমিক ৪ হেক্টর। দেশের মোট আবাদযোগ্য জমির মাত্র দশ ভাগে এক আমন মৌসুমে রাবি ধান-১ ও পরবর্তিতে আলু আবাদ করা হলে বাড়তি লাভের অংকটি ক্যালকুলেটর যন্ত্রের স্ক্রিনে যে আর ধরবে না- তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
শেষ কথা
বাংলাদেশ কৃষিতে অপার সম্ভাবনার দেশ। তাই বাংলাদেশের কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রপ্তানিমুখি প্রধান খাত হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব কিছু নয়। বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানীদের আশ্চর্য উদ্ভাবনী ক্ষমতা এমন স্বপ্নকে বাস্তবরূপ দান করতে রাখছে অসামান্য অবদান।
লেখক : চলচ্চিত্র নির্মাতা

[email protected]