কেউ রেহাই পাওয়ার যোগ্য নয়: শিক্ষামন্ত্রী

আপডেট: জানুয়ারি ১১, ২০১৭, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


নতুন পাঠ্যবইয়ে ভুলের জন্য দায়ীদের কেউ রেহাই পাবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।
নতুন পাঠ্যবইয়ে ভুলের জন্য প্রশ্নের মুখে পড়ছেন স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলছেন, যাদের জন্য এই ভুল তাদের কেউ রেহাই পাওয়ার যোগ্য নয়।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বিভিন্ন বইয়ে ভুলের কারণে সমালোচনার মধ্যে মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, এনসিটিবির তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদন দেখে ‘বড় দুটি ভুলের’ জন্য দুজনকে চিহ্নিত করে ওএসডি করা হয়েছে; দোষ প্রমাণিত হলে তাদের ‘পরিপূর্ণ শাস্তি’ হবে।
“কিন্তু সবাইকে আমরা বুঝিয়ে দিচ্ছি, যারা এই ভুল করেছেন তারা রেহাই পাওয়ার যোগ্য না। আগেই তাদের ওএসডি করেছি, তদন্ত করে আরও কারা কারা আছেন, কার ভুল, কে কতটুকু দায়ী সে অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” অনেক ভুল-ক্রটি ও ব্যর্থতার পরও বছরের প্রথম দিন বই বিতরণকে বিশাল কর্মযজ্ঞ হিসেবে বর্ণনা করেন শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ।
তিনি বলেন, “আমি এ রকম (ভুল) আশা করি নাই। এখানে পরিপূর্ণ সকল বিষয়ে আলাপ করব না, সেটা সম্ভবও না। আপনারা (সাংবাদিক) প্রশ্ন না করলেই খুশি হব।
“অনেক ভুলক্রটি হয়েছে, সীমাবদ্ধতা আছে, ক্রটি থাকতেই পারে। শিক্ষক ঠিক করে দেবেন, যারা দায়ী তারা ঠিক করে দেবেন। এগুলো না করে যদি ঠিক উল্টোটা করতে থাকি, তাহলে ছেলেমেয়েরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
মন্ত্রী বলেন, “আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি বা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছি, ভুলের জন্য আমাদের বিচার হওয়া উচিত, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু ছেলেমেয়েদেরকে উৎসাহিত করার নৈতিক দায়িত্ব আমাদের সকলের। যেটা তাদের উপর নেগেটিভ প্রভাব ফেলে আমি মনে করি সেটা করা উচিত না।”
মানুষের ভুল-ক্রটি ‘হতেই পারে’ মন্তব্য করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমাদের বেশি হতে পারে, বেশিই হয়ত হচ্ছে, কিন্তু এগুলোই শেষ কথা নয়।
“কিছু ভুল থাকতে পারে ছাপার ভুল, যেগুলো আমরা সংশোধনী দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিতে পারি। কিছু ভুল থাকতে পারে বড় ধরনের ভুল, যেটা সংশোধন করতে গেলে ওই জায়গাটা রিপ্লেস করতে পারি। কিছু ভুল থাকতে পারে যেগুলো থাকা উচিত ছিল না, সেগুলো অমিট করার জন্য সরকারের নির্দেশ পাঠিয়ে দেব, ওই পাতাগুলো আমরা ছিঁড়ে নেব বা ব্লক করে দেব- এভাবে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেব।”
নাহিদ বলেন, পা-ুলিপি তৈরির পর তা সম্পাদনা ও মানোন্নয়ন এনসিটিবির দায়িত্ব। বিশেষজ্ঞ শিক্ষকরা এর সঙ্গে জড়িত থাকেন। এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক চূড়ান্তভাবে সই না করলে বই ছাপা হয় না।
এডিবি ও বিশ্ব ব্যাংকের কিছু শর্তের কারণে প্রাথমিকের বই ছাপাখানায় পাঠাতে দেরি হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, অল্প সময়ে অতি দ্রুত বইগুলো সম্পাদনার কাজটি শেষ করা হয়েছে। বছরের প্রথম দিন ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৫৩ হাজার ২০১ জন শিক্ষার্থীর হাতে এবার ৩৬ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে সরকার।
শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই যাওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ভুল-ক্রটি ধরে সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে সমালোচনা হচ্ছে। ভুলের খতিয়ান তুলে ধরে অনেকে প্রশ্ন রেখেছেন- শিশুদের পাঠ্যবইয়ে এসব কী শেখানো হচ্ছে।
>> প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে বর্ণ পরিচয়ে লেখা হয়েছে, ‘ও’-তে ওড়না চাই; যা নিয়ে ফেইসবুকে চলছে তুমুল সমালোচনা।
>> একই বইয়ে শুনি ও বলি পাঠে একটি ছাগলের ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে, অজ (ছাগল) আসে। আম খাই। আম খাওয়া বোঝাতে একটি আম গাছের নিচের অংশে দুই পা তুলে একটি ছাগলের দাঁড়িয়ে থাকায় ছবি দেয়া হয়েছে, যা নিয়ে ফেইসবুকে চলছে হাস্যরস।
>> তৃতীয় শ্রেণির একটি বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবির নিচে ইংরেজিতে একটি বাক্য লেখা হয়েছে ভুল বানানে। আঘাত করা বোঝাতে গিয়ে হার্ট বানান লিখতে ভুল হয়েছে; লেখা হয়েছে, উঙ ঘঙঞ ঐঊঅজঞ অঘণইঙউণ.
>> তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতায় বেশ কয়েটি লাইন বিকৃত করা হয়েছে। মূল কবিতায় আছে ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে’। আর বইয়ে ছাপা কবিতায় লেখা হয়েছে ‘আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে?’ এছাড়া ‘মানুষ হইতে হবে- এই তার পণ’ এর বদলে লেখা হয়েছে ‘মানুষ হতেই হবে’।
>> অষ্টম শ্রেণির গল্পের বই আনন্দপাঠে সাতটি গল্পের সবগুলোই বিদেশি লেখকের গল্পের বাংলা অনুবাদ। দেশি লেখকের কোনো গল্প সেখানে না থাকায় সমালোচনা হচ্ছে।
ছাগলের যে ছবি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে তা ‘দেখা হবে’ জানিয়ে নাহিদ বলেন, ছাগল গাছে উঠে আম খাচ্ছে ফটোশপে তৈরি এমন কিছু ছবি গণমাধ্যমে এসেছে। ওই ছবি পত্রিকায় ছাপা ঠিক হয়েছে কি না- সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
‘ও- তে ওড়না’ নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, “নানা মত থাকতে পারে, আমরা সবগুলো মতামত ওয়েলকাম করি। কিছু ভুল পেয়েছি, যা হওয়া উচিত না।”
হার্ট বানানে ভুলের বিষয়ে নাহিদ বলেন, “যিনি সম্পাদনা করেছেন তার এটা দেখা উচিত ছিল, এই বিষয়টাকে আমরা ক্ষমা করতে পারি না। শব্দ ও বানান ভুল হতেই পারে, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আদর্শ ছেলে কবিতায় যে ভুল হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
পাঠ্যবইয়ের ভুল-ক্রটির ঘটনায় করা দুটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়ার হবে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “অবস্থা বুঝে কী করা যায় সে ধরনের ব্যবস্থা নেব। আমি আশা করি, এতে আমাদের শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।”
এবার পাঠ্যবইয়ের কিছু বিষয়বস্তুর পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “দেশ, জাতি, মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, আমাদের চিন্তা সব কিছুই বিবেচনায় রেখেই আমাদের তৈরি করতে হয়। তাতে কোনো সময় পাল্লা এদিক-ওদিক হতেই পারে, সমালোচনা থাকতে পারে, আমরা সেগুলোও বিবেচনায় নেই।”
২০১২ সালে নতুন পাঠ্যক্রম প্রণয়নের পর হেফাজতে ইসলামের ১৭ দফা দাবি অনুযায়ী বইয়ের বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে নাহিদ বলেন, “এখানে কারও আন্দোলনকে প্রাধান্য দেয়ার সুযোগ নেই, আমরা সবার মতামত নিয়েছি।”
অন্যদের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন, অতিরিক্ত সচিব চৌধুরী মুফাদ আহমদ, অরুণা বিশ্বাস ও রুহী রহমান এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি বিভাগের উপ-সচিব সুবোধ চন্দ্র ঢালী সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।- বিডিনিউজ