কেমন কাটবে ওদের ঈদ?

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১, ২০১৭, ১:৫০ পূর্বাহ্ণ

ড. রুমি শাইলা শারমিন


সমগ্র বিশ্বে মুসলিম সমাজের সর্ববৃহৎ আনন্দ উৎসব ও মহামিলনের দুইটি দিনের একটি হলো ঈদুল ফিতর ও অন্যটি ঈদুল আজহা। সময়ের পরিক্রমায় আবারও আমাদের মাঝে আসছে পবিত্র ঈদুল আজহা। আত্নোৎসর্গ ও কঠোর সাধনার এই ঈদ। আসুন, আসন্ন ঈদকে ঘিরে মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। পবিত্র ঈদুল আজহার তাৎপর্যকে গভিরভাবে উপলব্ধি করি। জেনে নিই এই মহিমান্বিত ত্যগের ইতিহাস।
কোরবানি শব্দটা এসেছে ‘কুরবুন’ থেকে, যার অর্থ ‘নৈকট্য লাভ’। চার হাজার বছর পূর্বে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নিকট মহান আল্লাহ-র স্বপ্নাদেশ ছিল তার প্রাণপ্রিয় জিনিসকে কোরবান করতে হবে। আল্লাহ-র প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও নৈকট্য লাভের জন্য তিনি তার প্রাণাধিক পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর জান কোরবানের জন্য উদ্যত হন। আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে পুত্রের পরিবর্তে পশু কোরবানের আদেশ দেন। অর্থাৎ এই ত্যগের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করাই কোরবানির উদ্দেশ্য। আমাদের মাঝে আদর্শ ও মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হলে ধর্মীয় সঠিক ইতিহাস জানা ও ধর্মীয় জ্ঞান চর্চা আবশ্যক।
পবিত্র ঈদকে ঘিরে সামাজিক অসংগতিগুলো আমাদের সমাজে এখনও চোখে পড়ে। প্রায়শই দেখা যায় সমাজের কিছু সংখ্যক ব্যক্তি দাম্ভিকতার উদ্দেশ্য নিয়ে বেশি দামে বেশি বড় কোরবানির জন্য পশু ক্রয় করে থাকেন এবং গর্ববোধ করেন। এই দাম্ভিকতাপূর্ণ মনোভাব ঈদুল আজহা সম্পর্কে সেই ব্যক্তির প্রকৃত জ্ঞানের অভাব বা অসচেতনতাকে ইঙ্গিত করে। মনে রাখতে হবে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য আমাদের প্রিয় পশুকে আমরা কোরবানি করতে যাচ্ছি। শহরে যারা বসবাস করেন হাতে গোনা কজন পশু পালন করতে পারছেন? যারা সারা বছর জুড়ে কোরবানির পশুকে শ্রম ঢেলে, যত্ন ভালোবাসা দিয়ে লালন পালন করছেন তাদের মমতা থাকাটাই স্বাভাবিক। আর কোরবানির উদ্দেশ্যই হচ্ছে মমতা জড়ানো প্রিয় পশুকে উৎসর্গ করা। আমরা কি পারছি? কেননা শহরের অধিকাংশ মানুষ বড়জোর ঈদের দুদিন আগে ক্রয় করছেন। প্রযুক্তির যুগে অনলাইন মাধ্যমেও ক্রয় বিক্রয় চলছে। পরিতাপের বিষয় কেউ কেউ ঠিক কোরবানির পূর্ব মূহুর্তে সন্তান কে চিনিয়ে দিচ্ছেন নিজেদের কোন পশুটা কুরবানি হতে যাচ্ছে। কাজেই আগে থেকে না চিনলে, না যত্ন করলে কিভাবে মমতার সৃষ্টি হবে? আসলে শহরের অধিকাংশ বাসা বাড়িতে পশু পালনের সুযোগ নেই বললেই চলে। যাওবা কারো কারো আছে তাদের সময় ও সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। এ তো গেল কোরবানির কথা। কোরবানির পর কোরবানির গোশত সঠিক নিয়মে বন্টনের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহপাক। মনে রাখতে হবে, নিজেদের উপার্জিত অর্থে কেনা বা গৃহপালিত পশুর গোশতের অংশিদার যেমন আমি তেমনি আমার পরম আত্মীয়, প্রতিবেশি ও সহায় সম্বলহীন ফকির মিসকিনও সমান দাবীদার। তাই গোশত বন্টনের ক্ষেত্রে ইসলামী সঠিক নিয়ম পালন করতে হবে। আমাদের সন্তানদের মাঝে উপলব্ধি জাগাতে হবে যে মিলেমিশে আহার করার মাঝে কত সুখ লুকানো আছে! তাহলে শিশুকাল থেকেই আত্মকেন্দ্রিকতা দূর করে অন্যের হক সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে।
আসলে ইসলামী নিয়ম কানুনগুলো সামগ্রিকভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে। যারা পশুপালন ব্যবসা করে থাকেন এবং যারা কসাই তারা কোরবানির নিমিত্তে অর্থ উপার্জন করেন। এছাড়াও কোরবানির পশুর চামড়া রপ্তানিযোগ্য। এভাবে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা হয়। আবার সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিবর্গ কোরবানির গোশত বিতরণ করেন যা সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠি পেয়ে থাকেন। সারা বছর যাদের একদিনও কিনে খাওয়ার সামর্থ্য হয়না তাদেরও তৃপ্তি মেটে। প্রতিবেশী ও আত্মীয়ের মাঝে গোশত বিতরণের ফলে তাদের হক আদায় হয়, আত্মীয়তা রক্ষা হয়, সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে সামাজিক ও মানসিক ভারসাম্য রক্ষা হয়।
ঈদের আমেজ শুরু হয়ে যায় বেশ কদিন আগে থেকেই। ঈদেকে ঘিরে সাজ সাজ রব। আমাদের কত পরিকল্পনা! কোথায় কোথায় বেড়াবো কিভাবে কাটাবো, কি কি খাবো। চলতে থাকে নতুন জামা জুতো কেনাকাটা, উপহার দেয়া নেয়া। দর্জিবাড়িতে চলে চাঁদরাত পর্যন্ত সেলাই মেশিনের কাজ। ঈদের চাঁদ দেখতে পাওয়ার সাথে সাথে রান্নাঘরে মা বোনদের কাজের ধুম পড়ে যায়। কানে বাজে নানা স্বাদের মশলা বাটার আওয়াজ, ভেসে আসে হালুয়া সেমাই, জর্দা, ফিরনির ঘ্রাণ। শুরু হয় আতর, টুপি, জামা কাপড় গুছিয়ে রাখার প্রস্তুতি। পাশাপাশি নারী ও শিশুদের উৎসবমুখর মেহেদি রাঙানো চলে মধ্যরাত পর্যন্ত।
আমাদের সময় ঈদ কার্ড বিনিময়ের মাধ্যমে একে অন্যকে ঈদ শুভেচ্ছা জানাতাম। তবে এখন প্রযুক্তি গত উন্নতির ফলে মুঠোফোনে চলতে থাকে দেশে ও বিদেশে থাকা স্বজনদের সাথে ঈদের মোবারকবাদ বিনিময়। পরদিন অর্থাৎ ঈদের দিন সকালে ঈদগাহে নামাজ আদায় করা, কোরবানি করা, সালাম করা, সেলামি দেয়া বা পাওয়া সেটাও মহা আনন্দের!
আমরা যখন ঈদকে ঘিরে এতো আনন্দে মেতে থাকি তখন বিশ্বে অন্যান্য দেশে মুসলিমদের ঈদ কেমন কাটছে? কতটুকু সুখে তারা আছে? হ্যাঁ, বিশ্বের শতকোটি মুসলিম আছে যাদের ভূমি এখন কারবালা প্রান্তর। দৈনিক সংবাদপত্র ও প্রচার মিডিয়াগুলোতে দৃষ্টিপাত করলেই জানা যায় ইউরোপ আমেরিকা, মিয়ানমার থেকে ফিলিস্তিন, জিনজিয়াং থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত চলছে আহাজারি। কী তাদের অপরাধ? মুসলিম হয়ে জন্ম নেয়াই যেন তাদের অপরাধ। বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সেই সব দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে রয়েছে। তাদের উপর চলে প্রতিনিয়ত ধর্মীয় সহিংসতা, অমানুষিক নির্যাতন। ঈদের দিনে সকলে মিলে যখন নতুন পোশাকে সুগন্ধি আতর মেখে সকল ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন, নামাজ শেষে একে অন্যকে ভালোবেসে কোলাকুলি করেন তখন সেই সব দেশে মুসলিম ঘরে ঘরে হাহাকার। বাতাসে স্বজন হারানোর বেদনা। আসুন, সকলে মিলে দুই হাত তুলে মোনাজাত করি নিহত, নিপিড়িত বিশ্ব মুসলিমবাসির জন্য। তাদের করুণ মুহূর্তগুলোর যেন হয় অবসান।
এ তো গেল বিশ্বের অন্যান্য দেশের কথা। আসুন নিজের দেশের কথাটাই ভাবি। দেশ জুড়ে লাখো মানুষ আজ পানিবন্দী। দেশের নিম্নাঞ্চলগুলো ভেসে যাচ্ছে বন্যায়। বানভাসী মানুষ চেয়ে আছে দুমুঠো খাবারের দিকে। মহা আতঙ্কে কাটছে তাদের নির্ঘুম দিনরাত্রি। ইতমধ্যে শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। বন্যার পানিতে সাপের কামড়েও মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে অনেকের। পানিতে ভেসে যাচ্ছে স্বজন, ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু। বানভাসি, পানিবন্দী এইসব মানুষের জন্য আমরা একটু ভাবি। আসন্ন ঈদ উপলক্ষে আমাদের কত না খরচ হচ্ছে! নতুন নতুন একাধিক পোশাক কেনা হয় ও নানারকম উপহারও পাওয়া যায়। যারা আজ বিপদগ্রস্থ, যারা বস্ত্রহীন আসুন তাদের মাঝে বিলিয়ে দিই। এসময় তাদের পাশে থাকি। আমাদের সন্তানদের মাঝেও যেন গড়ে উঠে দানশীল মনোভাব। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বিতরন চলছে। এছাড়াও ব্যক্তিগত উদ্যোগেও বেশ কিছু সচেতন নাগরিক এগিয়ে এসেছেন। আসুন, সবাই মিলে তাদের পাশে দাঁড়াই। শুকনো খাবার, বস্ত্র, ঔষধ ও প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করার উদ্যোগ নিই। ঈদের দিনে কত রকমের আয়োজন থাকে আমাদের খাবার টেবিল জুড়ে। দুঃখজনক যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই আয়োজন ও আপ্যায়নের সুযোগ পান। আহারের সময় বঞ্চিত মানুষের কথা যেন আমরা না ভুলে যাই। চেষ্টা করব তাদের খাওয়াতে যাদের সারা বছরে একটি দিনও ভাল খাবার জোটে না। আমাদের বাসার গৃহকর্মীটিও যেন ঠিকমত খাবার পায়। আবার এমন কিছু ধনাঢ্য পরিবার রয়েছে যারা ঈদ উপলক্ষে দামী ফ্ল্যাটের সাথে ম্যচিং ফার্নিচার, গাড়িসহ অন্যান্য সামগ্রী পরিবর্তন করেন। দামী পোশাকের সাথে ম্যচিং হ্যান্ডব্যাগ, সু, কসমেটিক্স কেনা ও নানা আয়োজনে ব্যস্ত থাকেন যা শুধু নিজের জন্যই। তারা ভুলে যান এই ঈদ ত্যগের, ইবাদত বন্দেগীর ও আল্লাহ’র নৈকট্য লাভের ঈদ। সকলের সাথে ভাগ করে নেয়ার ঈদ।
ঈদুল আজহা আসে ত্যাগ ও ধৈর্য্যের শিক্ষা নিয়ে। প্রতিটি উপার্জনক্ষম পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে ভারসাম্য রক্ষা করার। সময় এসেছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করার। আসুন, সবাই আমরা একে অন্যের সমব্যথী হই। সহযোগী হয়ে যোগাই মানসিক উদ্দিপনা। এভাবেই তো সৃষ্টি হবে ভাতৃত্ববোধ, গড়ে উঠবে মানবতা। প্রকৃত ঈদের তাৎপর্য কোথায় তা খুঁজে নিয়ে মানসিক প্রস্তুতি গ্রহন করি, আসন্ন ঈদকে করে তুলি অর্থবহ।
ঈদ মোবারক।